ইসলাম

সন্তানের ছবি প্রচারে সতর্কতা জরুরি

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

আমরা সবাই আমাদের আদরের সন্তানের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখতে ভালোবাসি। এটি করতে গিয়ে বেশির ভাগ মানুষ তাদের ছবি তুলি। যদিও এখনো অনেক বিজ্ঞ আলেমের মতে, অহেতুক ছবি তোলা হারাম। ফলে একদিকে যেমন আমরা অহেতুক ছবি তুলে হারাম কাজ করছি, অন্যদিকে তাদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে তাদের মানুষের বদনজরের কবলে ফেলে দিচ্ছি।

ফলে তাদের বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
বদনজর কোনো কুসংস্কার নয়। বাস্তবেই মানুষের কুদৃষ্টি বা বদনজরের কারণে অনেক ধরনের ক্ষতি হয়, তাই নবী-রাসুলরাও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে [ইয়াকুব (আ.)] বলল, ‘হে আমার পুত্ররা, (মিসরে প্রবেশের সময়) সবাই একই প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ কোরো না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর কোনো বিধান থেকে আমি তোমাদের রক্ষা করতে পারি না। বিধান শুধু আল্লাহরই। তাঁর ওপরই আমি ভরসা করি এবং তাঁরই ওপর ভরসা করা উচিত ভরসাকারীদের। ’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৬৭)

উল্লিখিত আয়াতে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয়বার মিসরে যাত্রার প্রাক্কালে ইয়াকুব (আ.) তাঁর ছেলেদের উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা ১১ ভাই শহরের একই প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে না। নগর প্রাচীরের কাছে পৌঁছে কয়েকজনে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। ’

এর কারণ হিসেবে তাফসিরবিদরা বলেন, তিনি মূলত তাঁর সন্তানদের মানুষের বদনজর থেকে দূরে রাখতে এই পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ তাঁর সন্তানরা ছিল অত্যন্ত সুদর্শন। তিনি আশঙ্কা করেছেন যে তাদের ওপর কারো কুদৃষ্টি পড়তে পারে। তাই তিনি সন্তানদের পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বলেছেন।

মহানবী (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিস দ্বারাও বোঝা যায়, বদনজর সত্য। এবং এর দ্বারা মানুষের ক্ষতিসাধন হয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আমির বিন রাবিআহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, বদনজর সত্য। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৫০৬)

তাই নিজেদের সন্তান-সন্ততিসহ এমন বিষয়গুলো প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া আবশ্যক। এবং কারো কোনো সম্পদ দেখলে ‘মাশাআল্লাহ’, ‘বারাকাল্লাহ’ ইত্যাদি বলা আবশ্যক। আবু উমামা ইবনে সাহল (রা.) থেকে বর্ণিত, আমির ইবনে রবিআ সাহল ইবনে হানিফকে গোসল করতে দেখে বলেন, আজ আমি যেই সুন্দর মানুষ দেখলাম, এই রকম কাউকেও দেখিনি, এমনকি সুন্দরী যুবতীও এত সুন্দর দেহবিশিষ্ট দেখিনি। (আমিরের) এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সাহল সেখানে লুটিয়ে পড়ল। এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি সাহল ইবনে হুনাইফ (বা হানিফ)-এর কিছু খবর রাখেন কি? আল্লাহর কসম! সে মাথা ওঠাতে পারছে না। তখন রাসুল (সা.) বলেন, তুমি কি মনে করছ যে তাকে কেউ বদনজর দিয়েছে? লোকটি বলল, হ্যাঁ, আমর ইবনে রবিআ (বদনজর দিয়েছে)। অতঃপর রাসুল (সা.) আমির ইবনে রবিআকে ডেকে ক্রোধান্বিত হয়ে তাঁকে বলেন, তোমাদের কেউ নিজের মুসলমান ভাইকে কেন হত্যা করছ? তুমি ‘বারাকাল্লাহ’ কেন বললে না? এবার তুমি তার জন্য গোসল করো। অতএব আমির হাত-মুখ, হাতের কনুই, হাঁটু, পায়ের আশপাশের স্থান এবং লুঙ্গির নিচের আবৃত দেহাংশ ধৌত করে ওই পানি একটি পাত্রে জমা করল। সেই পানি সহলের দেহে ঢেলে দেওয়া হলো। অতঃপর সহল সুস্থ হয়ে গেল এবং সবার সঙ্গে রওনা হলো। ’ (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস : ১৬৮৯)

অতএব আমাদের উচিত, মানুষের বদনজর থেকে নিজেদের সন্তান-সন্ততি, ধন-সম্পত্তি ইত্যাদি রক্ষা করার ক্ষেত্রে যত্নবান হওয়া এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। অনেকে বদনজর থেকে বাঁচাতে সন্তানকে কালো টিপ পরিয়ে দেয়, ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই। এমন কোনো কাজ না করা, যে এগুলোর ওপর মানুষের কুদৃষ্টি দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

আইএ

Back to top button