জাতীয়

মামলা চালিয়ে নিঃস্ব জজ মিয়া একটা চাকরি পেলেই ‍খুশি

নুরুজ্জামান লাবু

ঢাকা, ২১ আগস্ট – ‘সবাই আমারে আশা দিছে। কেউ শেষ পর্যন্ত কিছু করে দেয় নাই। একটা স্থায়ী কর্মসংস্থান কেউ করে দিল না। এখন সিজনাল ব্যবসা করে কোনোরকম জীবন চালাইতেছি। মামলা চালাইতে গিয়া আমি নিঃস্ব। ভিটেমাটিও নাই।’ একবুক আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন আলোচিত সেই জজ মিয়া। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলার মূল আসামিদের আড়াল করতে যাকে আসামি করেছিল তৎকালীন চারদলীয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।

এক পর্যায়ে জজ মিয়াকে রাজসাক্ষী করার পরিকল্পনাও করা হয়। কিন্তু গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে মামলার তদন্ত সংস্থা সিআইডি জজ মিয়ার কাহিনি থেকে সরে আসে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ নিহত হন ২৪ জন। আহত হন শত শত মানুষ।

ঘটনার পরপরই হামলার মূল কুশীলবদের আড়াল করতে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের নির্দেশে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি ফেঁদেছিল জজ মিয়া কাহিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে সিআইডি শৈবাল সাহা পার্থ নামের এক তরুণকে গ্রেফতার করে। এরপর গ্রেফতার করা হয় মগবাজারের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মোখলেছুর রহমানকে। তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করতে না পেরে ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে জালাল ওরফে জজ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।

১৭ দিনের রিমান্ড শেষে ওই বছরের ২৬ জুন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক ‘জবানবন্দি’ দেন জজ মিয়া। পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে গ্রেনেড হামলা করেছে বলে জানায় সে। হামলার নেপথ্যে সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদসহ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামও বলে।

কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। ২০০৬ সালের আগস্টে জজ মিয়ার ছোট বোন খোরশেদা বেগম সাংবাদিকদের জানান স্বীকারোক্তির জন্য সিআইডি তাদের প্রতিমাসে টাকা দেয়। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে যবনিকা পড়ে জজ মিয়াকে নিয়ে সাজানো নাটকের।

সঙ্গে আলাপকালে জজ মিয়া বলেন, রিমান্ডে নিয়ে মারধর ও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ার কারণে তিনি স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে পেটানো হতো। তিনি হামলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। সিআইডির তৎকালীন কর্মকর্তারা অন্যায়ভাবে তাকে ২১ আগস্ট মামলায় জড়িয়ে তার জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে।

জজ মিয়ার ভাষ্য, ওই মামলার খরচ চালাতে গিয়ে তাদের নোয়াখালীর সেনবাগে যে পৈত্রিক ভিটে ছিল সেটা বিক্রি করতে হয়েছে। এখন তিনি নিঃস্ব। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের একটি ভাড়া বাসায় চার বছরের কন্যা ও স্ত্রীকে নিয়ে বাস করেন। মৌসুমী ব্যবসায়ী হিসেবে এটা-সেটা বিক্রি করে সংসার চালান।

জজ মিয়া জানান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাসিমের মাধ্যমে তিনি গাড়িচালক হিসেবে একটি চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু করোনার সময় সেই চাকরি চলে যায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একবার চার লাখ টাকা পেয়েছিলেন। সেটা মায়ের চিকিৎসাতেই খরচ হয়েছিল। মা জোবেদা খাতুনকেও বাঁচাতে পারেননি। চার বছর আগে তিনি মারা যান।

জজ মিয়া বলেন, এখন একটা স্থায়ী চাকরি দরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একাধিকবার আবেদন করেছি। কার্যালয় থেকে পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করা হবে বলে বলা হয়েছিল। এখনও কিছু হয়নি।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জজ মিয়ার কাহিনি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমালে ২১ আগস্ট হামলার মামলায় নতুন করে তদন্ত শুরু হয়।

তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন জজ মিয়াকে অব্যাহতি দিয়ে বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টু, তার ভাই তাজ উদ্দিন, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

তবে ২০০৯ সালে আদালতের নির্দেশে সিআইডি এই মামলার অধিকতার তদন্ত করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই বিএনপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়।

ওই অভিযোগপত্রে জজ মিয়ার কাহিনি তৈরির কারিগর হিসেবে সিআইডির তৎকালীন কর্মকর্তাদেরও অভিযুক্ত করা হয়।

বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এই মামলার রায় দেন আদালত। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসির দণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
আইএ/ ২১ আগস্ট ২০২২

Back to top button