জাতীয়

বিআরটি ঠিকাদারের শাস্তিতে বাধা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক

ঢাকা, ১৯ আগস্ট – চীনের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্কের কারণে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) চীনা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়নি বাংলাদেশ। ক্রেন কাত হয়ে গার্ডার পড়ে পাঁচজন নিহতের ঘটনায় ১০ বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হলেও চুক্তি ভঙ্গের বিষয়ে সংশ্নিষ্ট চীনা কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঠিকাদারকে বাদ নয়, জরিমানা করে আগামী মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করাই লক্ষ্য।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রদূত ৪৫ মিনিট ধরে বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বক্তব্য শোনেন। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে ব্যবস্থা না নিতে অনুরোধ করেন। সূত্রটি এর ব্যাখ্যায় বলেছে, রাষ্ট্রদূত আসলে প্রকল্পে কর্মরত চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না নিতে অনুরোধ করেছেন। চীনা নাগরিকদের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও দিকনির্দেশনা নেই।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, চীনা রাষ্ট্রদূত বৈঠকে বলেন, গার্ডার দুর্ঘটনা তদন্তে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসেছে। তারা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে আপত্তি থাকবে না চীনের।

গত সোমবার রাজধানীর উত্তরার জসীম উদ্‌দীন সড়কের মোড়ে যেখানে গার্ডার পড়ে পাঁচজন নিহত হয়েছেন, সেই অংশের ঠিকাদার চায়না গেঝুবা গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড। সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) অধীনে বিআরটির উড়াল অংশের ঠিকাদার চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান জিয়াংশু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড।
ক্রেন অপারেটর, নিরাপত্তা রক্ষীসহ ১০ বাংলাদেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তারের মতো চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা- প্রশ্নে সচিব আমিন উল্লাহ নূরী বলেছেন, ‘আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রকল্পের কাজ ঠিকভাবে না করায় গত পাঁচ বছরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর ৩২ বার ঠিকাদারকে চিঠি দিয়েছে। আগে কেন শাস্তি দেওয়া হয়নি, চীনের সঙ্গে সম্পর্কই নমনীয়তার কারণ কিনা- প্রশ্নে সচিব বলেছেন, ‘ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমন নয়। আগের যে নিরাপত্তা পরামর্শক ছিল, তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে।’ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ সম্পর্কে আমিন উল্লাহ নূরী বলেছেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দেরি হয়েছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগে এক বছরের বেশি কাজ পিছিয়ে যেত। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছিল। আমাদের চেষ্টা ছিল, দ্রুত কাজ শেষ করা।’
সচিব জানিয়েছেন, বিআরটি প্রকল্পের ঋণদাতা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক নিশ্চয়তা দিয়েছে, অর্থায়নে সমস্যা হবে না। চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে আমিন উল্লাহ নূরী বলেছেন, তিনি (রাষ্ট্রদূত) চীনের পক্ষে সমবেদনা জানিয়েছেন। তদন্তে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সওজের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান, বিআরটি প্রকল্পের সমন্বয়ক অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতার, ঢাকা বিআরটি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সফিকুল ইসলাম, প্রকল্প পরামর্শকদের দলনেতা টিগ ম্যাকরিন।

বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা বলেছেন, চীনা প্রতিষ্ঠান গেঝুবা ৮৫৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার কাজ করছে বিআরটি প্রকল্পে, যা বাংলাদেশ-চীনের আর্থিক সম্পর্কের তুলনায় সামান্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করলে চীনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। তাই এমন পদক্ষেপ না নিতে দেশটির পক্ষ থেকে ‘অনুরোধ’ রয়েছে। চীনের অর্থায়নে বাংলাদেশে অনেক প্রকল্প চলছে। বাংলাদেশ-চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে ঠিকাদারকে নিষিদ্ধ করার চিন্তা নেই। ঠিকাদারকে বাদ দিলে শুধু বৈদেশিক সম্পর্কের অবনতি নয়, বিমানবন্দর-জয়দেবপুরের মতো ব্যস্ততম সড়কে কাজ বন্ধ হয়ে চরম জনদুর্ভোগ হবে। তাই বাংলাদেশের অবস্থান, জরিমানা করে মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করে ঠিকাদারকে বিদায় করা।

ওই কর্মকর্তারা জানান, বৈঠকে রাষ্ট্রদূতকে জানানো হয়েছে বিআরটি প্রকল্পের চীনা ঠিকাদাররা কীভাবে ও কতবার চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের ছুটির দিনে কাজ করা চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন। রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেছেন, বাংলাদেশের আদালতের ওপর চীন আস্থাশীল। এ বিষয়ে মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও চীনা দূতবাসের বক্তব্য জানা যায়নি।

গার্ডার দুর্ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কমিটিতে। সওজের প্রধান প্রকৌশলী সমকালকে বলেছেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত না করে বিআরটির উড়াল অংশের কাজ করছে চীনা ঠিকাদার- এ অভিযোগ পেয়ে গতকাল চিঠি দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাজ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সওজের প্রধান প্রকৌশলী এবং প্রকল্পের পরিচালকরা গতকাল সরেজমিন উত্তরা এলাকা পরিদর্শন করেন। সওজ অংশের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এ এস এম ইলিয়াস শাহ সমকালকে বলেছেন, ঠিকাদার নিরাপত্তা পরিকল্পনা দেবে। সরকার ও অর্থায়নকারীরা তা অনুমোদনের পর কাজ শুরু হবে। এতে কত দিন সময় লাগবে, তা জানাননি পিডি।

পাঁচজনের মৃত্যুতে বিআরটি প্রকল্পের অনিয়ম আলোচনায় এলেও অতীতে বারবার ছাড় দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ধরা পড়েও শাস্তি পায়নি। নির্ধারিত সময়ে কাজ না করা, দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, টাকার জোগান না থাকা এবং স্থানীয় সরবরাহকারীদের বিল বাকি ফেললেও চিঠি দেওয়া ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পূর্ণাঙ্গ নকশা ছাড়াই ২০১৭ সালে বিআরটির কাজ শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীনা ঠিকাদারের ২০১৯ সালে কাজ শেষ করার কথা ছিল। প্রকল্পের ব্যয় ২ হাজার ৩৯ কোটি থেকে বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়।

সূত্র: সমকাল
এম ইউ/১৯ আগস্ট ২০২২

Back to top button