ইসলাম

মসজিদে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে শিশুরা

সাইফুল ইসলাম তাওহিদ

মসজিদে শিশুদের আগমন বা তাদের উপস্থিতিকে সমাজের অনেকে ভিন্ন চোখে দেখে। কেউ কেউ ভালো চোখে দেখলেও অনেকে বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখে থাকে। এ নিয়ে কখনো কখনো মাতামাতিও হয়। তবে নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করলে ভিন্ন ফলাফল সামনে আসে।

নববী যুগে মসজিদে নববীতে শিশুদের উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয়। তারা মসজিদে আসত, খেলত এবং আনন্দ করত। রাসুল (সা.) তাদের কখনো বাধা দেননি। তাদের ধমকও দেননি; বরং রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে তাদের মধুর স্মৃতি রয়েছে। রাসুল (সা.) তাদের জন্য নামাজ সংক্ষিপ্ত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুরা সাত বছর বয়সে উপনীত হলে তাদের নামাজের আদেশ দিতে বলেছেন।
মসজিদে শিশুদের নিয়ে আসতেন : শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) বলেন, একদিন এশার নামাজের সময় রাসুল (সা.) আমাদের দিকে বের হয়ে এলেন। তখন তিনি হাসান অথবা হুসাইন (রা.)-কে বহন করে আনছিলেন। রাসুল (সা.) সামনে অগ্রসর হয়ে তাকে রেখে দিলেন। এরপর নামাজের জন্য তাকবির বললেন ও নামাজ শুরু করলেন। নামাজের মধ্যে একটি সিজদা দীর্ঘ করলেন। (হাদিস বর্ণনানাকারী বলেন) আমার পিতা (শাদ্দাদ) বলেন, আমি আমার মাথা তুললাম এবং দেখলাম, ওই ছেলেটা রাসুল (সা.)-এর পিঠের ওপর রয়েছেন। আর তিনি সিজদারত অবস্থায় আছেন। অতঃপর আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসুল (সা.) নামাজ শেষ করলে লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আপনার নামাজের মধ্যে একটি সিজদা এত দীর্ঘ করলেন এতে আমরা মনে করলাম, হয়তো কোনো ব্যাপার ঘটে থাকবে। অথবা আপনার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছে। তিনি বললেন, এর কোনোটাই ঘটেনি, বরং আমার ওই (অধস্তন) সন্তান আমাকে সাওয়ারি বানিয়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম, যাতে সে তার কাজ সমাধা করতে পারে। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১১৪১)

শিশুসুলভ আচরণ সহ্য করতেন : আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, একদা আমরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে এশার নামাজ পড়ছিলাম। রাসুল (সা.) যখন সিজদা দিতেন তখন হাসান-হুসাইন (রা.) লাফ দিয়ে রাসুল (সা.)-এর পিঠে উঠতেন। আর রাসুল (সা.) সিজদা থেকে মাথা তোলার সময় পেছন থেকে হাত দিয়ে তাদের নামিয়ে দিতেন। এভাবে রাসুল আবার সিজদা দিলে তারাও (হাসান-হুসাইন) আবার রাসুল (সা.)-এর পিঠে চড়তেন। এভাবে রাসুল (সা.) নামাজ শেষ করতেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১০৬৫৯)

মসজিদে শিশুর স্বাধীনতা : অন্য বর্ণনায় আছে, রাসুল (সা.) যখন সিজদা দিতেন তখন হাসান-হুসাইন (রা.) লাফ দিয়ে রাসুল (সা.)-এর পিঠে উঠতেন। তখন সাহাবারা তাদের নিষেধ করতে চাইলে রাসুল (সা.) সাহাবাদের হাতের ইশারায় বোঝালেন তারা যেন তাদের (হাসান হুসাইন)-কে ছেড়ে দেয়। এভাবে তিনি নামাজ শেষ করলেন। (সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস : ৮৮৭)

উল্লিখিত হাদিস দুটি আমাদের সামনে মসজিদে নববীর দুটি চিত্র বর্ণনা করছে। ফুঠে উঠেছে মসজিদে নববীতে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে শিশুদের এক মধুর মুহূর্ত। প্রথম হাদিসে দেখা যায়, হাসান অথবা হুসাইন (রা.) কেউ একজন রাসুল (সা.)-এর পিঠে চড়ার কারণে তিনি নামাজে সিজদাকে দীর্ঘ করলেন। আর বললেন, ‘আমি তাড়াতাড়ি উঠতে অপছন্দ করলাম, যাতে সে তার কাজ সমাধা করতে পারে। ’

জুমার দিন শিশুদের মসজিদে আনা : বুরাইদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) আমাদের খুতবা দিচ্ছিলেন। এ অবস্থায় হাসান ও হুসাইন (রা.) চলে এলো। তাদের গায়ে ছিল দুটি লাল জামা, তারা হোঁচট খেতে খেতে চলছিল। রাসুল (সা.) মিম্বর থেকে নেমে তাদের উঠালেন এবং সামনে রাখলেন। এরপর বললেন, আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের সম্পদ ও সন্তান ফিতনা। ’ আমি এ দুটি বাচ্ছাকে দেখলাম তারা হাঁটছে আর হোঁচট খাচ্ছে। আমি আর ধৈর্যধারণ করতে পারলাম না। ’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১১০৯)

উল্লিখিত ঘটনাগুলো মসজিদে নববীতে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গেই ঘটেছে। বর্ণিত ঘটনাগুলোর মাধ্যমে তিনি তাঁর উম্মতকে এ বার্তা দিচ্ছেন যে মসজিদ হলো তরবিয়াতের অন্যতম পাঠশালা। এ মসজিদ থেকেই ছোটরা ঈমান-আমলের শিক্ষা গ্রহণ করবে। তারা বড়দের থেকে দেখে দেখে শিখবে। শৈশবে তারা মসজিদে এলে ইবাদতের প্রতি উৎসাহী ও অভ্যস্ত হবে। একজন আদর্শ মানুষ গঠনে মসজিদের বেশ গুরুত্ব রয়েছে। সুতরাং ছোটদের মসজিদে নিয়ে আসার বিষয়টি কেউ যাতে ভিন্ন চোখে না দেখে। এতে তাদের জন্য কল্যাণকর দিক রয়েছে । তবে ফকিহ আলেমরা বলেন, শিশু কিছুটা বুঝমান হওয়ার পরই মসজিদে আনা উত্তম।

বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে এটাও বোঝা যায় যে শিশুদের বহন করে নামাজ আদায় করা যাবে। এটি নামাজ ভঙ্গের অনুঘটক নয় বা এটি নামাজে নিষিদ্ধ কোনো বিষয়ও নয়। যদি না আমলে কাসিরের (এমন কাজ যা করলে মনে হয় তিনি নামাজ পড়ছেন না) পর্যায়ে না পৌঁছায়। আবার অনেকে মসজিদে ছোট বাচ্চারা দুষ্টুমি করলে তাদের রূঢ় ভাষায় ধমক দিয়ে থাকেন। তাদের বকাঝকা করেন। এটি শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাদের মসজিদ থেকে বিমুখ করে। এটি রাসুল (সা.)-এর আদর্শ ও সুন্নতের বিপরীত।

এ ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য হলো তাদের মসজিদমুখী করে গড়ে তোলা। তাদের অন্তরে মসজিদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা। মসজিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক মজবুত করা। তারা কোনো ভুল বা অন্যায় করলে তাদের ধমক না দেওয়া; বরং কোমল ও মার্জিত ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া।

আইএ

Back to top button