জাতীয়

জব্দ হলেই গাড়ির সর্বনাশ

মাহমুদুল হাসান নয়ন

ঢাকা, ১৯ আগস্ট – খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে সারি সারি গাড়ি। রিকশা, মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে বিলাসবহুল গাড়ি মার্সিডিজ, কী নেই সেখানে। অথচ প্রায় সব গাড়ির ওপরেই জমেছে ধুলোর আস্তরণ।

রোদ-বৃষ্টির কারণে ধরেছে মরিচা। চাকাগুলো মিশে গেছে ফ্লোরের মাটি কিংবা কংক্রিটের আস্তরণের সঙ্গে। বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা এসব গাড়ির আশপাশে শেওলা ও পলি জমে নতুন প্রাণেরও সঞ্চার হয়েছে। জন্মেছে লতাগুল্ম। যা বেয়ে বেয়ে ছেয়ে দিয়েছে পুরো গাড়ি।

এভাবে বিভিন্নজনের শখের কিংবা প্রয়োজনের গাড়িগুলো রাখার জায়গা যেন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। একটা পর্যায় গিয়ে মালিকও যেন চিনতে পারছেন না নিজের গাড়ি। এমন অবস্থা রাজধানীতে বিভিন্ন অপরাধ ও অভিযোগের প্রমাণ হিসাবে জব্দ হওয়া গাড়িগুলোর। যেগুলো পড়ে আছে থানা কম্পাউন্ড কিংবা বাইরের সড়কে। ঢাকার বিভিন্ন ডাম্পিং স্টেশন ও থানা এলাকা সরেজমিন ঘুরে পাওয়া গেছে এমন চিত্র।

গাড়ির মালিকরা বলছেন, পুলিশ আর আদালতের দরজায় দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় তারা নিজ পরিবহণ ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিচ্ছেন। অযত্ন-অবহেলায় বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় গাড়িগুলোর এমন অবস্থা হচ্ছে যে, সেগুলো আর ব্যবহার উপযোগী থাকছে না। অনেক সময় গাড়িগুলো থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনাও ঘটছে।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে ডাম্পিংয়ের জায়গায় গিয়ে নিজ গাড়িটি সংরক্ষণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে কোনো কারণে একবার গাড়ি জব্দ হলেই সর্বনাশ। আদালতের নির্দেশে কিছু গাড়ি মালিকরা ফিরে পান। তবে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি বুঝে পান না এমন ঘটনাই বেশি। আর মামলাগুলো নিষ্পত্তি হতে সাধারণত ৮-১৫ বছর লেগে যায়।

এই সময়ে নষ্ট হয়ে যায় গাড়ির যন্ত্রাংশ। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এসব গাড়ি নিয়ে বিপাকে পড়ার কথা জানিয়েছে পুলিশও। তাদের দাবি, নিরুপায় হয়েই গাড়িগুলো তারা এভাবে রাখেন। এ অবস্থায় জব্দ হওয়া হাজার কোটি টাকার গাড়ি সংরক্ষণে মান্ধাতা আমলের পরিবর্তে আধুনিক ব্যবস্থাপনার প্রতি জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গাড়িগুলো নিয়ে থাকা আপত্তি নিরসন করে ব্যবহারের ব্যবস্থা করারও প্রতিও জোর দিয়েছেন তারা। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইন সংশোধনেরও পরামর্শ তাদের।

জানতে চাইলে পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, আমরা যেই সমস্যাটি নিয়ে কথা বলছি সেটি অন্যান্য দেশে ইতোমধ্যে সমাধান হয়ে আছে। এর মানে হলো-সমাধান রয়েছে, অভাব শুধু উদ্যোগের। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় গাড়িগুলো ডাম্পিংয়ে থেকে যায়। অনেক সময়ে নিষ্পত্তি হওয়ার পর গাড়িগুলো আর ব্যবহারো উপযোগী থাকে না। ফলে মালিকও নিতে আসে না। এতে গাড়িগুলো ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। এভাবে আমাদের মতো গরিব একটা রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের সম্পদ নষ্ট হয়। উন্নত বিশ্বে গাড়ির এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো খুব দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, রাজধানী নিয়ে আমাদের পরিকল্পনায় বিরাট ত্রুটি আছে। সে কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পার্কের মধ্যে ডাম্পিং হয়, বিভিন্ন মাঠে, রাস্তায়, ফুটপাতে ডাম্পিং হয়। তাও আবার আইনশৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনী এ কাজ করছে। দেশে ডাম্পিংয়ের এ অব্যবস্থাপনার ফলে পুলিশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই পুলিশকেই এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসে আইনি জটিলতাগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে।

এদিকে সারা দেশে কিংবা ঢাকায় কত সংখ্যক গাড়ি এভাবে ডাম্পিং স্টেশনে রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি পুলিশের কাছ থেকে। তবে ঢাকার বিভিন্ন থানা ও ডাম্পিং স্টেশনগুলো ঘুরে জব্দ গাড়ি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। এসব জায়গায় কয়েক হাজার গাড়ি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থেকে এখন ভগ্নদশা হয়েছে।

এরমধ্যে শাহবাগ, গুলশান, বসিলা, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, মগবাজার, বনানী থানা ও ডাম্পিং স্টেশনেই আড়াই হাজারের কাছাকাছি গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। যত্রতত্র গাড়ি রেখে থানা ও এর আশপাশের এলাকায় রীতিমতো ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত করা হয়েছে।

ভাড়া বাসায় স্থাপন করা থানাগুলোর আশপাশের অলিগলিতে গাড়ি রাখায় সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ের সামনের সড়কেও দেখা গেছে গাড়ির রাখার চিত্র। এ অবস্থায় ঢাকায় চারটি স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন চেয়ে সিটি করপোরেশনের কাছে আবেদন করেও সাড়া পায়নি বলে জানায় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। মাতুয়াইলে তাদের একটি জায়গা দেওয়া হলেও দূরত্বের কারণে সেখানে গাড়ি কম যায় বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, এসব তো আজকের জঞ্জাল না, যুগ যুগের জঞ্জাল। আদালতের অনুমতি নিয়ে এগুলো সরানোর চিন্তা চলছে। তবে পুলিশকে ডাম্পিংয়ের জন্য যে জায়গা দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এই সমস্যার সমাধান আগে করতে হবে। এই গাড়িগুলোর জন্য মানুষ বিড়ম্বনায় পড়ছেন। এগুলো নিয়ে আমরাও ঝামেলায় আছি। অনেক গাড়ি আমরা আদালতের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেই। কিন্তু কিছু বিষয়ে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাখতে হয়। অনেক যানবাহনের ১০-১৫ বছর হয়ে গেয়ে, গাড়ির কিচ্ছু নেই, এগুলোই পড়ে আছে। এসবের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও নেই। তাই এগুলোর নিষ্পত্তি দ্রুত করা গেলে সমস্যাও অনেকটা মিটবে।

এ সময় তিনি জানান, আদালতের অনুমতি নিয়ে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের জব্দকৃত গাড়িসহ কিছু গাড়ি পুলিশ ব্যবহার করছে। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। আর সিরিয়াস ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত গাড়িগুলো আলামত নষ্টের শঙ্কায় পুলিশ সাধারণত ব্যবহার করতে চায় না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান থানায় গিয়ে দেখা যায়, থানার সামনে সড়কে পড়ে আছে সারি সারি গাড়ি। এরমধ্যে কিছু গাড়ি দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। কিছু গাড়ি নতুন এসেছে। আবার অনেক গাড়িতে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। এরমধ্যে মোটরসাইকেল, বাস, প্রাইভেট কার, পিকআপ, কার্গো ভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবহণ রয়েছে।

এর কোনোটির লাইট ও লুকিং গ্লাস নেই, কোনোটির সামনের গ্লাসগুলো ভাঙা, চাকাগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিচের মাটিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম। জীর্ণ গাড়িগুলোর অধিকাংশই অন্তত অর্ধযুগ আগের বলে জানান একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা। এদিকে থানার পাশের প্রশস্ত সড়কের দুটি লেন, ফুটপাত দখল হয়ে আছে এসব গাড়িতে। ফলে একদিকে জনসাধারণের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে সড়ক সংকীর্ণ হওয়ায় যান চলাচলেও তৈরি হচ্ছে নানা সমস্যা।

যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় ফ্লাইওভারের নিচেও রাখা হয় ডাম্পিংয়ের গাড়ি। সেগুলোতে রীতিমতো বিভিন্ন দলীয় পোস্টার, হারানো বিজ্ঞপ্তি ও চাকরির বিজ্ঞাপনের পোস্টার টাঙানো হয়েছে। বাস স্টপেজের জন্য নির্ধারিত স্থানেও রাখা হয়েছে ডাম্পিংয়ের গাড়ি। এতে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।

এ থানায় অন্তত ২০টি যানবাহন বেয়ে উঠেছে লতাপাতা। খিলগাঁও থানায় ঢুকতেই মূল ফটকে দেখা যায় তিনটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। আর শেরেবাংলা নগর থানায় কয়েকটি গাড়ি মরিচা ধরে নষ্ট হতে হতে মাটিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম। পড়ে থাকতে থাকতে কয়েকটি গাড়ির ওপরের রংয়ের আস্তরণ উঠে গেছে। মতিঝিল থানার সামনের সরু সড়কেও গাড়ি রাখা হয়েছে।

বংশাল থানা ফটকের সামনেই দেখা যায় দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি লরির। আরেক পাশে পড়ে ছিল ভিক্টর পরিবহণের একটি পোড়া বাস এবং একটি ট্রাক। যা সড়কের একটি লেন দখল করে ছিল।

শাহবাগ থানার ডাম্পিংয়ে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা গাড়িগুলোর আশপাশে রীতিমতো জঙ্গল হয়ে গেছে। দেখে মনে হবে যেন কোনো জঙ্গলের মধ্যে গাড়িগুলোকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এত পরিমাণ গাড়ি সেখানে জমেছে, বড় ট্রাকের ওপরে যাচ্ছেতাইভাবে ছোট পিকআপ, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও সিএনজি উঠিয়ে রাখা হয়েছে। থানা এলাকায় থাকা একজন রসিকতা করে বললেন, ‘ভাই, গাড়িগুলোর যা অবস্থা, কেজি দরে দিলেও মনে হয় কেউ কিনবে না।’

এদিকে অনুমোদনহীন গাড়ি বিক্রির জন্য মাঝেমধ্যে কিছু নিলাম আয়োজন করা হয়। ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত সূত্র জানায়, ওইসব আয়োজনে অনেক গাড়ি বিক্রি হয়। তবে কিছু আইনি জটিলতা, মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও সদিচ্ছার অভাবে সব গাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল্লাহ আবু বলেন, মামলার আলামত হিসাবে গাড়িগুলো থাকে। অনেক সময় দেখা গেছে মামলা শেষ হলেও আলামতগুলো সেখান থেকে সরানো হয় না। একটা গাড়ি ২০-২৫ বছর ধরে পড়ে থাকে। গাড়িগুলোর তালিকা করে আদালতের অনুমতি নিয়ে পুলিশের এগুলো সরানো উচিত। এসব নিয়ে একাধিকবার মিটিংও হয়েছে। কিছু গাড়ির মালিকরাও দরখাস্ত দিয়ে এগুলো নিতে পারেন।

সূত্র: যুগান্তর
আইএ/ ১৯ আগস্ট ২০২২

Back to top button