জাতীয়

ডিম কারসাজিতে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীরা

ঢাকা, ১৯ আগস্ট – এবার ডিম নিয়ে কারসাজি হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত ডিম ব্যবসায়ী সমিতির অসাধু সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়িয়েছে। তারা পাইকারি পর্যায়েই ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি দাম নিচ্ছে।

অবৈধভাবে এ দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে ডিম ব্যবসায়ী সমিতি। ফলে খুচরা পর্যায়ে দাম মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এ ক্ষেত্রেও অজুহাত হিসাবে দেখানো হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি।

খোদ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এর সঙ্গে ডিম ব্যবসায়ী সমিতি জড়িত। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ডিমের বিভিন্ন আড়তে সরকারিভাবে অভিযান চালানো হয়।

এর আগে বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে ডিম আমদানি করা হবে। তার এমন ঘোষণার পরই পাইকারী বাজারে ডিমের দাম কমতে থাকে। এরপর বৃহস্পতিবার বিভিন্ন আড়তে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার। সরকারের এমন কঠোর পদক্ষেপে একদিনেই পাইকারি পর্যায়ে ডিমের দাম ডজনে ২০ টাকা কমে আসে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা পর্যায়েও। হালিতে কমেছে পাঁচ থেকে সাত টাকা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জব্বার মন্ডলের সঙ্গে বৃহস্পতিবার কথা হয়। তিনি বলেন, ডিমের বাজারে কারসাজির সঙ্গে ডিম ব্যবসায়ীরা জড়িত। পাইকারি ব্যবসায়ীরা কেনা দামের পর প্রত্যক্ষ খরচ যোগ করে তার সঙ্গে শতকরা ১৫ ভাগ লাভ করতে পারবে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য এই হার ২৫ ভাগ। অথচ কারসাজি করে ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ লাভ করছে শুধু পাইকাররা। অবৈধভাবে এ দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে ডিম ব্যবসায়ী সমিতি। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার তারা তেজগাঁও ডিমের আড়ৎ ও কাওরান বাজারে অভিযান চালিয়েছেন।

এতে বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়ায় হিমালয় ট্রেডার্স, জনতা মা মনি আড়তকে ২০ হাজার করে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি কাওরান বাজারে সততা মুরগির আড়তকে ২০ হাজার টাকা ও আলহাজ অ্যান্টারপ্রাইজকে ১০ হাজার টাকাসহ চার প্রতিষ্ঠানকে মোট ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

তিনি বলেন বেশির ভাগ আড়তে ডিমের মূল্য তালিকা নেই। এছাড়া ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো রশিদ বা ভাউচার দেখাতে পারেনি। তাই তাদের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। বাজারে অস্থিরতা কাটাতে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আমান উল্ল্যাহ। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার তেজগাঁও এলাকায় ভোক্তা অধিদপ্তর অভিযান চালিয়েছে।

এ সময় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানাও করা হয়। তারা আমাদের কাঁধে দায় চাপিয়েছে। আমরা নাকি ডিমের দাম বাড়িয়েছি, দাম নিয়ন্ত্রণ করি। আমরা ডিমের দাম বাড়াইনি। পরিবহণ খরচসহ নানা কারণে ডিমের দাম বেড়েছে। দেশে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ডিম উৎপাদন হয়।

কিন্তু তেজগাঁওয়ে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ লাখ ডিম আসে। বেশি দামে কিনতে হয় বলেই, বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে ডিম কিংবা পোল্ট্রি বাজারে দাম খামারিরা বাড়ায়নি। মধ্যস্বত্বভোগীরাই দাম বাড়াচ্ছে। এ জন্য দায়ী তারাই। দেশে বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে এক কোটি ৪০ লাখ ডিম উৎপাদন হচ্ছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। তবে, করোনার আগে সপ্তাহে দুই কোটির বেশি ডিম উৎপাদন হতো।

তিনি বলেন, কোনো একটি চক্র চাচ্ছে ডিম আমদানি করতে। এমন সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতীর সমান। কারণ, ডিমের দাম কমতে শুরু করেছে। হয়তো আগের দামে যাবে না, তবে ১৩-১৪ টাকার স্থালে ১১টায় পৌঁছবে। এখন যদি দামের অজুহাত দেখিয়ে ডিম আমদানি করা হয়, তাহলে এ শিল্প খাত ধ্বংসের দিকে যাবে। তিনি বলেন, মাছ মাংসের আগুন দরের জন্যই ডিমের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গত সপ্তাহে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ট্রাক চলাচলে বিঘ্ন ঘটনায় পরিবহণ খাতে দাম বেড়ে যায়, যা ডিমের বাজারে প্রভাব ফেলে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা বলেন, সাধারণ ক্রেতার মধ্যে ডিম এবং মাংসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। এ দাম বৃদ্ধির সঙ্গে একটি সুবিধাভোগী চক্র জড়িত। আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বারবার বৈঠক করেছি।

ইতোমধ্যে পোল্ট্রি ফিডের দাম কমাতে নিজেদের মধ্যে বৈঠকসহ বাণিজ্যি মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ডিম আমদানি হবে কিনা আমি জানি না। দেশে পর্যাপ্ত ডিম রয়েছে। প্রায় ৮৫ শতাংশ খামারি প্রান্তিক, যারা দিনের পর দিন চেষ্টা করে এ খাত দাঁড় করিয়েছেন। ডিম আমদানি করা হলে তাদের ওপর প্রভাব পড়বে।

বিভিন্ন স্থানে অভিযান-আমদানির খবরে হিলিতে কমেছে

ডিমের দাম : ডিম ও মুরগির মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন স্থানে বৃহস্পতিবার অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বাজার মনিটরিং টিম। এ সময় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। এদিকে, ভারত থেকে ডিম আমদানির খবরে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি বাজারে কমেছে ডিমের দাম। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

হাকিমপুর (দিনাজপুর) : হিলিতে একদিনের ব্যবধানে প্রতিটি ডিমের দাম কমেছে ১ টাকা। একদিন আগে প্রতি পাতা (৩০ পিস) ডিম ৩৬০ টাকায় বিক্রি হলেও তা কমে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

হিলি বাজার ঘুরে বৃহস্পতিবার এ তথ্য পাওয়া গেছে।

হিলি বাজারে ডিম কিনতে আসা আনছার আলী বলেন, বাজারে সব পণ্যের দামই বেশি। এর মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির খবর যে ডিমের দাম কমেছে। প্রতি পিস ডিম ১১ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। তবে চাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, বিভিন্ন মসলাসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম বেশি। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। ব্যয় যেভাবে বেড়েছে আয় তো সেই ভাবে বাড়েনি। কীভাবে সংসার চলবে সেই চিন্তায় ঘুম আসছে না। হিলি বাজারের ডিম বিক্রেতা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, মুরগির খাবারের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় কয়েকদিন ধরে ডিমের দাম বৃদ্ধি করে দিয়েছে খামার মালিকরা। এ কারণে বেশি দামে ডিম কিনতে হচ্ছে ও বেশি দামে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে।

হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর-এ আলম বলেন, হিলি বাজারসহ আশপাশের বাজারগুলোতে কোনো অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন নিত্যপণ্যের দাম বেশি না নিতে পারে সেজন্য নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।

বরিশাল : বরিশাল নগরীর বাজার রোডে বৃহস্পতিবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়েছে। এ সময় মূল্য তালিকা হালনাগাদ না করা ও প্রকাশ্যে তা না টানানোর দায়ে চার দোকানদারকে ১৪ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক অপূর্ব অধিকারী। তিনি বলেন, ডিম ও মুরগির বাজার নিয়ন্ত্রণে এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানের সময় মূল্য তালিকা হালনাগাদ না করা ও প্রকাশ্যে তা না টানানোর দায়ে চার দোকানদারকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লা : কুমিল্লায় অতিরিক্ত দামে ডিম বিক্রির অভিযোগে ৮ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ২৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নগরীর রাজগঞ্জ বাজার, নিউমার্কেটসহ আশপাশের এলাকায় বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযান পরিচালনা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সময় নিউমার্কেটের রফিক স্টোর ও বাবুল স্টোর নামে দুটি ডিম দোকানকে ৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। দোকানে ক্রয় ভাউচার না রাখা ও অতিরিক্ত দামে মুরগি বিক্রির অভিযোগে একই মার্কেটের ভাই ভাই ব্রয়লার হাউজকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া রাজগঞ্জ বাজারের রাজ্জাক ব্রয়লারকে ৩ হাজার টাকা ও হাশেম পোলট্রিকে ৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ৮টি প্রতিষ্ঠানকে ২৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কুমিল্লার সহকারী পরিচালক মো. আছাদুল ইসলাম বলেন, কৃষি বিপণন আইন অনুযায়ী ক্রেতাকে ঠকিয়ে ডিম বিক্রি করে অধিক মুনাফা নিচ্ছিল এসব ব্যবসায়ী। মুরগির দোকানেও একই অবস্থা। ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত লাভে মুরগি বিক্রি করার অভিযোগ তদারকি করে মুরগি দোকানিদের জরিমানা করা হয়।

সূত্র: যুগান্তর
আইএ/ ১৯ আগস্ট ২০২২

Back to top button