জাতীয়

মেগা প্রকল্পে নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই

অমিতোষ পাল

ঢাকা, ১৬ আগস্ট – এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার কিংবা ফুট ওভারব্রিজ তৈরির সময় গার্ডার বা নির্মাণসামগ্রী পড়ে মৃত্যুর ঘটনা উত্তরারটিই প্রথম নয়। এর আগেও একই রকম দুর্ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন সময়। হয়েছে প্রাণহানিও।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও পুরকৌশল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিরাপদ নির্মাণকাজের কারণেই বারবার একই দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা তদারককারী কর্মকর্তাদের বরাবরই দেখা গেছে উদাসীনতা। তাঁরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তো দূরে থাক, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে প্রণীত জাতীয় নির্মাণবিধিই (ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড) মানছেন না। ফলে এরকম দুর্ঘটনার বৃত্ত থেকে বেরও হওয়া যাচ্ছে না।

তাঁরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাণবিধি আমেরিকান সোসাইটি অব টেস্টিং ম্যাটেরিয়াল (এএসটিএম) এবং ব্রিটেনের বিএস (ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড) বিধিতেও নির্মাণ পদ্ধতির মূল বিষয়ই হচ্ছে নিরাপত্তা।

নিরাপত্তার বালাই নেই :ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম গত ১১ আগস্ট রাজধানীতে চলমান বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই সময় তিনি জনদুর্ভোগ যাতে না হয়, সেভাবে মেট্রো রেল, বিআরটি ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজ করতে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেন। তাঁর দেওয়া নির্দেশনার চতুর্থ দিনের মাথায় ঘটল উত্তরার মর্মন্তুদ দুর্ঘটনা।

এদিকে উত্তরা ট্র্যাজেডির পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। রাজধানীতে মেট্রোরেল, বিআরটিসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর নিচ দিয়ে বেশিরভাগ এলাকায় রাস্তা। এসব রাস্তা দিয়ে সব সময় চলাচল করছে গাড়ি ও পথচারী। যেখানেই ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল বা এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে, স্থাপনার নিচে গেলেই পথচারী কিংবা গাড়ির যাত্রীদের মনে ভয় চেপে বসছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাকে প্রতিদিন মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ের নিচ দিয়ে গাড়িতে করে যেতে হয়। এখন মনে হচ্ছে, এই বুঝি কোনো একটি গার্ডার গাড়ির ওপর এসে পড়ল।’

নিয়ম না মানার কারণে বারবার দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে মানুষ। ২০১৬ সালের মার্চে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক নির্মাণকাজের সময় রডের আঘাতে এক শ্রমিক মারা যান। ২০০০ সালে মিরপুর রোডের সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ফুট ওভারব্রিজের গার্ডার পড়ে মারা যান মাগুরা টেক্সটাইলসের এক কর্মকর্তা। একই বছর নতুনবাজারে আমেরিকান দূতাবাসের সামনে ফুট ওভারব্রিজ ভেঙে মারা যান তিনজন। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে মারা যান ১২ জন।

আরও যত দুর্ঘটনা :গত ৩০ মে রাজধানীর পল্লবীতে মেট্রোরেলের স্টেশন থেকে ইট পড়ে সোহেল তালুকদার নামে এক দোকান কর্মচারী মারা যান। তিনি ছিলেন মিরপুর ১০ নম্বর শাহআলী শপিং কমপ্লেক্সের সিরাজ জুয়েলার্সের কর্মী। মেট্রো রেলস্টেশনের নির্মাণকাজ চলার সময় হেঁটে যাওয়ার পথে ওপর থেকে মাথায় ইট পড়লে তিনি আহত হন। পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

২০২১ সালের ১৪ মার্চ বিমানবন্দর এলাকায় এক্সপ্রেসওয়ের একটি গার্ডার ধসে পড়ে। ওই সময় এক্সপ্রেসওয়েতে কর্মরত দু’জন চীনা নাগরিকসহ চারজন আহত হন। বিমানবন্দর অংশের তিন নম্বর স্প্যানে গার্ডার স্থাপনের সময় ওই দুর্ঘটনাটি ঘটে।

এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ মালিবাগ রেলগেট এলাকায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে স্বপন নামে আরেকজন নিহত হন। আরও দু’জন আহত হন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অভিজ্ঞ ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়। তাঁদের কাজ দেওয়া হয় বেশি খরচে। কারণ হলো- তাঁরা যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে কাজটা করেন। দিন কিংবা রাত হোক- এ ধরনের নির্মাণকাজ করার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনীর ব্যবস্থা রাখতে হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় টাকাও বরাদ্দ রাখা হয় প্রকল্পে। তবে বাস্তবে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। কারণ সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী রাখা হচ্ছে না। ঠিকাদার টাকা বাঁচাতে এ কাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। প্রতিটি প্রকল্পে একটি সুপারভিশন এক্সপার্ট টিম থাকে। তাদের বলা হয় ‘তৃতীয় নয়ন’। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে কাজটি করছে কিনা, সেটা তাঁদের দেখার দায়িত্ব। এ ধরনের প্রকল্পে বছরের ৩৬৫ দিনই তদারকি করার কথা থাকলেও তা আর হচ্ছে কই।

তিনি আরও বলেন, গার্ডার তোলার মতো একটি ক্রেন পরিচালনার চালককে হতে হয় অত্যন্ত অভিজ্ঞ। কারণ একটু হেলে গেলেই গার্ডার পড়ে যেতে পারে। দেখতে হবে, উত্তরার ওই ঘটনায় ক্রেন চালকের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও লাইসেন্স ছিল কিনা। হয়তো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনে করতে পারে, সাধারণ একজন ক্রেন চালক হলেই হলো। এগুলোর জোর তদন্ত করতে হবে। অতীতে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর তদন্তে কোনো ঠিকাদারের শাস্তি হয়েছে কিনা সেগুলোও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। ঠিকাদারসহ যারা সুপারভিশনের দায়িত্বে থাকেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আমাদের দেশে কনস্ট্রাকশন ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। ঢাকার মতো বড় শহরে যখন মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ হয়, তখন তদারকির ব্যবস্থাও সেই রকম পর্যাপ্ত রাখা উচিত। যেখানে মানুষ চলাচল করে, সেখানে বাড়তি সতকর্তা নিতে হয়। দেখছি মানুষ চলাচলের সময়ও ক্রেন দিয়ে গার্ডার তোলা হচ্ছে। আবার অনেকে গার্ডার তুলছে দেখেও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। নিরাপত্তা বেষ্টনী এমনভাবে করতে হবে, যাতে কেউ চলাচলের সুযোগ না পায়। জবাবদিহিতা ও অবহেলার কারণে বারবার এরকম দুর্ঘটনা ঘটলেও কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। এটা তদন্ত করে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সূত্র: সমকাল
আইএ/ ১৬ আগস্ট ২০২২

Back to top button