ঢাকা

রাজধানীতে গণপরিবহণে হিজড়াদের চাঁদাবজি, অতিষ্ট যাত্রীরা

ঢাকা, ১৩ আগস্ট – রাজধানীর গণপরিবহণে হিজড়াদের (তৃতীয় লিঙ্গ) চাঁদা আদায়ের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। একদিকে যেমন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ভাড়া বেড়েছে, অপরদিকে ঢাকার একাধিক পয়েন্টে হিজড়াদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন পরিবহণ যাত্রীরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা এই জনগোষ্ঠীর কাছে রীতিমতো অসহায়। চলার পথে দুই থেকে তিন জায়গায় তাদের চাঁদা দিতে হয়। এ চাঁদা আবার ১০ টাকার কম দেওয়া যায় না; কম হলেই হতে হয় নাজেহাল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও হিজড়াদের এমন আচরণের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

জানা গেছে, এলাকা ভাগ করে বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানপাটে সপ্তাহে একদিন চাঁদা (তোলা) নিত হিজড়ারা। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে হিজড়ারা দোকানপাটের পাশাপাশি গণপরিবহণে উঠে যাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। রাজধানীর গাবতলী, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১০, বনানী, জাহাঙ্গীর গেট, ফার্মগেট, মৎস্যভবন, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় দলবেঁধে গণপরিবহণে উঠে তারা। যাত্রীরা চাঁদা দিতে না চাইলে হিজড়ারা অশ্লীল সব কৌশল অবলম্বন করে। বিভিন্ন বাসে এদের মারমুখী আচরণে অনেকেই হেনস্তার শিকার হন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে হিজড়া গুরুদের ডেকে সাবধান করে দেন। দু-একদিন হয়তো কিছুটা কমে, তারপর আবার একই অবস্থা। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একেক স্থানে ৭-৮ জন করে অবস্থান নেয় হিজড়ারা। প্রতিটি বাসে দুই থেকে তিনজন উঠেন, তালি বাজানোর পাশাপাশি অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা তুলেন। কেউ টাকা না দিলে তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়।

গাবতলীতে বুধবার বসুমতি পরিবহণের একটি বাসে উঠেন দুজন হিজড়া। প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে তারা ১০ টাকা করে আদায় করেন। এক যাত্রী ৫ টাকা দিতে চাইলে তারা টাকা না নিয়ে পালটা ওই যাত্রীকে নাজেহাল করে টেকনিক্যাল এলাকায় নেমে যায়। বাসে থাকা যাত্রী নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন গাবতলীতে এদের ১০ টাকা করে দিতে হয়। মিরপুরের দিকে গেলে ১০ নম্বরে আবার চাঁদা দিতে হয়। এমনিতেই বাস ভাড়া বেশি। মানুষ কয়বার হিজড়াদের টাকা দেবে। এসব দেখার কি কেউ নেই?

লাব্বাইক পরিবহণে সোমবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এলাকা থেকে তিন হিজড়াকে উঠে চাঁদা নিতে দেখা যায়। সুমনা নামের এক হিজড়া বলেন, আমরা ইচ্ছা করে চাঁদাবাজি করি নারে ভাই। পেটের ভাতের জইন্যে বাসে উঠি। হাত পেতে টাকা নি মানুষের কাছ থেকে। কেউ আমাদের একটা চাকরি দেউক। তাইলে আর টাকা তুলতে আসপো না। মৎস্যভবন এলাকায়ও দেখা গেছে একই চিত্র। বাস ও রিকশা যাত্রীদের কাছ থেকে হিজড়ারা টাকা তুলছেন। কেউ টাকা না দিতে চাইলেই তাকে গালিগালাজ করছে। হাতেগোনা কিছু হিজড়া ভালো আচরণ করলেও অধিকাংশই আক্রমণাত্মক। যাত্রীদের সঙ্গে পরিবারের কোনো সদস্য থাকলে হিজড়ারা আরও বেশি অপদস্থ করে। এতে যাত্রীরা সম্মান বাঁচাতে হিজড়াদের চাহিদা পূরণে বাধ্য হন।

জানা গেছে, কিছু মেয়েলি আচরণের পুরুষকে দলে ভিড়িয়ে হিজড়া গুরুমারা তাদের পুরুষাঙ্গ কর্তন করায়। এরপর চাঁদাবাজিতে নামায়। সম্প্রতি মালিবাগের একটি লেজার পার্লারের মালিককে গ্রেফতার করেছে ডিবি। সেই পার্লারের আড়ালে মালিক হাদিউজ্জামান অন্তত ১০০ পুরুষকে হিজড়ায় রূপান্তর করেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে তিনি হাতিয়েছেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, হাদিউজ্জামান ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারের পর ডিবি জানতে পেরেছে, একটি চক্র এসব মানুষকে হিজড়ায় রূপান্তর করে নানা অপকর্ম করাচ্ছে। চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে নজরদারি করা হচ্ছে।

হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবিদা সুলতানা মিতু বৃহস্পতিবার বলেন, সরকার হিজড়াদের উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু সঠিকভাবে কাজটা হচ্ছে না। যে কারণে হিজড়াদের দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হচ্ছে না। তিনি বলেন, সম্প্র্রতি ঢাকা শহরের গুরুমাদের নিয়ে আমরা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি নগর পরিবহণে হিজড়াদের কোনো ধরনের চাঁদাবাজি করা যাবে না। যদি কেউ পরিবহণে চাঁদাবাজি করে তবে এর দায়দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে।

তিনি বলেন, সরকার যদি হিজড়াদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে তবে আমরা বাসাবাড়ি, দোকানপাটে হিজড়াদের তোলাবাজি বন্ধের ব্যবস্থা করব।

জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়া সম্প্রদায়কে ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ মানুষ হিসাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এতে নাগরিক হিসাবে ভোটাধিকার ও পাসপোর্ট প্রাপ্তিসহ কিছু সমস্যা মিটলেও অনেক বিষয় অবহেলিত থেকে গেছে। পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত এসব মানুষ। হিজড়া সম্প্রদায়কে কর্মক্ষম, পুনর্বাসন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো এগিয়ে এলে সমস্যা কমবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ফারুক হোসেন বলেন, যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। তিনি বলেন, সরকার ও বাংলাদেশ পুলিশ এই সম্প্রদায়ের মানুষদের কর্মক্ষম ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সহানুভূতিশীল। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ এসব মানুষের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ট্রাফিক পুলিশে হিজড়াদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে হিজড়াদের কারও কারও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ দুঃখজনক।

সূত্র: যুগান্তর
আইএ/ ১৩ আগস্ট ২০২২

Back to top button