জাতীয়

সারাদেশের ব্যাংকের শাখায় নগদ ডলার কেনাবেচা

জিয়াদুল ইসলাম

ঢাকা, ১২ আগস্ট – বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাশ্রয় ও ডলার সংকট কাটাতে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে এবার সারাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় নগদ বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার সেবা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি সপ্তাহেই ব্যাংকগুলোতে এ ধরনের সেবা চালুর অনুমোদন দেওয়া শুরু হবে। নগদ ডলার কেনাবেচায় মানিচেঞ্জার ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরতা কমানো ও হুন্ডি প্রতিরোধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোন এলাকার কোন শাখায় এ ধরনের সেবা চালু করা হবে সেই সম্ভাব্য তালিকা চেয়ে আগামী রবিবার দেশের সব ব্যাংকের কাছে চিঠি দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বর্তমানে বৈদেশিক লেনদেনে নিয়োজিত অথরাইজড ডিলার ব্যাংকগুলোর শাখা থেকেই কেবল নগদ ডলার কেনাবেচনার অনুমতি রয়েছে। সারাদেশে এ ধরনের শাখার সংখ্যা খুব একটা নেই। যেগুলো আছে সেগুলোর বেশিরভাগই রাজধানী ঢাকা ও কয়েকটি বিভাগীয় শহরে অবস্থিত। ফলে নগদ ডলার কেনাবেচার জন্য মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয় প্রবাসী বাংলাদেশি থেকে শুরু করে দেশে আগত বিদেশি পর্যটকসহ সাধারণ মানুষদের। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে এনডোসমেন্ট বাধ্যতামূলক হলেও খোলাবাজারে সেই বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে মানি চেঞ্জাররা নগদ ডলারের বাজারে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। ডলারের বাজারে চলমান অস্থিরতার পেছনেও মানি চেঞ্জার ব্যবসায়ীদের বড় ভূমিকা রয়েছে। এ অবস্থায় মানি চেঞ্জার ব্যবসায়ীদের ওপর নগদ ডলার কেনাবেচার নির্ভরতা কমাতে ব্যাংকের অথরাইজড ডিলার শাখার বাইরে অন্য শাখায়ও নগদ ডলারসহ অন্য বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার সেবা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাথমিকভাবে শাখাগুলোতে একটি ডেস্কের মাধ্যমেই এ সেবা চালুর অনুমোদন দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা

বলেন, কোন কোন শাখায় এ ধরনের সেবার অনুমোদন লাগবে সেই তালিকা চেয়ে আমরা ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ওই তালিকা পাওয়ার পরই দ্রুত তাদের অনুমোদন দেওয়া হবে। আশা করছি চলতি সপ্তাহ থেকেই সারাদেশে ব্যাংকের শাখায় এ ধরনের সেবা চালু করা সম্ভব হবে।

দেশে চার মাসের বেশি সময় ধরে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। আমদানি ব্যয়ের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন ও প্রবাসী আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতার কারণে ডলারের সংকটকে কেন্দ্র করেই এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ডলারের বিপরীতে ক্রমশ মান হারাচ্ছে বাংলাদেশি টাকা। এ ছাড়া সংকটকে পুঁজি করে খোলাবাজারে ডলারের দাম রেকর্ড ১২০ টাকায় উঠেছে। বর্তমানে আন্তঃব্যাংকের সঙ্গে খোলাবাজারে ডলারের দামের পার্থক্য প্রায় ২৫ টাকা। আর ব্যাংকের চেয়ে খোলাবাজার রেট অনেক বেশি হওয়ায় হুন্ডিতে টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণেও ডিজিটাল হুন্ডি চাঙ্গা হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া বিমানবন্দর দিয়েও সরাসরি ডলার পাচার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশে ডলার আসার তুলনায় যাচ্ছে বেশি। তাই বিদেশে যাওয়ার সময় ক্যাশ ডলার বহনে নিরুৎসাহিত করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চিকিৎসা, শিক্ষা বা ভ্রমণ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই ডলারের আউট-ফ্লো বেড়ে গেছে। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সে পরিমাণ ডলার দেশে আসছে না। এ কারণেই খোলা বাজারে ডলারের দাম বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, আমদানি বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজারে ডলার সংকট হয়েছে। রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশের আমদানি বেশি। তাই আমদানি-রপ্তানির মধ্যে শূন্যস্থান পূরণ করতে হলে রপ্তানি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। বাজার স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এটা অব্যাহত থাকবে। তবে রেমিট্যান্স বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। এ কারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

দেশে ডলার দামে অস্থিরতার প্রেক্ষিতে গত ২৭ জুলাই থেকে রাজধানীর বিভিন্ন মানিচেঞ্জার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অভিযান চলছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০টি টিম মাঠে নেমেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হচ্ছে কিনা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন ডলার মজুদ করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে এ অভিযান চালানো হচ্ছে। ডলার পাচার ঠেকাতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বিমানন্দরে ভিআইপিদেরও তল্লাশি করা হচ্ছে। ডলার নিয়ে কারসাজি করার অপরাধে এরই মধ্যে পাঁচ মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করায় ৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা হয়েছে। অন্যদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধির পেছনে কারসাজির প্রমাণ পাওয়ায় ছয় ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধানকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ১২ আগস্ট ২০২২

Back to top button