বরিশাল

ইলিশের ভরা মৌসুমে উত্তাল সাগর, ‘শূন্য হাত’ জেলেদের

র‌ফিকুল ইসলাম

ব‌রিশাল, ৯ আগস্ট – প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে গভীর সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস চলছে। পূ‌র্নিমার জোয়ারের প্রভা‌বে উত্তাল বঙ্গোপসাগর। সাগরে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। ঢেউ‌য়ের তে‌ড়ে সাগ‌রে থাকা মাছ ধরা একা‌ধিক ট্রলার ডু‌বির ঘটনা ঘ‌টে‌ছে।

এই ঘটনায় ক‌য়েক জে‌লে এখ‌নো নি‌খোঁজ র‌য়ে‌ছেন।
সাগ‌রে কোনো সতর্ক বার্তা জা‌রি ক‌রে‌নি আবহাওয়া অফিস। তবুও আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে মৎস্যজীবীদের গভীর সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। আবহাওয়া এতোটাই খারাপ যে শত শত ট্রলার সমুদ্রে গিয়ে মাছ না ধরেই ফিরছে উপকূলে। মাছ না ধরতে পেরে দুশ্চিন্তায় জেলেরা আশ্রয় নি‌য়ে‌ছে নিরাপ‌দে।

বৈরি আবহাওয়ায় পাথরঘাটা ও কলাপাড়ার মৎস্য বন্দর আলীপুর ও মহিপুরে আশ্রয় নিয়েছে ট্রলারগুলো। টানা ক‌য়েক দি‌নের দুর্যোগ মৎস্যজীবীদের জীবিকার সমস্যা তৈরি করেছে। তার স‌ঙ্গে জ্বালানির মূল্য হঠাৎ ক‌রে বে‌ড়ে যাওয়ায় জে‌লে থে‌কে শুরু ক‌রে ট্রলার মা‌লিকরা পড়‌ছেন বিপাকে।

৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর ইলিশের ভরা মৌসুমে মাছ ধরতে না পারায় জেলে এবং ট্রলার মালিকদের কপালে চিন্তার ভাজ।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বাজার কাঁপানো ওই সব ইলিশের ঝাঁক বঙ্গোপসাগর থেকে উপকূল দিয়ে আসছিল। জেলেদের জালে আটকে যাওয়া ইলিশের প্রায় অর্ধেকটাই বড় সাইজের। গত বছর বড় সাইজের ইলিশ ছিল গড়ে ২০ শতাংশের মতো। তাই গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রায় দ্বিগুন রাজস্ব আয় হয়েছে। এ ছাড়া অবরোধ শেষে গত পাঁচ দিনে যে ইলিশ জেলেদের জালে আটকা পড়েছে, তা গত বছরের তুলনায় ১০ হাজার কেজি বেশি।মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গে‌ছে, গত বছর ইলিশের মৌসু‌মে পাথরঘাটা, কলাপাড়া, তালতলীসহ বিভিন্ন ঘাট থেকে ৫-৬ হাজার ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ ধরার কাজে কয়েক লাখ মানুষ জড়িত আছেন।

৬৫ দি‌নের নি‌ষেধাজ্ঞা বা‌দে সারা বছর ধরেই সমুদ্রে মাছ ধরা হয়। কিন্ত বর্ষাকালে ইলিশ মাছের দেখা মেলে। তাই বর্ষা যতদিন থাকে, মাছ ধরার জন্য গভীর সমুদ্রে মৎস্যজীবীরা যান। এবার মৌসু‌মের নির্দিষ্ট সময় থেকে ইলিশ ধরা শুরু পর ক‌য়েক‌দিন বেশ ভা‌লোই মা‌ছের দেখা মে‌লে।

পাথরঘাটার রু‌হিতা এলাকার বাসিন্দা আ‌নোয়ার হো‌সেন, আবুল হো‌সেন ১৫-২০ বছর ধরে গভীর সমুদ্রে ট্রলারে যাচ্ছেন। ট্রলার মালিকের কাছে থেকে সারা বছর টাকা ধার নিয়ে সমুদ্রে গিয়ে সেই আয়ের টাকায় ধার শোধ করেন। কিন্ত এবার তাঁরা পড়েছেন সংকটে। ওই মৎস্যজীবীরা জানান, এমনিতেই লকডাউনের জেরে দুই বছর প্রায় সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ। গত বছরেও মাছের প্রায় আকাল ছিল। তবে এমন অবস্থা কখনও হয়নি।

বরগুনা জেলা ট্রলার মা‌লিক স‌মি‌তির সভাপ‌তি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী সাংবা‌দিক‌দের ব‌লেন, সাগ‌রে প্রচুর বৃ‌ষ্টি হ‌চ্ছে। আবার রোদ প্রচণ্ড। তার ওপর পূ‌র্নিমার জো। পা‌নির চাপ অনেক। সব‌মি‌লি‌য়ে সাগ‌রে ইলিশ ধরার প‌রি‌বেশ নেই। তাই জে‌লেরা নিরাপদ আশ্রয়ে চ‌লে এসে‌ছেন।

আলীপুর মৎস্য আড়ত সমিতির সভাপতি আনসার উদ্দিন মোল্লা জানান, গত কয়েকদিন আগে মাছ ধরতে ট্রলারগুলো সাগরে যায়। কিন্তু হঠাৎ সাগর উত্তাল হওয়ায় প্রায় সহস্রাধিক ট্রলার আলীপুর মহিপুর বন্দরে আশ্রয় নিয়েছে। এক‌টি ট্রলার ডু‌বির ঘটনায় দুই জে‌লে নি‌খোঁজ র‌য়ে‌ছেন।

বাংলাদেশ ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সহসভাপতি এম সাইফুল ইসলাম খোকন বলেন, মৌসুমের প্রায় চার মাস অতিবাহিত হতে চলেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়েনি কোনো ট্রলারেই। এরই মধ্যে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা গেল। ২৩ জুলাই নিষধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর দুই ট্রিপে তেমন মাছ পড়েনি। তৃতীয় ট্রিপ থেকে মাছ পড়া শুরু হয়। কিন্তু জেলেরা সাগরে নেমেই দুর্যোগে পড়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সামনে আসছে আবার ২২ দিনের নিষধাজ্ঞা। এতেই ভরা মৌসুমের তিন মাস শেষ। মৌসুমের বেশির ভাগ সময় চলে যায় নিষেধাজ্ঞা আর দুর্যোগে। এতে নিঃস্ব হচ্ছেন জেলে-মহাজনরা।

সূত্র: কালের কন্ঠ
আইএ/ ৯ আগস্ট ২০২২

Back to top button