শিক্ষা

উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনকে ঘিরে জাবির শিক্ষক রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণ

ঢাকা, ৯ আগস্ট – দীর্ঘ আট বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন। চলতি সপ্তাহের শেষ দিন ১২ আগস্ট (শুক্রবার) সিনেটের বিশেষ অধিবেশনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশ জার্নালকে নিশ্চিত করেছেন চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার ও রিটার্নিং কর্মকর্তা রহিমা কানিজ।

এদিকে, উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনকে ঘিরে হঠাৎই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি। দীর্ঘ আট বছর পরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী সব শিক্ষক শিবিরেই। নির্বাচন ঘিরে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী শিক্ষকরা, মেলাচ্ছেন নানা সমীকরণও। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের ইমেজ ও ভোটব্যাংকের বিবেচনায় পছন্দের প্যানেলে ঢুকতে অনেকে চালাচ্ছেন নানা চেষ্টা তদবির।

গুঞ্জনে ভাসছে যাদের নাম

‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ’র নেতৃস্থানীয় এক শিক্ষক বাংলাদেশ জার্নালকে জানান, এই নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের মাঝ থেকেই অন্তত চারটি প্যানেলের নির্বাচনে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একাধিক প্যানেলে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেয়াকে ভালো চোখে দেখছেন না আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ’ এর নেতৃস্থানীয়রা। তাদের ধারণা, এতে ভাঙন ধরতে পারে সংগঠনে। এদিকে বিএনপি ও বামপন্থী শিক্ষকদের প্যানেলের ব্যাপারে এখনও তেমন কিছু জানা যায়নি।

গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, সাময়িক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. রাশেদা আখতার, সাবেক দুই উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবীর এবং অধ্যাপক ড. এম. এ. মতিনের নেতৃত্বে নির্বাচনে আসতে পারে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের প্যানেলগুলো। আলোচনায় থাকা এই চারটি প্যানেলের বাইরেও নতুন প্যানেল আসার সম্ভাবনা রয়েছে, বলছেন শিক্ষকরা।

নূরুল আলম নেতৃত্বাধীন প্যানেল থেকে বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. অজিত কুমার মজুমদার, শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. এ. মামুন, শিক্ষক সমিতির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ড. লায়েক সাজ্জাদ এন্দেল্লাহ এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নুহু আলমদের মধ্য থেকে যে কোনো তিন জনের নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে শোনা যাচ্ছে। বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্য বলছে, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও আইবিএ’র অধ্যাপক মোতাহার হোসেনও এই প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে চেষ্টা তদবির চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে, কোষাধ্যক্ষ রাশেদা আখতার নেতৃত্বাধীন প্যানেল থেকে প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফি ও পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মোহা. মুজিবুর রহমানের নির্বাচন লড়ার ব্যাপারে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

এ দুইটি প্রভাবশালী প্যানেলের বাইরে সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবীর ও এম. এ. মতিনের নেতৃত্বে আরও দুইটি প্যানেলের নির্বাচনের সমীকরণে আসার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্য বলছে, সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমির হোসেন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান চৌধুরী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এবং প্যানেলে যোগ দিতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া আরও কয়েকজন শিক্ষক এসব প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।

শূন্য পদ ও মেয়াদোত্তীর্ণদের নিয়েই নির্বাচনে যাচ্ছে সিনেট, নেই আইনি বাধা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন (১৯৭৩) এর ১৯ (১) ধারানুসারে, ৯৩ জন নির্বাচিত ও মনোনীত সদস্য নিয়ে গঠিত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট। তবে নির্বাচন ও মনোনয়ন না হওয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে এবং শূন্য পড়ে আছে সিনেটের ৬৮টি সদস্যপদ।

জানা যায়, গত ৩০ বছর ধরে শূন্য পড়ে আছে নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের পাঁচটি পদ। অধ্যাদেশের ১৯ (১) এর ‘ই’ ধারানুসারে, আচার্য কর্তৃক মনোনীত পাঁচ শিক্ষাবিদের মেয়াদও এর মাঝে সম্পন্ন হয়েছে। ১৯ (১) এর ‘জে’ ধারা মোতাবেক নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের ৩৩ জনের মেয়াদ সম্পন্ন হয়েছে ২০১৮ সালে। অধ্যাদেশের ১৯ (১) এর ‘আই’ ধারা অনুযায়ী রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের নির্বাচিত প্রতিনিধি ২৫ জনের তিন বছর কার্যকালও গত বছর শেষ হয়েছে।

তবে প্রশাসন বলছে, সিনেটের ওই ৬৮ টি সদস্যপদে নির্বাচিত ও মনোনীতদের মেয়াদ শেষ হলেও অধ্যাদেশ অনুযায়ী এখনই শূন্য হচ্ছে না তাদের পদ।

অধ্যাদেশের ১৯ (২) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সিনেটরদের দায়িত্ব ততক্ষণ পর্যন্ত বহাল থাকবে, যতক্ষণ না তাদের উত্তরাধিকার নির্বাচিত, মনোনীত ও নিয়োগপ্রাপ্ত না হয়।’ কাজেই মেয়াদোত্তীর্ণদের নিয়ে নির্বাচনে কোনো আইনি বাধা নেই বলেও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রশাসনিক পর্ষদের মধ্যে সর্বশেষ ২০১৫ সালের অক্টোবরে সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন, ২০১৬ সালের এপ্রিলে ডিন নির্বাচন ও জুন মাসে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সিন্ডিকেট সদস্য, অর্থ কমিটি, শিক্ষা পর্ষদে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সিনেটের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পরবর্তী উপাচার্য কে হবেন তা নির্ধারণে সিনেটে ভিসি প্যানেল নির্বাচনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশনা পেয়ে তিন সদস্যের উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে হাতে পর্যাপ্ত সময় না থাকায় আগামী ১২ আগস্ট (শুক্রবার) সিনেটের বিশেষ ওই অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে যার একমাত্র এজেন্ডা তিন সদস্যের প্যানেল মনোনয়ন।

উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের কার্য পরিচালনা বিধি (২০১৫) এর ৩ (খ-২) ধারানুযায়ী, যে কোনো সময় সিনেট অধিবেশন আহ্বান ও প্যানেল নির্বাচনের এখতিয়ার উপাচার্যের রয়েছে।

১২ আগস্ট (শুক্রবার) আহ্বানকৃত ঐ সিনেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্টের ১১ (১) ধারা অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সংক্রান্ত বিধি মোতাবেক সিনেটের সাচিবিক দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এই নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন।

আগামী ১৩ আগস্ট (শনিবার) সাময়িক উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলমের উপ-উপাচার্য পদে কার্যকাল শেষ হবে।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক এম. এ. মতিনের আমলে জাবির উপাচার্য প্যানেলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সদ্য পদত্যাগকৃত উপাচার্য অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেনের অনুসারীদের হারিয়ে অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরপন্থীরা ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেন। আচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিজয়ী প্যানেল থেকে জাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম উপাচার্য পদে মনোনীত হন। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের পর চলতি বছরের ২রা মার্চ ফারজানার দ্বিতীয় কার্যকালের মেয়াদ শেষ হয়। ফারজানার কার্যকাল সম্পন্ন হওয়ার এক দিন আগে (১ মার্চ) উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলমকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরে ১৭ এপ্রিল তাকে সাময়িক উপাচার্যের দায়িত্ব দিয়ে আরও একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল
আইএ/ ৯ আগস্ট ২০২২

Back to top button