ইসলাম

প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ইসলামের নির্দেশনা

সমাজে এমন বহু মানুষ দেখা যায়, যিনি ব্যক্তিজীবনে সফল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে বা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে তিনি সফল নন। এ জন্য ভুল দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপন্থাই প্রধানত দায়ী। ইসলামের এমন কিছু শিক্ষা আছে, যা মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য পেতে সাহায্য করে।

সাফল্য পেতে নির্দেশনা

প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাজে সাফল্য পেতে ইসলামের নিম্নের নির্দেশনাগুলো দিয়ে থাকে।

১. সম্মিলিত প্রচেষ্টা : ইসলাম সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তবে সেই প্রচেষ্টা হতে হবে ভালো কাজে। ইরশাদ হয়েছে, ‘সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সাহায্য করবে না। আল্লাহকে ভয় করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর। ’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

২. পরামর্শ করা : ইসলাম পরামর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নির্দেশ দেয়। এটা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দায়িত্ব। বিশেষত সম্মিলিত কাজের ক্ষেত্রে পরামর্শের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ইরশাদ হয়েছে, ‘কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করবে। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

৩. দায়িত্বশীল আচরণ : প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও কর্মী উভয়ে যখন দায়িত্বশীল আচরণ করবে, তখন প্রতিষ্ঠান সাফল্যের মুখ দেখবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। একজন শাসক সে তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের রক্ষক, সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন দাস তার মনিবের সম্পদের রক্ষক, সে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৮৮)

৪. দক্ষ কর্মী নির্বাচন : দক্ষ ও বিশ্বস্ত কর্মী ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান সাফল্য লাভ করে না। তাই কর্মী নিয়োগের সময় বিষয়টি লক্ষ রাখতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের একজন বলল, হে পিতা! তুমি একে শ্রমিক নিযুক্ত করুন। কেননা তোমার শ্রমিক হিসেবে উত্তম সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত। ’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৬)

৫. কর্মীদের যথার্থ মূল্যায়ন : কর্মীদের ভালো ও মন্দ কাজের মূল্যায়ন যথাযথভাবে হলে তারা ভালো কাজে উৎসাহ পাবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবে। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালোকে সমর্থন করে তাকে শক্তিশালী করতেন এবং খারাপকে খারাপ বলে প্রতিহত করতেন। কোনো প্রকার মতবিরোধ সৃষ্টি না করে সব কিছুতেই মধ্যপন্থা অনুসরণ করতেন। লোকদের সংশোধন করতে কোনো প্রকার অলসতা করতেন না। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ২৫৮)

৬. প্রতিযোগিতামূলক কাজের পরিবেশ তৈরি : প্রশংসা, মূল্যায়ন ও পুরস্কারের মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক কাজের পরিবেশ তৈরি করা আবশ্যক। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়। ’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৬১)

৭. দায়িত্ব অর্পণে সতর্ক থাকা : প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত দায়িত্ব প্রদানে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। একইভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে কি না, সেটাও লক্ষ রাখা। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি কাউকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পণ করি না। আমার কাছে আছে এক কিতাব, যা সত্য ব্যক্ত করে এবং তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। ’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৬২)

পরিচালকদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা : পরিচালক ও নেতৃস্থানীয়রা অধীনদের প্রতি কোমল আচরণ করবে, তাদের ছোট ছোট ভুল উপেক্ষা করবে এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছিলে; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো। অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে; যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

কর্মীদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা : কর্মীরা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি হাদিসের নিম্নোক্ত নির্দেশনাও মান্য করবে। তিনি বলেন, তোমরা পরস্পর বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়ো না, হিংসা কোরো না এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন থেকো না। আর তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ও পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাই থেকে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৭৬)

যেসব কারণ সাফল্যের অন্তরায় : প্রতিষ্ঠান পরিচালক ও কর্মীদের কিছু মন্দ বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিবেশ নষ্ট করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য অর্জনে অন্তরায়। ইসলাম এসব বৈশিষ্ট্য পরিহারের নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে এমন কিছু কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে …তোমরা পরস্পরের প্রতি দোষারোপ কোরো না এবং তোমরা পরস্পরকে মন্দ নামে ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি মন্দ। যারা তাওবা না করে তারাই অবিচারকারী। হে মুমিনরা! তোমরা বেশির ভাগ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কেননা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না এবং পরস্পরের পেছনে নিন্দা কোরো না। ’ (সুরা : হুজরাত, আয়াত : ১১-১২)
আইএ

Back to top button