কুষ্টিয়া

‘প্রতিবাদ করায় ধর্ষণের শিকার হন সেই বাসযাত্রী’

আহমেদ রাজু

কুষ্টিয়া, ০৪ আগস্ট – কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে ছেড়ে আসা ঈগল পরিবহনের নৈশকোচে ডাকাতির সময় প্রতিবাদ করায় ধর্ষণের শিকার হন গাড়িটির ওই নারী যাত্রী। গাড়িতে থাকা একাধিক যাত্রী ওই রাতে ডাকাতির ঘটনার বর্ণনায় এ তথ্য জানান।

গাড়িটিতে যাত্রী ছিলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সালিমপুর গ্রামের ফল ব্যবসায়ী হেকমত আলী, তার স্ত্রী জেসমিন আরা ও শাশুড়ি শিল্পিয়ারা খাতুন। হেকমত আলী গত মঙ্গলবার রাতে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে ওই বাসে ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ডাকাতরা বাসের ভেতর তাণ্ডব চালায়। বুধবার সারাদিন তারা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। স্ত্রীর চিকিৎসা না নিয়ে বুধবার রাতে ঘটনাস্থল থেকে বাড়ি ফিরে আসেন তারা।

কী ঘটেছিল বাসের মধ্যে?

বৃহস্পতিবার সকালে নিজ বাড়িতে ঘটনার বর্ণনা দেন হেকমত আলী, তার স্ত্রী জেসমিন আরা ও তার শাশুড়ি শিল্পি খাতুন। হেকমত আলী বলেন, স্ত্রী, আমাদের চার বছরের ছেলে ও দুই বছরের মেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া বাজার থেকে ঈগল পরিবহনের বাসে উঠি। বাসে ১০ থেকে ১৫ জন যাত্রী ছিলেন। প্রতিদিনের মতো বাসটি একই উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী প্রাগপুর থেকে ছেড়ে আসে। বাসটি বনপাড়া হয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিরাজগঞ্জের একটি হোটেলে গিয়ে যাত্রাবিরতি দেয়। বিরতি শেষে রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার দিকে চলতে থাকে।

হেকমত আলী বলেন, বাসটি কিছু দূর যাওয়ার পর রাত ১২টার দিকে মহাসড়কের ওপর চারজন তরুণ বাসের সামনে থেকে হাত তুলে ইশারা দেন। বাসচালকের সহকারী সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ওই তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন। দু-এক মিনিটের মধ্যে তরুণরা বাসে উঠে পড়েন এবং সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে বাসের পেছনের দিকে গিয়ে বসেন। এই চার তরুণের প্রত্যেকের মুখে মাস্ক ও একজনের পিঠে ব্যাগ ছিল। তারা পেছনে বসার পরপরই মোবাইল দেখতে থাকেন। বাসটি আরও ১৫ মিনিটের মতো চলে। এরপর রাস্তা থেকে আরও পাঁচজন একইভাবে বাসে উঠেন। কয়েক মিনিট পর আরেকটু সামনে গিয়ে আরও দুজন বাসে উঠেন। কিছুক্ষণ পর রাস্তা থেকে ওঠা যাত্রীদের মধ্যে একজন বাসের চালককে বাস থামাতে বলেন। চালক থামাতে রাজি না হলে তাকে মারধর করেন তারা। এ সময় চালককে সরিয়ে চালকের আসনে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেন তারা।

ডাকাতরা পুরুষ যাত্রীদের গলায় ছুরি ও কাঁচি ধরে রাখেন। কোনো যাত্রী যেন চিৎকার করতে না পারেন, সে জন্য গাড়ির পর্দা কেটে পুরুষ যাত্রীদের মুখ, হাত ও পা বেঁধে সিটের নিচে বসিয়ে রাখেন। বাসে থাকা ১০ থেকে ১২ জন নারী যাত্রীর মধ্যে একজনের চোখ, মুখ ও হাত বেঁধে ফেলা হয়। বাকিদের চোখ, মুখ ও হাত খোলা ছিল। বাস তখন স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে। তবে বাসের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। ডাকাতরা তখন প্রত্যেকের শরীর তল্লাশি করে টাকা, মোবাইল ফোন এবং নারী যাত্রীদের কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কার লুটে নেন।

হেকমত আলীর স্ত্রী জেসমিন আরা বলেন, সবার সঙ্গে হেকমত আলীরও হাত বাঁধা ছিল। তবে আমার চোখ খোলা ছিল। আমার এক সিট পেছনে ছিলেন এক নারী। তার থেকে দুই হাত দূরে এক নারীকে তল্লাশি করার সময় ওই নারী প্রতিবাদ করেন। ওই নারী ডাকাত দলকে বলেন, ‘তোরা যে কাজ করছিস, সেটা ঠিক নয়। আমার এলাকা পাবনায় হলে তোদের দেখে নিতাম।’ এ কথা শোনার পর দুই তরুণ ওই নারীকে মারধর করেন এবং পেছনের একটি সিটে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন।

জেসমিন আরা বলেন, আমার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে মাথা নিচু করে সৃষ্টিকর্তার নাম নিচ্ছিলাম। সামনের আরেক সিটে আমার মা বসেছিলেন আরেক সন্তানকে নিয়ে। এক শিশু কান্না করলে তরুণ দলের একজন এসে বলেন, ‘বাচ্চাকে ধমক দেন এবং তাদের মতো ছিনতাইকারী না হওয়ার পরামর্শ দেন!’

হেকমত আলী ও তার স্ত্রী জেসমিন বলেন, ডাকাত দলের সরদারকে তারা ‘কাকা’ বলে সম্বোধন করছিলেন। নুরু, সাব্বির, রকি নামেও কয়েকজনকে তারা ডাকেন। রাত ৩টার দিকে ডাকাতরা টাকা, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি শুরু করেন। বাসের ভেতরে ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। সব কাজ শেষ করে সড়কের এক পাশের একটি খাদে গাড়িটি রেখে দ্রুত তারা নেমে চলে যান। গাড়ির প্রায় সব যাত্রীকেই তারা মারধর করেন।

হেকমত আলীর শাশুড়ি শিল্পি খাতুন বলেন, ভোরের দিকে যখন পুলিশ আসে, তখন কয়েকজন যাত্রীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েকজনকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বুধবার সারাদিন আমরা মধুপুর থানাতেই ছিলাম। রাত ৯টার দিকে বিআরটিসির একটি গাড়িতে টিকিট কেটে দিয়ে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ।

ধর্ষণের শিকার গৃহবধূর বাবা বলেন, বছর চারেক আগে পাবনায় তার বিয়ে হয়। তার কোনো সন্তান নেই। মঙ্গলবার গার্মেন্টসে চাকরি করার জন্য সে ঢাকা যাচ্ছিল। এ ঘটনার বিচার চান তিনি।

সূত্র: সমকাল
এম ইউ/০৪ আগস্ট ২০২২


Back to top button
🌐 Read in Your Language