জাতীয়

বিশ্ব মিডিয়ার আলোচনায় বাংলাদেশ

ঢাকা, ৩ আগস্ট – করোনা মহামারি পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক মন্দায় ভুগছে সারাবিশ্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটছে মুদ্রার মানের পতন, বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। দেউলিয়া হচ্ছে একের পর এক দেশ। ঠিক সে সময় পরিস্থিতি বুঝে ধীরেসুস্থে পা ফেলছে বাংলাদেশ। সংকট কাটিয়ে অর্থনীতির ইতিবাচক ধারায় চলছে শেখ হাসিনার দেশ। আর এ প্রশংসায় মাতছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মিডিয়া। বিশ্ব মিডিয়ার আলোচনায় রয়েছে শেখ হাসিনা ও তার দেশের প্রশংসা।

এরমধ্যে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কার মতো সংকট হবে না বাংলাদেশের। ভারতের ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বৈশ্বিক মন্দাতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল। অন্যদিকে পাকিস্তানের দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়, শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিখুন। তিনি বাংলাদেশের গর্ব। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকলেও শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কোনো আশঙ্কা একেবারেই নেই। ভারতের কর্ণাটকভিত্তিক গবেষক ও বিশ্লেষক জন রোজারিও এক বিশ্লেষণে এ মতামত দিয়েছেন। থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত ‘ব্যাংকক পোস্ট’ এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির তুলনামূলক বিচার করেছেন জন রোজারিও।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় গত কয়েক মাস ধরে আলোচনায়। এই আলোচনার মধ্যে বিশ্লেষকরা বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোতে একই সঙ্গে সংকটের ইঙ্গিত খুঁজছেন। বাংলাদেশের মতো এমন অর্থনীতির কয়েকটি দেশকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যেগুলোতে একটি ঋণ সংকট বা খারাপ পরিস্থিতি হয়তো দেখা দিতে পারে। ব্লুমবার্গের তথ্যের ভিত্তিতে ভিজুয়াল ক্যাপিটালিস্ট সম্প্রতি ঋণ ঝুঁকিতে থাকা ২৫টি দেশের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। রাশিয়া, জাম্বিয়া, সুরিনেম, লেবানন ও কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ঋণ পরিশোধে পিছিয়ে রয়েছে।

দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বেলারুশ। ১২টি অপর দেশ মূল্যস্ফীতি, ঋণ ও উচ্চ ঋণ ব্যয়ের তালিকায় রয়েছে। এগুলো হলো- আর্জেন্টিনা, ইউক্রেন, তিউনিসিয়া, ঘানা, মিসর, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, এল সালভাদর, পাকিস্তাান, বেলারুশ ও ইকুয়েডর। এই তালিকায় নেই বাংলাদেশ।

কারণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও গতিশীল নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ অর্থনীতিকে সমান গতিতে রাখতে পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর সীমিত করা হয়েছে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমানো হয়েছে, বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সে নগদ উপহার দেয়া হচ্ছে, বিলাসবহুল পণ্যে করারোপ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তুলতে। যার ফলে আমদানির চাহিদা সহজে মেটানো যায়। এরই মধ্যে সরকার রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আমদানি কমানোর নীতি নিয়েছে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সহযোগিতায়।

অর্থনীতিতে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব, যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আরও প্রসারিত হয়েছে- তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বৈশ্বিক সংকট বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহযোগিতায় দেশটিকে অবশ্যই রপ্তানি-আমদানি অনুপাতের উন্নতির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সমান অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদিও ন্যূনতম তিন মাসের চেয়ে বেশি দিন আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত বৈদেশিক রিজার্ভ রয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থা আরও দুর্বল হলে রিজার্ভের অবক্ষয় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ ও পুনরুদ্ধারে একটি ব্যাপক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাজেট ব্যবস্থাপনার সব স্তরে কৌশলগত হস্তক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন। মন্ত্রী ও বিভাগগুলোকে পরামর্শ দিচ্ছেন কীভাবে বিদেশ গমনের ব্যয় ছাড়াই উন্নয়ন প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। দেশবাসীকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন, যাতে দেশে কোনো প্রকার সংকট দেখা না দেয়। অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে তিনি শুধু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন এবং কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো স্থগিতের ওপর গুরুত্বারোপ করতে জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থাগুলোও বারবার বলে আসছে, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।

প্রথমত, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি প্রধানভাবে পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। মহামারির কারণে এই খাতে ধস নামে। এর ফলে দেশটির রিজার্ভ কমতে শুরু করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমদানিকৃত জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রিজার্ভ একেবারেই কমে যায়। গুরুত্বপূর্ণ আমদানি প্রায় একসঙ্গে স্থগিত করা হয়। জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম দেয় এবং ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় ও পদত্যাগ করেন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে।

বিপরীতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হলো গার্মেন্টস এবং বিদেশ থেকে পাঠানো বাংলাদেশি কর্মীদের রেমিট্যান্স। দক্ষিণ এশিয়ার অপর দেশগুলোর তুলনায় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেক বেশি শক্তিশালী।

মহামারির শুরুর দিকে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে অনেক প্রবাসী কাজ হারানোর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমবে। যদিও সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সফলতায় অনেক বাংলাদেশি বিদেশে তাদের কর্মক্ষেত্রে ফিরেছেন এবং প্রাক-মহামারি সময়ের হারে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন শ্রীলঙ্কায় জনগণের ব্যাপক ক্ষোভের আরেকটি বড় কারণ ছিল ক্ষমতাসীন রাজাপাকসের পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের ব্যাপক দুর্নীতি। বাংলাদেশেও দুর্নীতি একটি ইস্যু হলেও এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এর ফলে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার একেবারে কোনো সম্ভাবনাই নেই।

মহামারি পরবর্তী সময়ে দেশটির গতি দেখলে জানা যায়, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কিছু আর্থিক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবুও স্বল্পমেয়াদি কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

অর্থনীতির নিরিখে সাধারণ ধারণা হলো, কোনো দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭০ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা-যোগ্য এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্থার ঝুঁকি কম। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৪৪ শতাংশ। যদিও বৈদেশিক ঋণ ২১.৮ শতাংশ বৃদ্ধি, বৈশ্বিক নিম্নমুখিতায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি এবং রিজার্ভ কমে যাওয়ার পরও বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের ৪১তম বৃহত্তম অর্থনীতি। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির ৫০টি দেশের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু বাংলাদেশ ও ভারত রয়েছে করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক মন্দায় ভুগছে সারা বিশ্ব। যার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উদ্বেগজনক ভাবে কমেছে পাকিস্তানেও। এমন আঞ্চলিক ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও নিজেদের অর্থনীতি স্থিতিশীল রেখেছে বাংলাদেশ। সোমবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস। ভারতীয় এই গণমাধ্যমটির ডিপ্লোমেটিক এডিটর দীপঞ্জন রায় চৌধুরীর লেখা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছর সময়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে বাংলাদেশ। বিস্তৃত উৎপাদন খাত এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন; সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এশিয়ার মধ্যে অনুসরণীয়।

‘তলাবিহীন ঝুড়ি’- মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সেই নিন্দনীয় উক্তির কথা তুলে ধরে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তার প্রমাণ হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে সম্প্রতি উদ্বোধন হওয়া পদ্মা সেতু। যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা এই সেতুর অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তারাই এখন বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এই সেতুর কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি অনেক শক্ত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশ নিজেই নিজেকে উন্নয়নের একটি রোডম্যাপ দিয়েছে। ভিশন-২০৪১ নামের এই রোডম্যাপের লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে প্রকট দারিদ্র্যের অবসান এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদায় উন্নীত হওয়া। আর এর মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়াই বাংলাদেশের লক্ষ্য। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অর্জন করছে বাংলাদেশ।

কৃষি থেকে ফার্মাসিউটিক্যালস এবং জাহাজ নির্মাণ থেকে গার্মেন্টস পর্যন্ত বাংলাদেশের শিল্প ভিত্তি ক্রমেই বৈচিত্র্যময় হচ্ছে এবং দেশটির রপ্তানি বাড়ছে।

রপ্তানি বাড়ানো এবং আমদানি কমানোর বিষয়ে সরকারের নেয়া নীতি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে শুরু করেছে বলেও উল্লেখ করেছে ইকোনমিকস টাইম। প্রতিবেদনে বলা হয়, যদিও অর্থনীতিতে কোভিড-১৯ মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। তবে সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বদ্ধপরিকর। অর্থনীতির অন্যতম প্রধান দুই স্তম্ভ হলো গার্মেন্টস এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা। বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলতি বছর এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বৈঠকে করোনা মোকাবিলা এবং এর প্রভাব থেকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য নেয়া নীতিগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করায় বাংলাদেশের প্রশংসা করা হয়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার ঠেকাতে বাংলাদেশের অসাধারণ সাফল্যের কথাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, গত পাঁচ দশকে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিখুন: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের পত্রিকা দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। ‘টেকঅ্যাওয়ে ফ্রম বাংলাদেশ’স লিডারশিপ’ শিরোনামে মঙ্গলবার প্রকাশিত নিবন্ধটির লেখক সাহেবজাদা রিয়াজ নূর। কেমব্রিজ থেকে স্নাতকোত্তর সাহেবজাদা রিয়াজ নূর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মুখ্য সচিব ছিলেন।

বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে উল্লেখ করে রিয়াজ নূর বলেন, এই উন্নয়নের কৃতিত্ব দেশটির নেতৃত্বকে দেয়া যেতে পারে। সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেছেন, এই সেতুকে দেশের ‘গর্ব ও সামর্থ্যের প্রতীক’ আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

নিবন্ধে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ১৯৯০ এর দশক থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যা এবং পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। তিনি রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতির ভারসাম্যের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। শেখ হাসিনা তার বাবার সমাজতান্ত্রিক এজেন্ডা থেকে বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করেন। তিনি অন্যান্য এশিয়ান দেশগুলো থেকে শিখেছেন, যাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তি চারটি। এই ভিত্তিগুলো হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক উন্নয়ন, রপ্তানিকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বাণিজ্য উদারীকরণ এবং আর্থিক সংযম।

একটি সম্মেলনে এক অর্থনীতিবিদ যখন তাকে বাণিজ্য উদারীকরণের সুবিধা সম্পর্কে বলছিলেন, শেখ হাসিনা থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বাণিজ্য উদারীকরণের বিষয়ে আমাকে বোঝাতে হবে না। আমি যখন যুগোস্লাভিয়া সীমান্তবর্তী ইতালির শহর ত্রিয়েস্তে আমার পদার্থবিদ স্বামীর সঙ্গে থাকতাম, তখন দেখেছি, সীমান্ত সপ্তাহে তিন বার খোলা থাকছে এবং দুই পাশ থেকে মানুষ যাতায়াত করছে, পণ্য কিনছে এবং আবার ফিরে যাচ্ছে।’ এতে এটিই প্রমাণ হয়, রাজনীতিবিদরা সাধারণত যেসব বিষয়ে আকৃষ্ট হন, তার পরিবর্তে শেখ হাসিনা অর্থনীতির দিকে আন্তরিকভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন।

১৯৭১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে জবাবদিহির অভাব এবং সামরিক শাসনের প্রভাব থাকলেও ২০০৯ সাল থেকে সেনাবাহিনী অন্তরালে রয়েছে। বেসামরিক সরকারগুলোর ঘন ঘন পা পিছলে পড়া এবং সরকারগুলোর সামান্য বৈধতা বা অবৈধতার অভিজ্ঞতা পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির গণতান্ত্রিক ইতিহাস মোটেই নিষ্কলঙ্ক নয় এবং এখানকার সরকার দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিষয়ে জনসাধারণের সমালোচনা বারবার এড়িয়ে গেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক দূরদর্শী এবং দৃঢ় প্রত্যয় ধারণ করেছেন। তিনি মনে করেছেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতিই দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের একমাত্র উপায়।

বিরোধীদেরকে বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থাকলেও ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে টেকসই প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের তুলনায় ১৯৭০ সালে দেশটি ৭৫ শতাংশ দরিদ্র ছিল, কিন্তু এখন পাকিস্তানের চেয়ে ৪৫ শতাংশ ধনী।

পাকিস্তানের তুলনায় ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ অংশে জনসংখ্যা ১ কোটি বেশি ছিল। আর এখন পাকিস্তানের ২৩ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। ২০২১ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি ৪৭ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের ২৮ বিলিয়ন ডলার।

পাকিস্তানের ১ হাজার ৫৪৩ ডলারের তুলনায় বাংলাদেশে এখন মাথাপিছু আয় ২ হাজার ২২৭ ডলার। বাংলাদেশে ২০২২ সালে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৪১১ বিলিয়ন, পাকিস্তানে তা ৩৪৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে আগে যা ছিল ১২-১৫ শতাংশ। পাকিস্তানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ২১ শতাংশ হয়েছে, সমনে এই হার আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া, পাকিস্তানি রুপির তুলনায় বাংলাদেশি টাকা অনেক শক্তিশালী। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর উচ্চ অংশগ্রহণের পাশাপাশি সাক্ষরতার হার অনেক বেশি।

পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলগুলো এখনও নিজস্ব স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বারবার কারসাজির ফলে শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক এবং পরিবারতন্ত্র বহির্ভূত রাস্তায় রাজনৈতিক দলগুলোর পথচলা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এটা অনস্বীকার্য যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, শক্তিশালী বেসামরিক প্রতিষ্ঠান এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। পাকিস্তান উত্তরাধিকার সূত্রে একটি রাষ্ট্র পেয়েছে, যেখানে শক্ত রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে একটি দুর্বল বুর্জোয়া জনগোষ্ঠী গ্রহীতা-দাতার সম্পর্কে বিন্যস্ত।

দেশটি অনিবার্যভাবে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ও কর্তৃত্বমূলক গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কৃষি এবং ব্যবসায়িক আয়কে করের আওতা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। প্রচুর শিল্প-কারখানা যেকোনো ধরনের শুল্ক থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। আমাদের পার্লামেন্টে আধিপত্য ভূস্বামীদের, ফলে কৃষি আয়করের বিষয়টিকে নাকচ করে দেয়ার বিষয়টি আশ্চর্যজনক নয়। তবে এর ফলে কৃষি ও শিল্প খাতে কম করের কারণে সামগ্রিক কর জালটি ছোট থেকে গেছে।

বাংলাদেশের উদাহরণ অনুসরণ করে পাকিস্তানি নেতৃত্বকে অবশ্যই জাতীয় লক্ষ্য হিসেবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথ অনুসরণ করতে হবে এবং আঞ্চলিক শান্তির পাশাপাশি সাংবিধানিক শাসনকে এগিয়ে নিতে হবে।

কার্যকর প্রতিরক্ষার সঙ্গে আপস না করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্য উদারীকরণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে ভারত, ইরান, চীন, আফগানিস্তান এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে। এছাড়া রপ্তানি বৃদ্ধির মডেল তৈরির ক্ষেত্রে উচ্চ-মূল্য-সংযোজিত পণ্যের ওপর ফের জোর দেয়া উচিত।

পাকিস্তান তুলনামূলক সস্তা শ্রমের যে সুবিধা ভোগ করছে সেটিকে উন্নত দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে নারীদের জন্য শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি নিরাপদ এবং অনুকূল আইনি পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষি আয়ের ওপর একটি ন্যায্য কর আরোপের শক্তিশালী প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন। ধনী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ অবদান রাখতে হবে। বড় কর্পোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোকে করের আওতায় আনতে হবে।

পাকিস্তানের নেতৃত্ব বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। তবে প্রধান পদক্ষেপটি হওয়া উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতি শেখ হাসিনার অগ্রাধিকারের বিষয়টি অনুসরণ করা, যা প্রতিরক্ষা এবং গণতন্ত্র উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র:বাংলাদেশ জার্নাল
আইএ/ ৩ আগস্ট ২০২২

Back to top button