জাতীয়

ব্যয় সাশ্রয়ে মরিয়া সরকার

লুৎফর রহমান কাকন

ঢাকা, ২১ জুলাই – ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বৈশ্বিক টালমাটাল অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে দেশে অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কাও তত বাড়ছে। বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতি। ডলারের রিজার্ভ অশনি সংকেত দিচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার আমদানি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরেছে। এরপরও দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা চিন্তামুক্ত থাকতে দিচ্ছে না। এ অবস্থায় সরকার রিজার্ভ ধরে রাখতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে একের পর এক কাঁচি চালাচ্ছে খরচের খাতায়। গতকাল বুধবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়।

গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সভায় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন। কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক অভিঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ী নীতি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে সচিবরা ওই সভায় আলোচনা করেন। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারি সিদ্ধান্তে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন মুখ্য সচিব।

এক ব্রিফিংয়ে মুখ্য সচিব বলেন, অফিস-আদালতে আমরা বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে পারি, যেন উৎপাদনও খুব বেশি ব্যাহত না হয়। অফিসে যদি দুটি ফ্যানের জায়গায় একটি ফ্যান চালানো হয়, তাহলেও

কিন্তু কাজ করতে পারব। সেজন্য আমরা সরকারি অফিসগুলোতে সহনীয় মাত্রায় ২৫ শতাংশ বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি। সরকারি দপ্তরগুলোতে জ্বালানি খাতের বাজেট বরাদ্দের ২০ শতাংশ কম ব্যবহারে অর্থ বিভাগ থেকে সার্কুলার জারি করার সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। মুখ্য সচিব বলেন, অনেক আগে একবার এ খাতে বরাদ্দের ১০ শতাংশ কম ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল। এবার বলা হচ্ছে- যারা জ্বালানি ব্যবহার করবে, তারা এখনকার চেয়ে ২০ শতাংশ কম ব্যবহার করবে।

আহমদ কায়কাউস বলেন, অনিবার্য না হলে শারীরিক উপস্থিতিতে সভা পরিহার করতে হবে। অত্যাবশ্যক না হলে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আগে একবার সার্কুলার জারি করে বলা হয়েছিল অফিসগুলোতে এসির তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রিতে রাখতে হবে। নতুন করে আমরা আবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এসির তাপমাত্রা যেন ২৪/২৫ ডিগ্রির কম না হয়। এতে বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা হলেও কমে যাবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দেশনা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক গাড়ি চলাচল করে। সেখানে তেল-বিদ্যুতের ব্যবহার রয়েছে। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলেছি, অনেকে মিলে বাস বা মাইক্রোবাসে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের বিষয়টি কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয়কে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করতে।

ড. কায়কাউস বলেন, খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখার জন্য বাজার মনিটরিং করা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিভাবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়ে অর্থবছরের শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবাই যেন রাজস্ব বোর্ডকে সহায়তা করে সে বিষয়ে সচিবদের বলা হয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয় যেন নিজস্ব ক্রয় পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে রাজস্ব ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগ নেয় সে বিষয়েও সচিবদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেন, বিশ্বের অনেক দেশই মন্দা পরিস্থিতি পার করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হচ্ছে অনেক দেশে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা আগে থেকেই এই পূর্বপ্রস্তুতিটা নিয়ে রাখছি, যেন ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে না হয়। অন্যদের উপদেশ দেওয়ার আগে সরকার নিজে কৃচ্ছ্রতাসাধনের দিকে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটা একটা ইউনিক দিক যে, মানুষকে কোনো কিছু প্রতিপালন করার আগে সরকার, সরকারি অফিস, সরকারি সংস্থা তারা এই সাশ্রয়ী ও কৃচ্ছ্রতাসাধনের নীতি গ্রহণ করেছে।

পানি ভবনে বৈঠক

এদিকে গতকাল রাজধানীর পানি ভবনের সম্মেলনকক্ষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নির্দেশনা দেন সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার। বৈঠকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থার অফিসে ৫০ ভাগ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়। বৈঠকে নির্দেশনা দেওয়া হয়, সেন্ট্রাল এসির থার্মোস্ট্যাটযুক্ত অংশের তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি নির্ধারণ করে থার্মোস্ট্যাট লক করে রাখতে হবে। দুই ঘণ্টা অন্তর এক ঘণ্টা সেন্ট্রাল এসি চালু থাকবে। পানি ভবনের সবগুলো করিডোরের লাইট বন্ধ থাকবে। কক্ষগুলো ডেস্ক এর উপরের লাইট ব্যতীত অন্য সব লাইট বন্ধ থাকবে। কক্ষত্যাগের সময় লাইট এবং এসি বন্ধ করে রাখাসহ ১৯টি নির্দেশনা দেওয়া হয় সভায়।

গতকাল সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরে দেখা গেছে তুলনামূলক অনেক কম লাইট ফ্যান ব্যবহার করে অফিস কার্যক্রম পরিচালনা করছেন সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারী আব্দুল বাকি বলেন, আগের তুলনায় আমরা ৫০ শতাংশ লাইন কম ব্যবহার করে অফিস করছি।

এদিকে সরকারের নির্দেশে শিডিউল লোডশেডিং ছাড়াও দেশের সব জায়গায় রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট মার্কেট বন্ধ করতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ নির্দেশ অমান্য করায় অনেকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইতোমধ্যে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারকরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ সর্বোচ্চ কার্যকর করার। ব্যয় সাশ্রয় কার্যকর করতে সরকার প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করে স্পট মার্কেট থেকে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাসের (এলএনজি) আমদানি বন্ধ করা। এটি বন্ধ করার পরই দেশে গ্যাস সংকট বাড়তে থাকে। গ্যাসের চাহিদা এবং সরবরাহের পার্থক্য রেখেই সরকার রেশনিং করে দেশে গ্যাস সরবরাহ করছে। এরপর আরও বৃহৎ আকারে আমদানি বন্ধ করে ব্যয় সাশ্রয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যার অন্যতম হলো ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা। ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ একই সঙ্গে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকার কারণে গ্যাসভিত্তিক অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। ফলে সরকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে গত মঙ্গলবার থেকে দেশব্যাপী শিডিউল লোডশেডিং শুরু করে।

সূত্র : আমাদের সময়
এন এ/ ২১ জুলাই

Back to top button