জাতীয়

কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে বিদেশ সফরে যাওয়ার ধুম

জাহিদুর রহমান

ঢাকা, ১৮ জুলাই – রাজধানীর ফার্মগেটে খামারবাড়ি। সরকারের কৃষি-সংক্রান্ত বহু প্রকল্পের কেন্দ্র। এই দপ্তরগুলো কয়েক মাস ধরে অন্যরকম মুখর। ইউরোপে নেদারল্যান্ডসের আলমেয়ার শহরে চলছে আন্তর্জাতিক হর্টিকালচার বা উদ্যানতাত্ত্বিক প্রদর্শনী। ১৪ এপ্রিল থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত; নাম ‘ফ্লোরিয়েড এক্সপো-২০২২’। এই মেলা ঘিরে খামারবাড়িতে ধুন্ধুমার আলোচনা। কে নেদারল্যান্ডস যাচ্ছেন, কার নামে বিদেশ সফরের সরকারি আদেশ (জিও) জারি হলো- কর্মকর্তাদের কক্ষে কক্ষে এমন কথাবার্তার ঢেউ। মেলা দেখতে মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থা থেকে ১৫০ জনের তালিকা করা হয়। অন্তত ১০০ কর্মকর্তা ঘুরেও এসেছেন। একা নন, কেউ উড়াল দিয়েছেন স্ত্রীকে নিয়ে, আবার কারও সফরসঙ্গী ছিলেন স্বামী। অনেকে সেনজেন ভিসার সুযোগে ঘুরে এসেছেন অন্য দেশ।

করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে বিদেশ সফরে যাওয়ার ধুম পড়ে। এখন চলছে নেদারল্যান্ডস যাওয়ার মাতামাতি। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বন্ধের পরিপত্র জারির পরও ফাঁকফোকরে ভ্রমণ বন্ধ নেই কর্মকর্তাদের। ছোট-বড় প্রায় সব প্রকল্পেই রাখা হয়েছে বিদেশ সফরের সুযোগ। কখনও প্রশিক্ষণের নামে, কখনও মেলা কিংবা আনারস দেখতে, আবার কখনও মসলা চাষ শিখতে বিলাসী ভ্রমণে যাচ্ছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। অপ্রয়োজনেও ভ্রমণে ছুটছেন অনেকে। বিদেশ যেতে কর্মকর্তারা লেগে আছেন তদবিরে। এসব সফরে সরকারি ভান্ডার থেকেও খরচ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দ না থাকলেও ভ্রমণ থেমে নেই, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টাকায়ও বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেউ কেউ।

এগিয়ে বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর: গত আট মাসে সবচেয়ে বেশি বিদেশ সফর করেছেন বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। গেল নভেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ৭৭টি জিও হয়েছে। এই জিওর অনুকূলে ৩৩২ জনের বিদেশ সফরের আদেশ হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ডলার সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ মে বিদেশ সফর বন্ধে অর্থ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির পরও আরও ৩০টি জিও হয়। এই জিওর অনুকূলে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পান ১১৪ জন। সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীদের নামও রয়েছে এ তালিকায়। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডস সফরে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক বা কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশ আলোচিত।

জিও অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয়, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ সংশ্নিষ্টরা নেদারল্যান্ডস, ইতালি, জার্মানি, জাপান, তুরস্ক, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, মিসর ও দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেছেন। এখনও চলেছে সফর।

বিএডিসির সফরের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই প্রাইভেট কোনো কোম্পানির অর্থায়নে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে জিওতে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের সুবিধাভোগী কোম্পানির টাকায় তাঁরা সফর করেছেন। এর মধ্যে সোলার ল্যান্ড বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড থেকে দুটি, সুপারস্টার রিনেবল এনার্জি লিমিটেড থেকে চারটি, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড থেকে দুটি এবং বি. ট্রাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড থেকে দুটি সফরের খরচ বহনের কথা বলা হয়েছে জিওতে।

গত আট মাসের জিও পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কৃষি আবহাওয়া তথ্য সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক শাহ কামাল চারবার বিদেশ সফর করেছেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টাকায় বিদেশ গেলে সেটা অনৈতিক। যদি সরকারি টাকায় না গিয়ে বাইরের কোনো দেশ বা সংস্থার টাকায় গিয়ে থাকেন, তা যেতে পারেন। তবে তা ভালো করে যাচাই করা দরকার।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রয়োজন থাকলে অবশ্যই বিদেশে প্রশিক্ষণে যেতে হবে। তবে এর প্রাসঙ্গিকতা ও যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখতে হবে। তাই সরকারকে এসব অপ্রয়োজনীয় খরচের বিষয়ে সচেতন হতে হবে।’

বিশাল বহর, এক দেশের কথা বলে অন্য দেশ সফর: গতকাল রোববার সকালে খামারবাড়ির একটি ভবনের তৃতীয় তলায় এক কর্মকর্তার কক্ষে চলছিল আড্ডা। সেই আড্ডার মূল বিষয় ঘুরেফিরে নেদারল্যান্ডস। এক কর্মকর্তা বলছিলেন, ওপর মহলের তদবির ছাড়া বিদেশ সফরের জিও জারি হয় না। জিও জারির পরও অমুকের নাম বাদ পড়েছে। আরেকজন বলছেন, কেউ কেউ স্ত্রীকে নিয়েও মেলায় যাচ্ছেন। সেখানে স্ত্রীর কাজ কী? একজন বলছেন, মেলার নাম করে নানা দেশ সফর করা হচ্ছে। একজনের গাড়ি ভাড়াই এসেছে আট লাখ টাকা। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানকে ধরে টাকা নিচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠান এ টাকা অন্যভাবে আদায় করবে। ঘুরেফিরে সরকারি টাকা তারা লোপাট করবে।

গত বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কক্ষে গেলে একজন বলছিলেন, এক কর্মকর্তাকে দেখলাম নেদারল্যান্ডস গিয়ে বউসহ লেকে নৌকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেই ছবি আবার ফেসবুকেও দিয়েছেন। পাশ থেকে আরেক কর্মকর্তা বলছেন, মেলার নামে সবাই প্রমোদ ভ্রমণে ব্যস্ত।

বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ তিন মাসে নেদারল্যান্ডস গেছেন দু’বার। প্রথমবার সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী। ওই সময় ঘুরে আসেন পাশের অন্য দুটি দেশও।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বলাই কৃষ্ণ হাজরা স্ত্রীকে নিয়ে মেলা ঘুরে এসেছেন। তাঁরা নেদারল্যান্ডসে এক দিন থেকে সুইডেনও যান। যদিও জিওতে বলাই কৃষ্ণ হাজরার স্ত্রীর খরচ নিজেই বহন করার কথা বলা হয়েছে। যুগ্ম সচিব তাজখেরা খাতুনের সফরসঙ্গী ছিলেন স্বামী। তবে জিওতে স্বামীর খরচ ব্যক্তিগতভাবে বহনের কথা বলা ছিল।

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ছাড়াও সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তা, কৃষি সচিবের একান্ত সচিব, কৃষিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, সহকারী একান্ত সচিব, জনসংযোগ কর্মকর্তা, কৃষি-তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা নেদারল্যান্ডস ঘুরে এসেছেন।

ঈদের আগে কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি দল নেদারল্যান্ডসে যান। মন্ত্রী বাংলাদেশ দিবসে যোগ দেওয়া, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, সে দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তার সঙ্গে মতবিনিময়, মেলা পরিদর্শন ও বেশ কিছু কৃষি মাঠ পরিদর্শনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি সফলভাবে শেষ করে দুই দিন আগেই দেশে ফেরেন। তবে ওই সফরে যাওয়া যুগ্ম সচিব রেহানা ইয়াছমিন, উপসচিব মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এবং প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ বেলজিয়াম ও ফিনল্যান্ড ঘুরে এসেছেন।

কৃষিমন্ত্রী ঈদের আগে দেশে ফিরলেও গত বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডস সফরে গেছেন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মাকসুদুল হাসান মাসুদ। গত ২৬ জুন মাকসুদুল হাসান ও পারভীন সুলতানা নামে দু’জনের নামে জিও হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে। তাঁদের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি হিসেবে জিওতে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে মাকসুদুলকে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর কালিপুরের নামিরা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এবং পারভীন সুলতানাকে অর্গানিক বাংলা ফার্ম অ্যান্ড এগ্রোর (গুলশান) স্বত্বাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সফরের খরচ তাঁরা নিজে বহন করবেন বলেও উল্লেখ রয়েছে জিওতে।

আনারসের চারা দেখতে ফিলিপাইনে: পরীক্ষামূলকভাবে টাঙ্গাইলের মধুপুর, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে এমডি-২ জাতের আনারস চাষ। গত ডিসেম্বরে ফিলিপাইন থেকে আনা এসব চারা বেশ বাড়বাড়ন্ত। এখন শুধু ফল ধরার অপেক্ষা। পরীক্ষামূলকভাবে এসব এলাকার শতাধিক চাষিকে চারা বিতরণ করে সরকার।

এ অবস্থায় আনারসের চারা দেখতে গত বৃহস্পতিবার ফিলিপাইন সফরে গেছেন পাঁচ কর্তা। তাঁরা হলেন- বিএডিসির সদস্য পরিচালক (বীজ ও উদ্যান) মোস্তাফিজুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান বীজতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আখতার হোসেন খান, প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মেহেদী মাসুদ, প্রকল্প পরিচালক মাসুদ আহমেদ ও বিএডিসির কাশিমপুর হর্টিকালচার সেন্টারের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মাদ মাহবুবে আলম।

এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক মাসুদ আহমেদ বলেন, ‘এরই মধ্যে ৬ লাখ ২৫ হাজার আনারসের চারা দেশে আসার পর চাষও শেষ। করোনার কারণে ভিসা অনুমতি না মেলায় সে সময় না দেখেই চারা আনা হয়েছিল। এখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রিন মাউন্ট ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের অর্থায়নে আমরা ফিলিপাইনে চারা দেখতে যাচ্ছি।’ কোম্পানি নিয়ে যাচ্ছে কেন, ওদের স্বার্থ কী- এমন প্রশ্নে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভবিষ্যতে হয়তো আরও চারা আনা লাগতে পারে। কোম্পানি ভিজিট করতে নিয়ে যাচ্ছে।’

প্রকল্পের শেষ পর্যায়েও ভ্রমণ: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ‘কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলাবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ’ প্রকল্পের (তৃতীয় পর্যায়) মেয়াদ শেষ হয় জুনে। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় সাড়ে চার মাস বাকি থাকতে গত ফেব্রুয়ারিতে তৃতীয়বারের মতো ২০ কর্মকর্তা মসলা চাষ শিখতে তুরস্ক যান। এ প্রকল্পের অধীনে এর আগে ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪০ কর্মকর্তা চীন ও ভিয়েতনাম সফর করেন।

সচিব যা বলছেন: এ ব্যাপারে কৃষি সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের কৃষিকে বিশ্বজুড়ে তুলে ধরার জন্য নেদারল্যান্ডসের মেলা বিশাল সুযোগ। মেলায় ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা গেছেন, যাবেন। সেখানে এত কর্মকর্তা যাওয়ার কারণ, মেলায় অনেক কাজ থাকে। নিয়মিত গাছে পানি দিতে হয়। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। মেলায় আমাদের স্টলের জন্য অনেক কিছু সংগ্রহ করতে ইউরোপের দেশে যাওয়ার দরকার হয়। এমন কাজে কেউ কেউ নেদারল্যান্ডসের বাইরে যেতে পারেন।’

আনারস এনে দেশে চাষের পর আবার বিদেশ সফর কেন- এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, ‘মাত্র তো এমডি-২ জাতের আনারসের চাষ শুরু হয়েছে। এর পরিচর্যা, কালচারাল অপারেশন, এটা থেকে নতুন চারা তৈরি এবং টিস্যু কালচারের কিছু বিষয় রয়েছে, সেগুলো দেখে আসবেন তাঁরা।’ ঠিকাদারের টাকায় বিদেশ সফরের ব্যাপারে সচিব বলেন, ‘ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির আগে বিদেশ সফরে খরচ বহনের কথা উল্লেখ করা থাকে।’

সূত্র : সমকাল
এমইউ / ১৮ জুলাই

Back to top button