দক্ষিণ এশিয়া

কোন পথে শ্রীলঙ্কা? উতরাতে পারবে সংকট?

কলম্বো, ১৫ জুলাই – শ্রীলঙ্কায় চলমান গণবিক্ষোভের চিত্রগুলো অনেকটা এ রকম- প্রতিবাদকারীরা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের বিছানায় কুস্তি করছে, তাঁর বাড়ির বিস্তৃত লনে রান্না করছে অথবা তাঁর ব্যক্তিগত পুলে সাঁতার কাটছে।

এই জনক্ষোভের সবটাই মূলত প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসেকে লক্ষ্য করে, যার সরকার ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কাকে বিদেশি ঋণখেলাপি বানিয়েছে এবং পরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে ঋণমুক্তির জন্য শ্রীলঙ্কার হাতে ভিক্ষার থালা ধরিয়ে দিয়েছে।

রাজাপাকসে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। যদিও দুই নেতার পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী এখনও রাস্তায় এবং তারা বেশ কয়েকটি সরকারি অফিস দখল করে নিয়েছে।

রাজাপাকসের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ছাড়াও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ২২ মিলিয়ন মানুষের একটি দেশকে দেউলিয়া করে ছেড়েছে। যদিও এখনও গুঞ্জন রয়েছে যে, বিদেশে বসেই রাজাপাকসে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করতে পারেন।

আগামীর শ্রীলঙ্কার কী হবে, তা নিয়ে বড়োসড়ো প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে। কে রাষ্ট্রপতির স্থলাভিষিক্ত হবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে, সংসদের স্পিকারকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোনো সন্দেহ নেই যে, স্থিতিশীলতার জন্য দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন।

তবে এটি ঘটার আগে বিরোধী দলকে অন্তর্বর্তী পরিকল্পনার জন্য সংসদীয় দলগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের একটি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হবে সীমিত সময়ের জন্য প্রেসিডেন্ট নিয়োগ, যা কার্যনির্বাহী প্রেসিডেন্টের পদ বাতিল করার একটি প্রক্রিয়ার সূত্রপাত করতে পারে।

অবশ্যই পরবর্তী সময়ে সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে বিরোধীদের আইন ও শ্রীলঙ্কার জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ সব কিছু প্রণয়নের সময় প্রধান বিরোধী দল সামাগি জনা বালাওয়েগয়াকেও (এসজেবি) সঙ্গে রাখতে হবে।

এটি সত্যি যে, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অর্থনৈতিক পতনের আশঙ্কায় থাকা একটি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা এবং দেশটিকে স্থিতিশীল করার সহজ কোনো সমাধান কারও কাছেই নেই। দারিদ্র্যের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যিনিই সরকারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবেন, তাঁকে তাৎক্ষণিক কিছু সমাধান কার্যকর করতে হবে, যেমন- দরিদ্র জনগণের জন্য নগদ সহায়তা, জ্বালানি সমস্যার সমাধান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।

কয়েক মাস ধরে চলা সংকটে ভারতের মতো যে প্রতিবেশী বন্ধু সহায় হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেই প্রতিবেশীও এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তাদের সাহায্য আগের তুলনায় সীমিত হবে। সুতরাং শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কাকে আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আস্থা ফিরে পেতে অবশ্যই একটি সুষ্ঠু আর্থিক শাসন ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে।

শ্রীলঙ্কার এই অভিজ্ঞতা ইতিহাসের যে অধ্যায়ে লেখা থাকবে, সেখানে সম্ভবত এসবও লেখা হবে যে, জবাবদিহির অভাবে দেশের রাজনীতিবিদরা একের পর এক দুর্বল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যেসব সিদ্ধান্ত দেশকে ধীরে ধীরে সংকটের দিকে নিয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে এবং তাঁর সহকর্মীরা গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমন করেছিলেন, যা দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল এবং খাদ্য, শক্তি ও মানবিক সংকটের সূত্রপাত করেছিল।

তবে এই জনবিক্ষোভের ইতিবাচক দিক হচ্ছে, দেশের প্রয়োজনে শ্রীলঙ্কানরা একত্রিত হতে পেরেছেন। তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রায় দুই দশক ধরে শ্রীলঙ্কা শাসন করা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রাজবংশের অবসান ঘটাতে পেরেছেন। কার্যত এটি ছিল একটি রক্তহীন বিপ্লব। এশিয়া তো বটেই, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের জন্য এই বিপ্লব একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে, যার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক ইতিবাচক পরিবর্তনকে উৎসাহিত করা যাবে।

সূত্র: সমকাল
এম ইউ/১৫ জুলাই ২০২২

Back to top button