ইসলাম

এবার হাজিদের জন্য সৌদির বাড়তি সুবিধা

সাব্বির নেওয়াজ ও মোহন আখন্দ মক্কা

রিয়াদ, ১৪ জুলাই – হজ পালনকালে বিশ্রাম গ্রহণ ও খাবার পরিবেশনে এবার হাজিদের বাড়তি কিছু সুবিধা দিয়েছে সৌদি সরকার। এগুলোর মধ্যে ছিল মিনায় তাঁবুগুলোতে প্রত্যেক হাজির জন্য আলাদা বালিশ, কভারসহ ৬ ইঞ্চি উঁচু ফোমের বিছানার ব্যবস্থা এবং ফল কাটার জন্য প্লাস্টিকের চাকু এবং দুই ধরনের চামচসহ প্যাকেটজাত খাবার পরিবেশন।

এ ছাড়া আরাফাতের ময়দানে এবার স্টিলের কাঠামো দিয়ে বড় ধরনের তাঁবুর ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। পাশাপাশি রাতে মুজদালিফার উন্মুক্ত প্রান্তরে অবস্থানের সময় যাতে হাজিদের কষ্ট পেতে না হয় সেজন্য এখানকার সড়কের পাশে অনেক স্থানে মোটা কার্পেট বিছানো হয়েছিল। এতে মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফা প্রান্তরে হাজিদের অবস্থান বেশ আরামদায়ক ছিল। বাংলাদেশের হাজিদের সহযোগিতায় নিয়োজিত গাইডদের একজন শেরপুরের বাসিন্দা খলিলুর রহমান ২০১৯ সালের সঙ্গে এবারের হজের তুলনা করতে গিয়ে বলেন, তখন মিনার তাঁবুতে হাজিদের জন্য বিশ্রামের জন্য বিছানাগুলো ছিল সাধারণ মানের। হাজিদের জন্য বরাদ্দ করা খাবারগুলো বালতির মধ্যে তুলে এনে তাঁবুতে পরিবেশন করতে হতো। আর তখন আরাফাতের ময়দানের তাঁবুগুলোও ছিল খুবই সাধারণ মানের এবং মুজদালিফা প্রান্তরে কোনো কার্পেট ছিল না। তিনি বলেন, মিনা ও আরাফাতের ময়দানে হাজিদের আরামের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে, আগামীতে হয়তো মুজদালিফাতেও হাজিদের আর খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে না। সেখানেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণসহ তাঁবুর ব্যবস্থা থাকবে।

করোনার সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধের কারণে ২০২০ এবং ২০২১ সালে সৌদি আরবের বাইরে অন্য কোনো দেশের মুসলমানরা হজ পালনের সুযোগ পাননি। তবে করোনার সংক্রমণ কমে আসায় সৌদি সরকার চলতি বছর বাইরের দেশের মুসলিমদের হজ পালনের সুযোগ দেয়। অবশ্য সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি দেশের জন্য নির্ধারিত কোঠার পরিমাণ ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়। এ কারণে বাংলাদেশ থেকে ৬০ হাজার নারী-পুরুষকে হজ পালনের অনুমতি দেওয়া হয়।

৮ জুলাই মিনায় হাজিদের অবস্থানের মধ্য দিয়ে এবারের হজ শুরু হয়। পরদিন শুক্রবার ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পর ওই দিন রাতেই তাঁরা মুজদালিফায় যান এবং সেখানে অবস্থান শেষে পরদিন ফজরের পর আবার মিনার তাঁবুতে ফিরে যান। এরপর ওই দিন জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে পশু কোরবানির পর মাথা মুণ্ডন করে মক্কায় গিয়ে বায়তুল্লাহ্‌ তাওয়াফ করেন। পরে ১১ ও ১২ জুলাই আবারও কঙ্কর নিক্ষেপের জন্য তাঁরা ১০ জিলহজ রাতেই মিনায় ফিরে যান।

বাংলাদেশ থেকে আসা হাজিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মক্কা, মিনা, আরাফাতের ময়দান ও মুজদালিফায় যাতায়াতের সড়কগুলোতে চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যান চলাচল বন্ধ রাখার কারণে এবার তাঁদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষত দ্বিতীয়বার অবস্থানের জন্য মক্কা থেকে মিনায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ৪ থেকে ৬ কিলোমিটার পথ হাঁটতে গিয়ে হাজিরা কাহিল হয়ে পড়েন। বয়স্ক হাজিদের অনেকে পানি শূন্যতাসহ পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। কারও কারও রক্ত মিশ্রিত পায়খানা হতে শুরু করে। ফলে দ্বিতীয়বার কঙ্কর নিক্ষেপ না করেই তাঁদের মক্কায় ফিরে যেতে হয়েছে। তাঁদেরই একজন ঢাকার পল্টন এলাকার বাসিন্দা শফিকুল জমাদার। মিনায় ‘২০-বি’ তাঁবুতে স্থান পাওয়া ষাটোর্ধ্ব শফিকুল জমাদারের সঙ্গে থাকা জিয়াউর রহমান নামে অপর এক হাজি জানান, ১০ জিলহজ বায়তুল্লাহ্‌ তাওয়াফ শেষে সন্ধ্যার পর শফিকুল জমাদার ও তাঁর স্ত্রী মিনায় ফেরার জন্য মক্কা থেকে একটি ট্যাক্সিতে চড়েন। তবে সৌদি ট্রাফিক পুলিশের বাধার কারণে ট্যাক্সিটি কিছুটা দূরে মিনার সীমানায় প্রবেশের আগেই তাঁদের একটি সুড়ঙ্গের কাছে নামিয়ে দেন। বাধ্য হয়ে তাঁরা হেঁটে রওনা দেন। তবে টহলরত সৌদি বাহিনী তাঁদের সোজা পথের পরিবর্তে বারবার ঘুরপথে হাঁটতে বাধ্য করেন। এভাবে তীব্র গরমের মধ্যে ৬ কিলোমিটার পথ হাঁটতে গিয়ে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে শফিকুল জমাদার বারবার বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পথের ধারে সেই সুযোগ না থাকায় রাত ১০টার দিকে তাঁবুতে পৌঁছে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

২০ বি তাঁবুর হজ গাইড খলিলুর রহমান জানান, শফিকুল জমাদার অসুস্থ শরীর নিয়েই পরদিন সকালে কঙ্কর নিক্ষেপের জন্য জামারায় যান। তবে ফেরার পথে বারবার পায়খানা করতে থাকেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যে তাঁকে কোনোমতে তাঁবুতে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে ওই দিন সন্ধ্যায় তাঁর রক্ত মিশ্রিত পায়খানা শুরু হলে তিনি আরও দুর্বল হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে পরদিন সকালে তাঁকে বিশেষ ব্যবস্থায় মক্কায় ফেরত পাঠানো হয়।

বগুড়ার বাসিন্দা শাহরিয়ার আরিফ ওপেল জানান, মক্কা থেকে মিনায় ফেরার জন্য তিনি একটি ট্যাক্সিতে চড়েছিলেন। কিন্তু সড়কে টহলরত সৌদি ট্রাফিক বিভাগের কর্মীরা মিনায় প্রবেশের আগেই তাঁদের ট্যাক্সি থামাতে বাধ্য করেন। ফলে প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ হেঁটে আসতে হয়েছে। তিনি বলেন, অথচ ৭ জুলাই রাতে মক্কা থেকে হাজিদের প্রথমবার মিনায় বাসে করেই নেওয়া হয়েছিল। এমনকি হাজিদের একেবারে তাঁবুর কাছেই নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বার তাঁবু এলাকায় এমনকি এর ৩-৪ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো যানবাহনকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

দিনাজপুরের হাজি আবুল কালাম আজাদ জানান, মিনা থেকে জামারার দূরত্ব (কঙ্কর নিক্ষেপের স্থান) মাত্র ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার। কিন্তু কঙ্কর নিক্ষেপ করে তাঁবুতে ফেরার সময় সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের দ্বিগুণ পথ হাঁটতে বাধ্য করেছে। এতে যাঁরা দুপুরে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে গিয়েছিলেন, তাঁরা কাহিল হয়ে পড়েন।
মক্কায় অবস্থিত বাংলাদেশ হজ অফিসের কাউন্সিলর (হজ) মো. জহিরুল ইসলাম জানান, এবার মিনা, আরাফাতের ময়দান এবং মুজদালিফায় হাজিদের সুবিধার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। এ কারণে হাজিরা বিশেষত বাংলাদেশ থেকে যাঁরা হজ করতে এসেছিলেন তাঁদের ওই সব স্থানে অবস্থান, রাত্রি যাপন এবং খাবার গ্রহণও বেশ আরামদায়ক ছিল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হজ করতে এসে এবার মোট ১৫ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।

ফিরতি ফ্লাইট শুরু আজ :আজ বৃহস্পতিবার থেকে সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশের হাজিদের ফিরতি ফ্লাইট আসা শুরু হবে। এদিন রাত ১০টায় হাজিদের প্রথম ফ্লাইটটি ঢাকায় পৌঁছবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা বলেন, এরই মধ্যে হাজিদের হজ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। বিমানের প্রথম ফিরতি ফ্লাইটটি বাংলাদেশি হাজিদের নিয়ে আজ জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে। এই ফ্লাইটের আসন সংখ্যা ৪১৯। আগত হাজির সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে বলে তিনি জানান।
আগামীকাল শুক্রবার থেকে ফিরতি ফ্লাইটের শিডিউল আজই ঘোষণা করবে বিমান কর্তৃপক্ষ। পরে নির্ধারিত ফ্লাইটে বাংলাদেশের সব হাজি ঢাকায় পৌঁছবেন।

বাংলাদেশ হজ অফিস (ঢাকা) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সেরও (সাউদিয়া) ফ্লাইট রয়েছে। বিমান, সাউদিয়া এবং ফ্লাইনাসের ফ্লাইটে সব হজযাত্রী ফিরতে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগবে।

এম এস, ১৪ জুলাই

Back to top button