অপরাধ

বন্ধ হেনোলাক্সের নামে ফাঁদ পাতে ব্যবসায়ী নুরুল দম্পতি

ঢাকা, ০৬ জুলাই – আশির দশকেও নরসিংদীর শিবপুরের গ্রামের বাড়িতে অর্থকষ্টে দিন কাটত নিঃসন্তান নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের। ব্যবসায়িক জীবন শুরু করার আগে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন নুরুল। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝিতে রাজধানীতে প্রসাধনী পণ্যের হেনোলাক্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর অবস্থার পরিবর্তন হয় তাদের। ১৯৮৪ সালে প্রথমে ত্বক ফর্সা ও মুখের দাগ দূর করার কয়েকটি ক্রিম নিয়ে ব্যবসা শুরু করে হেনোলাক্স। জনপ্রিয়তার কারণে হেনোলাক্সের মোড়কে নকল ক্রিমে সয়লাব হয়ে যায় বাজার। মামলা মোকদ্দমা করেও নকল ক্রিমের বাজার বন্ধ করতে না পেরে ২০০৪ সালে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় হেনোলাক্স কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ উঠেছে, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দেড় যুগ ধরে বন্ধ এই কোম্পানির অংশীদার বানানোর লোভ দেখিয়ে ভয়ঙ্কর প্রতারণার ফাঁদ পাতেন নুরুল ও আমেনা। আগ্রহীদের দেশে-বিদেশে নিয়ে নানা প্রলোভনে তাদের কাছ থেকে এই দম্পতি হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এই চক্রের ফাঁদে সর্বশেষ শিকার কুষ্টিয়া ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও ঠিকাদার গাজী আনিসুর রহমান। প্রতারণার শিকার অন্যরা প্রকাশ্যে না এলেও ওই দম্পতির অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন গাজী আনিস। হেনোলাক্সের অংশীদার বানাতে ওই দম্পতি তার কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তাদের প্রতারণার কৌশলের সবিস্তারে জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেন আনিস, কিন্তু কাজ হয়নি। ফেরত পাননি একটি টাকাও। নুরুলের ক্ষমতার কাছে টিকতে না পেরে গত সোমবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে নিজের গায়ে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ জানান গাজী আনিস। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে মৃত্যু হয় তার।

মৃত্যুর আগে আনিস অভিযোগ করে গেছেন, হেনোলাক্স কোম্পানিতে তিনি ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। লভ্যাংশসহ সেই টাকা ৩ কোটির ওপরে পৌঁছালেও নুরুল আমিন কোনো অর্থ ফেরত দেননি। মামলা করেও লাভ হয়নি। এই হতাশা থেকেই তিনি নিজের গায়ে আগুন দেন। গত ৩১ মে ফেসবুকেও তিনি নুরুল আমিন দম্পতির বিচার দাবি করেন।

এদিকে, গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরা থেকে নূরুল আমিন দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গত রাতে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গাজী আনিসের আত্মহত্যা চেষ্টার খবরে এ দম্পতি আত্মগোপনে যাওয়ার পথ খুঁজছিলেন। শাহবাগ থানার এসআই গোলাম হোসেন খান জানান, গাজী আনিসের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল দুপুরে নুরুল আমিন দম্পতির বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন প্রয়াতের ছোট ভাই গাজী নজরুল ইসলাম। থানার ওসি মওদুত হাওলাদার জানান, গাজী আনিসের কাছ থেকে হেনোলাক্সের চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রী মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে ফেরত দেননি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই টাকা ফেরত না দেওয়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

গাজী আনিসের মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকা- বলে দাবি করেছেন তার স্বজনরা। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন তারা। এ সময় তার মামাতো ভাই তানভীর ইমাম এবং ভাতিজা মাহবুব আলম বক্তব্য রাখেন।

জানা গেছে, ২০০৪ সালে হেনোলাক্স কর্তৃপক্ষ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পর ‘হেনোলাক্স ফুড’ নামে লাইসেন্স নিয়ে রেডি-টিসহ দুই-একটি খাদ্যপণ্য বাজারে নিয়ে আসেন নুরুল আমিন। লোকসানের কারণে ২০১৯ সালে এটিও বন্ধ হয়ে যায়। ২০১২ সালে হারবাল কোম্পানির লাইসেন্স নিয়ে বেশ কিছু প্রসাধনীসামগ্রী উৎপাদন ও বিপণন শুরু করেন তিনি। এই ব্যবসাতেও ধস নামে ২০১৯ সালে।

বর্তমানে নিজেকে আমিন পোল্ট্রি লিমিটেডেটের চেয়ারম্যান, আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির এমডি এবং আমিন ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন নুরুল। এর আগে আমিন হারবাল কোম্পানি প্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখ করেছেন ফেসবুক প্রোফাইলে। সেখানে তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত থাকার কথাও লিখেছেন। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কার্যক্রম নেই। ঠিকানা হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরানা পল্টনের ‘হেনোলাক্স সেন্টার’-এর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ঠিকানায় গিয়ে ছোট একটি অফিসকক্ষ পাওয়া গেলেও সেটি তালাবদ্ধ ছিল।

সূত্র : আমাদের সময়
এম এস, ০৬ জুলাই

Back to top button