সিলেট

সিলেটে বন্যা : কুশিয়ারার পাড়ে অশেষ দুর্ভোগ

চয়ন চৌধুরী

সিলেট, ০৫ জুলাই – ৮-১০ কিলোমিটার রাস্তার কোথাও কোমরপানি, কোথাও হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যায়। অনেক ভোগান্তির পর দুপুরে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরে পৌঁছান ছত্রিশ গ্রামের রহমত মিয়া। কয়েকদিন ধরে অসুস্থ স্ত্রীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেও পানি। শেষ পর্যন্ত এই পানি পেরোতে সুশান্ত বিশ্বাসের ভ্যানগাড়িতে তুলতে হলো রহমতের স্ত্রীকে। মানিকোনা ইউনিয়নের গয়াশি গ্রামের সুশান্তের ঘরেও কোমরপানি। জীবিকার তাগিদে উপজেলা সদরের বাজারে হাজী আলম রাজা কমপ্লেক্সের সামনে থেকে উপজেলা পরিষদ ও হাসপাতাল পর্যন্ত মানুষ আনা-নেওয়া করছেন।

উপজেলা সদরে জরুরি প্রয়োজনে আসা অসহায় মানুষের অনেকে হেঁটেও প্লাবিত কয়েকশ গজ পেরিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের একজন পিটাইটিক গ্রামের ছায়ারুন্নেছা। তিনি বলেন, ঘরবাড়ি পানিতে, টাকা নেই। এই রাস্তা পার হলে ১০ টাকা লাগবে।
শুধু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় নয়; বাংলোসহ অফিসার্স কোয়ার্টার এলাকাও পানিবন্দি। ইউএনও সীমা শারমিন বলেন, পানি কমছে, তবে খুব ধীরে। আমার কোয়ার্টারের ভেতরেও পানি রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে উপজেলায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যার্ত ৫৭৮টি পরিবার রয়েছে। গত ১৭ জুন থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ পানিবন্দি।

কয়েকদিন ধরে সিলেটে সুরমা নদীর পানি অল্প কমলেও কুশিয়ারার পানি সেভাবে কমছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় উল্টো অমলসিদ ও শেওলা পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি কয়েক সেন্টিমিটার বেড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, এই দুটি পয়েন্টের মতো ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টেও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল বিকেল ৬টায় ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার দশমিক ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ক’দিন ধরে সুরমা নদীর পানি সিলেট (নগরী) পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে নামলেও কানাইঘাট পয়েন্টে এখনও বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে।

দীর্ঘ ১৮ দিন ধরে পানিবন্দি কুশিয়ারা পারের হাজারো মানুষের দুর্দশার অন্ত নেই। ফেঞ্চুগঞ্জ সদরের মধ্য বাজারে মা মেডিসিন ফার্মেসির ভেতরে পানি। ফার্মেসির ভেতরে টুলের ওপরে বসা শাকিল আহমদের বাড়ি বালাগঞ্জের নতুন সুনামপুরের ঢালারপার গ্রামে। তিনি বলেন, কুশিয়ারা নদীপারের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার শেষ নেই। ২০০৪ সালে বড় বন্যা হয়েছিল, তখনও দু-তিন দিন পর নেমে গেছে। এবারে পানি নামতেই চাইছে না। ঢালারপারের বাড়িতেও পানি আছে।
কুশিয়ারা নদী লাগোয়া দক্ষিণ তীরে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরের সরকারি-বেসরকারি অফিস, বাজার, স্কুল-কলেজ গড়ে উঠেছে। ফলে নদীর পানি বাড়লেই বাজারে পানি ওঠে; অফিস-স্কুল তলিয়ে যায়। এসব দু-তিন দিনের বিষয় বলে উপজেলার মানুষের তা গায়ে লাগে না। এবারে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা পরিস্থিতি সবাইকে চরম ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে বলে জানান মধ্য বাজারের জুতা ব্যবসায়ী বাচ্চু মিয়া। মধ্য বাজারের সিংহভাগ দোকানের ভেতরে পানি।

এক সারিতে মাঝে শত শত দোকান বাদ দিলে মধ্য বাজার থেকে পূর্ব বাজার পর্যন্ত রাস্তাকে কুশিয়ারা নদীর অংশ বলেই ভ্রম হয়। মধ্য বাজারে ফেঞ্চুগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে পানিতে থৈ থৈ করছে। এখান থেকে পূর্ব বাজার পর্যন্ত রাস্তায় কোমরপানিতে চলছে নৌকা। পিটাইটিক, ছত্রিশ, বাগমারাসহ আশপাশের গ্রামের শত মানুষ জরুরি প্রয়োজনে গাড়ির বদলে নৌকায় উপজেলা সদরের মধ্য বাজারে এসে নামছেন। এরপর হাঁটুপানিতে হেঁটে যাচ্ছেন গন্তব্যে।
মধ্য ও পূর্ব বাজার প্লাবিত থাকলেও উপজেলা সদরের পশ্চিম বাজারের দোকানপাটে পানি নেই। তবে পশ্চিম দিকে একটু এগিয়ে গেলে এক সারিতে উপজেলা নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলীর কার্যালয়, একই ভবনে সাব-রেজিস্ট্রার ও উপজেলা কৃষি অফিসারের কার্যালয়ের সামনে পানি।

বন্যার পানিতে পূর্ব বাজারের মূল হাট প্লাবিত হওয়ায় কোরবানিকে সামনে রেখে আপাতত ডাকবাংলোর টিলায় পশুর হাট বসছে। এখানে ১৫টি গরু নিয়ে আসা হাদিস আলী বলেন, এখন পর্যন্ত একটাও বিক্রি হয়নি। চারদিকে পানি, মানুষ কিনতে আসবে কীভাবে?

সিলেট নগরী থেকে পশ্চিমে ২৫ কিলোমিটার দূরের ফেঞ্চুগঞ্জে যেতে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পেরিয়ে যেতে হয়। দুই উপজেলার মাঝ বরাবর চলে যাওয়া সিলেট-মৌলভীবাজার সড়কের দুই পাশে হাজারো ঘরবাড়ি এখনও প্লাবিত অবস্থায় রয়েছে।

সূত্র : সমকাল
এম এস, ০৫ জুলাই

Back to top button