নড়াইল

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা: ৯ দিন পর মামলা, গ্রেফতার ৩

নড়াইল, ২৮ জুন – নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনার ৯ দিন পর মামলা হয়েছে। এই মামলায় তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সোমবার (২৭ জুন) মামলাটি করা হয়। ১৮ জুন ঘটনাটি ঘটে

নড়াইল সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষক অবমাননা, ভাঙচুরের ঘটনায় সোমবার দুপুরে এসআই মোরসালিন মামলা করেছেন। মামলায় শাওন (২৮), সৈয়দ রিমন আলী (২২) ও মনিরুল ইসলাম রুবেল (২৭) নামে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদেরকে আজ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শিক্ষক নিরাপদে রয়েছেন। তিনি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ অবস্থানে আছেন।’

নড়াইল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জানান, রহস্য উদঘাটনে ২৩ জুন (বৃহস্পতিবার) তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জুবায়ের হোসেন চৌধুরীকে। বাকি দুজন হলেন- জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমান ও নড়াইল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ শওকত কবীর। কমিটি ৩০ জুন প্রতিবেদন জমা দেবে। সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে শিক্ষককে অবমাননাসহ তিনটি ধারায় নিয়মিত মামলা হয়েছে। তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার জড়িত অন্যদের শনাক্তের কাজ চলছে। শিক্ষকের মানসিক অবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি এখন স্বাভাবিক রয়েছেন। কলেজটি ঈদুল আজহা পর্যন্ত বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের ক্ষমতাসীন দলের বহিষ্কৃত নেত্রী নুপুর শর্মার সমর্থনে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে গত ১৮ জুন দিনভর বিক্ষোভ, সহিংসতা চলে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসে। গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় ওই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। এরপর পুলিশি পাহারায় বিকাল ৪টার দিকে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাকে দাঁড় করিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয় একদল মানুষ। ওই শিক্ষক হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে থাকেন। পরে তাকে তুলে নেওয়া হয় পুলিশের গাড়িতে।

স্বপন কুমার বলেন, ‘কলেজে গেলে নতুন করে আবার হামলা হয় কি-না, সেই শঙ্কায় আছি। তারপরও কলেজে ফিরতে চাই। কারণ আমার পরিবার আছে, সন্তান আছে, তাদের ভরণ-পোষণের খরচ আমাকে বহন করতে হয়। কলেজের চাকরিই আমার আয়ের উৎস।’

জানা গেছে, ওই কলেজে এক ছাত্র নুপুর শর্মার সমর্থনে একটি স্ট্যাটাস দেন। তার স্ট্যাটাসের জেরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন স্থানীয় মাদ্রাসাশিক্ষক মো. ওমর ফারুক। তার দাবি, ‘১৮ জুন সকালে স্ট্যাটাস দেওয়া ছাত্র কলেজে আসার পর বন্ধুরা পোস্টটি মুছে ফেলতে বললেও সে তা করেনি। এরপর বিষয়টি নিয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছে নালিশ জানায়।’ বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে জানান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। একপর্যায়ে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া ছাত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে কলেজ ক্যাম্পাসে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।

স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘সকালে কিছু ছাত্র আমাকে ঘটনাটি জানালে আমি তিন শিক্ষককে ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। তাদের মধ্যে ছিলেন- কলেজের পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক শেখ আকিদুল ইসলাম, পরিচালনা পরিষদের আরেক সদস্য ও কৃষি শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক কাজী তাজমুল ইসলাম এবং স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু। কলেজের যেকোনও অঘটন ঘটলে আমি সব থেকে আগে এই তিন শিক্ষককে জানাই। প্রতিবারের মতো সেদিনও একইভাবে তাদের জানালাম। এরই মধ্যে কলেজে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, আমি ওই ছাত্রকে সাপোর্ট করছি। তখন কিছু ছাত্র কলেজে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে স্থানীয় লোকজন ও পাশের একটি মাদ্রাসার ছাত্ররা এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে। তখন আমি কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অনেককে ফোন করে ডেকেছি। তবে কেউ সময়মতো আসেননি। এরপর জড়ো হওয়া লোকজনের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। আমার মোটরসাইকেলসহ শিক্ষকদের তিনটি মোটরসাইকেল আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।’

তিনি দাবি করেন, ‘পরে পুলিশ এসে আমাকে বলে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আপনাকে আমাদের হেফাজতে নিতে হবে। তখন আমি পুলিশের কাছে একটি হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট চাই। তবে আমাকে হেলমেট দেওয়া হয়নি। একটি বুলেট প্রুফ জ্যাকেট দেওয়া হলেও পরে তা পুলিশ খুলে নেয়। পুলিশ আমাকে কলেজ কক্ষ থেকে বের করে আনে। তখন দুই পাশে শত শত পুলিশ ছিল। এর মধ্যেই স্থানীয়রা আমাকে পুলিশের সামনেই জুতার মালা পড়িয়ে দিলো। আমাকে পুলিশ ভ্যানের কাছে নেওয়ার সময় পেছন থেকে অনেকে আঘাত করেন। আমি মাটিতে পড়ে যাওয়ায় পায়ের কিছু জায়গায় কেটে যায়। তখন অনুভব করি, পেছন থেকে কেউ আমার মাথায় আঘাত করছে।’

নড়াইল জেলা পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় বলেন, ‘ঘটনার দিন কলেজ প্রাঙ্গণের পরিস্থিতি খুব বেশি অস্বাভাবিক ছিল। পুলিশ সেখানে চেষ্টা করছিল বিনা রক্তপাতে পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। অধ্যক্ষকে যখন কলেজের কক্ষ থেকে বের করে আনা হয়, তখন সেখানে আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। এ ছাড়া নড়াইল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। তখন কেউ তাকে জুতার মালা দিয়েছে কি-না আমরা দেখতে পারিনি। এটা আমার জানাও নেই।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া ছাত্রের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার পর তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।’

কলেজের প্রধান সহকারী খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘এমপি কবিরুল হক সভা করে দোষীদের শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি পরিস্থিতি বিবেচনায় কলেজ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেছেন। কলেজ খোলার পর পুনরায় সভা হবে। জেলা প্রশাসন ৪ জুলাই পর্যন্ত কলেজ না খুলতে নির্দেশ দিয়েছে।’

স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আক্তার হোসেন টিংকু বলেন, ‘জুতার মালা পরানোর ঘটনাটি আমি দেখিনি। ওই সময় সেখানে পুলিশ ছিল। তারা ভালো বলতে পারবে। আমি কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রটেক্ট করতেছিলাম। সে সময় আমার গায়ে বেশ কয়েকটি ইটপাটকেল লেগেছে। আমি দোষীদের শাস্তি চাই।’

নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক একটা ঘটনা এখানে ক্যানসার হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তেজিত জনতা যেন আবারও উত্তেজিত না হয়, সে জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন
এম এস, ২৮ জুন


Back to top button
🌐 Read in Your Language