মধ্যপ্রাচ্য

ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ কি বাস্তব যুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে?

তেহরান, ২৫ জুন – আগামী সপ্তাহে যিনি ইসরায়েলের অন্তবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, এক জরুরি সফরে তিনি তুরস্কে গেছেন। তুরস্কে ইসরায়েলি পর্যটকদের ওপর ইরানি এজেন্টরা হামলা চালাতে পারে এমন আশঙ্কার মধ্যেই তার এই সফর।

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে ছায়াযুদ্ধ চলছে এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সেটা যেন আরো বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে।

বছরের পর বছর ধরে ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের গোপন তৎপরতা চালিয়ে আসছে। ইসরায়েল ইরানকে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করে। ইরানও ইসরায়েলকে বিবেচনা করে তাদের শত্রু হিসেবে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আছে। এছাড়াও ইরানের আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠার বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে তারা একটি বড় বাধা হিসেবেই দেখে।
ঘটনাবলী নাটকীয় মোড় নেয় ২০২০ সালে যখন ইরানের নেতারা তাদের শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানী মহসিন ফখরিজাদেহর হত্যার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করতে শুরু করেন। রাজধানী তেহরানের বাইরে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইরানের অভিযোগ যে তাকে দূর-নিয়ন্ত্রিত মেশিন গান দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।ইসরায়েল এই অভিযোগ স্বীকার করেনি এবং প্রত্যাখ্যানও করেনি।

মহসিন ফখরিজাদেহ ইরানের পঞ্চম পরমাণু বিজ্ঞানী, যিনি ২০০৭ সালের পর আততায়ীদের হাতে খুন হয়েছেন।

পরে ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের সাবেক প্রধান বলেন, এই বিজ্ঞানী “বহু বছর ধরেই” ইসরায়েলের টার্গেট ছিলেন। তিনি বলেন, তার বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের কারণে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা উদ্বিগ্ন ছিল।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও মনে করে ইরান যে গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার জন্য কাজ করছিল তার প্রধান ছিলেন মহসিন ফখরিজাদেহ।

এর কয়েক মাস পর জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা উদ্যোগ নেন যা তার পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প বাতিল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেও ইরান এবং ইসরায়েল পরস্পরের বিরুদ্ধে গোপন তৎপরতা অব্যাহত রাখে।

ইসরায়েল ঘোষণা করে যে তারা ইরানিদের চালানো কথিত একটি হত্যা-প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। ইসরায়েল অভিযোগ করে যে ইরান ইসরায়েলের ভেতরে ড্রোন দিয়ে হামলার চেষ্টা করেছিল। দুটো দেশই পরস্পরের মালবাহী জাহাজে হামলা চালায়।

গত সপ্তাহে তেহরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে ইরানের একটি ভূগর্ভস্থ পরমাণু স্থাপনায় নাশকতামূলক হামলার জন্য ইসরায়েলই দায়ী।

মাত্র কয়েকদিন আগে ইরান জানায়, ইসরায়েলি বাহিনী মোসাদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তারা তিন ব্যক্তির বিচার শুরু করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা করার সঙ্গে জড়িত থাকারও অভিযোগ আনা হয়েছে।

এছাড়াও ইরান দেশের ভেতরে বেশ কয়েকটি রহস্যজনক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছে। তাদের মধ্যে মহাকাশ বিষয়ক দু’জন কর্মকর্তাও রয়েছেন। ইরান বলছে, দায়িত্ব পালনের সময় তারা “শহীদ” হয়েছেন। এছাড়াও তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রকৌশলী। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য তারা ইসরায়েলকে দায়ী করেনি।

ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে ছায়াযুদ্ধ চলছে তা যেন এখন ছায়ার ভেতর থেকে বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। এমনকি তেহরান নামে একটি অ্যাপল টিভি শোতে দেখানো হয়েছে মোসাদের একজন এজেন্ট ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী রেভ্যুলুশনারি গার্ডের ভেতরে একেবারে উচ্চ পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে যিনি হোয়াইট হাউজে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। সেই রিচার্ড গোল্ডবার্গও (ইরানের গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র মোকাবেলা করাই ছিল তার দায়িত্ব) বলেছেন, ইরানের ভেতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি না হলে মহসিন ফখরিজাদেহকে হত্যা করা যেত না।

তিনি বলেন, “অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি পরমাণু স্থাপনায় ঢুকতে হলে অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কর্মকর্তার কাছে গিয়ে পৌঁছাতে হলে, সরকারের ভেতর থেকে সহযোগিতার প্রয়োজন।

ইরান বলে আসছে তাদের পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য হচ্ছে শান্তিপূর্ণ কাজে এর ব্যবহার। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে এসে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার পর থেকে ইরান সর্বোচ্চ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে শুরু করে। বলা হচ্ছে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার জন্য যতো ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন তারা এখন সেই পরিমাণ ইউরেনিয়াম সংগ্রহের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

ইরানের ভেতরে চালানো হামলার জবাবে সন্দেহ করা হচ্ছে যে তেহরানও ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি স্বার্থের ওপর আক্রমণ করেছে।

সূত্র: বিডি-প্রতিদিন
এম ইউ/২৫ জুন ২০২২

Back to top button