জাতীয়

রোজ গার্ডেনে হবে ঢাকা মহানগর ইতিহাস জাদুঘর

আবদুল্লাহ আল মামুন

ঢাকা, ২২ জুন – ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের দুই বছরও পার হয়নি। তার আগেই পূর্ব পাকিস্তানের অবহেলিত মানুষ জেনে গেছে এই স্বাধীনতা তাদের অধিকার আদায়ে কোনো কাজে আসছে না।

উর্দুভাষী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক ও তাদের এদেশীয় দোসররা হরণ করেছে বাঙালির সব অধিকার। সেই অধিকার ফিরিয়ে আনতেই এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঢাকার রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমানে আওয়ামী লীগ)’। দিনটি ছিল ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। অঙ্কের হিসাবে প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পূর্ণ করছে দলটি।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৯৭১ সালে সব শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সংগঠনটি বাঙালি জাতিকে উপহার দেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এরপর থেকেই রোজ গার্ডেন এবং আওয়ামী লীগ হয়ে উঠল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে রোজ গার্ডেনে হবে ঢাকা মহানগর জাদুঘর।

চার বছর আগে ২০১৮ সালে ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকায় ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন কিনে নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। আবার চার বছরের মাথায় এর সৌন্দর্য ফেরাতে সরকার ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫২ হাজার টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর আগে ১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রোজ গার্ডেনকে সংরক্ষিত এলাকা (ভবন) ঘোষণা করে।

আগামী জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে এবং পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ‘ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনের প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কার এবং ঢাকা মহানগর জাদুঘর স্থাপন’ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পটি গণপূর্ত অধিদপ্তর, শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরকে নিয়ে বাস্তবায়ন করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, রোজ গার্ডেন আবার ভরে উঠবে প্রস্ফুটিত গোলাপে। ভাস্কর্যগুলো ফিরে পাবে হারানো সৌন্দর্য। বেঙ্গল স্টুডিওকে সংস্কার করে একটি আধুনিক ফিল্ম স্টুডিওতে রূপান্তরের কাজও রয়েছে এই প্রকল্পের মধ্যে। নির্ধারিত ফি দিয়ে টিকিট কেটে দর্শনার্থীরা রোজ গার্ডেনে প্রবেশ করতে পারবেন।

সরকার কিনে নেওয়ার পর এই গার্ডেনের নিরাপত্তায় পুলিশ ও আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া আরও চার কর্মচারী রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। বর্তমানে সেখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রতন চন্দ্র পণ্ডিত সোমবার বলেন, ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন সংস্কার করে এর ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় দুই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী বছর ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এরপর তা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রকল্পের পিডি ও ডিপিডি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামী মাসে (জুলাই) কাজ শুরু হবে।

রোজ গার্ডেন প্রাসাদ সংক্ষেপে রোজ গার্ডেন নামে পরিচিত। এটি একটি ঐতিহাসিক বাগানবাড়ি, যা ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় কেএম দাস লেনে অবস্থিত। ১৯৩১ সালের দিকে ঋষিকেশ দাস নামের এক ব্যবসায়ী ২২ বিঘা জমির ওপর একটি দ্বিতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ভবনের বাগানে গোলাপের প্রাচুর্য থাকায় বাড়ির নাম হয় ‘রোজ গার্ডেন’। অভিনব নির্মাণশৈলীর কারণে এটি হয়ে ওঠে ঢাকার অন্যতম মনোরম ভবন। ঋষিকেশ দাস ১৯৩৬ সালের দিকে ব্যবসায়ী খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশীদের কাছে বাড়িসহ বাগানটি বিক্রি করে দেন। এরপর কাজী আবদুর রশীদ নিজের নামে এই বাড়ির নামকরণ করেন ‘রশীদ মঞ্জিল’। কিন্তু ‘রোজ গার্ডেন’ নামটি মানুষের মুখে মুখে রয়েই যায়।

কাজী আবদুর রশীদ মারা যান ১৯৪৪ সালে। এরপর রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান তার বড় ছেলে কাজী মোহাম্মদ বশীর (হুমায়ুন সাহেব)। এ কারণে সেসময় ভবনটি ‘হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি’ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বেঙ্গল স্টুডিও এবং মোশন পিকচার্স লিমিটেড রোজ গার্ডেন প্যালেসের ইজারা নেয়। হারানো দিন নামের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছিল এই বাড়িতেই।

ইজারাগ্রহীতা বেঙ্গল স্টুডিওর সঙ্গে মামলায় জড়িয়ে পড়ে কাজী আবদুর রশিদের পরিবার। এ মামলায় লড়ে জয়ী হলে ১৯৯৩ সালে বাড়িসহ গার্ডেনের মালিকানা স্বত্ব ফিরে পান মৃত কাজী আবদুর রশিদের মেজো ছেলে কাজী আবদুর রকীব। তিনি মারা যাওয়ার পর স্ত্রী লায়লা রকীব পান এর মালিকানা।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমান আওয়ামী লীগ) গঠন হয়। প্রায় ৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের প্রাচীরবেষ্টিত পশ্চিমমুখী রশীদ মঞ্জিলের উচ্চতা প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফুট। ভবনের মূল বারান্দার সঙ্গে রয়েছে অর্ধচন্দ্রাকৃতির ব্যালকনি। এর অবস্থান প্রবেশপথের তিনটি খিলানের ওপরে। ভবনের বিভিন্ন অংশে কাঠ, রঙিন কাচ ও লোহার সমন্বয়ে তৈরি এবং সেগুলো জটিল জ্যামিতিক নকশা, লতাপাতা ও বিভিন্ন প্রাণীর মোটিফে (সজ্জায়) অলংকৃত। মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় পাঁচটি কামরা আর একটি বড় নাচঘর আছে। নিচতলায় আছে আটটি কামরা।

এই ভবনের দায়িত্বে নিয়োজিত নৈশ প্রহরী মোহাম্মদ ইলিয়াস রোববার বলেন, সরকার রোজ গার্ডেন কিনে নেওয়ার পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মচারী হিসাবে তাকে এখানে পাঠানো হয়। সেই থেকে তিনিসহ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আরও তিন কর্মচারী (একজন অফিস সহকারী ও দুইজন মালি) রোজ গার্ডেনে রয়েছেন। সপ্তাহে একবার রশীদ মঞ্জিলের দরজা-জানালা খোলা হয়, বাকি সময় তালাবদ্ধ থাকে বলে জানান তিনি। এই ভবনের দোতলার পেছনদিকে সিঁড়ির কাছে একটি ছোট কক্ষে থাকেন মোহাম্মদ ইলিয়াস।

রোজ গার্ডেন প্যালেসের পশ্চিম ও উত্তরদিকের দেওয়ালের মধ্যবর্তী অংশে আছে দুটি ফটক। পশ্চিমদিকের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমেই আছে একটি বিস্তীর্ণ খোলা প্রাঙ্গণ। এখানে মঞ্চের ওপর দণ্ডায়মান নারীর ভাস্কর্য রয়েছে। পূর্বাংশের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে একটি বড় পুকুর। পুকুরের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের মাঝামাঝি একটি করে বাঁধানো পাকা ঘাট আছে। প্রকল্পের আওতায় এই পুকুরও সংস্কার করা হবে। মূল ফটকের ডানে ও পুকুরের পাড়ে রয়েছে একটি তিনতলা ভবন। বর্তমানে এই ভবনটি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এই ভবনে স্থাপন করা হবে ঢাকা মহানগর জাদুঘর। রোজ গার্ডেনের সর্বশেষ মালিক কাজী আবদুর রকীবের পরিবার এই ভবনে বসবাস করতেন বলে জানা গেছে।

সূত্র : যুগান্তর
এম এস, ২২ জুন

Back to top button