জাতীয়

টানা বৃষ্টিতে এবার তলিয়ে গেল হবিগঞ্জ মৌলভীবাজার

সিলেট, ২১ জুন – চার-পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। যে কয়েক জায়গায় পানি কমছে, নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে তার চেয়ে বেশি এলাকা। সিলেট, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তি থাকলেও অবনতি হয়েছে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে। এর মধ্যে মেঘালয়ে কিংবা সিলেট অঞ্চলে নতুন করে বৃষ্টি হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। যদিও বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।

সিলেট ব্যুরো জানিয়েছে, পানি কমতে শুরু করলেও আদতে কোনো সুখবর নেই সিলেটের জন্য। মাসজুড়েই বৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সুরমা নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও বাড়ছে কুশিয়ারা নদীর পানি। পানি সামান্য কমলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। নগরীর রাস্তাঘাটও পানিতে তলিয়ে রয়েছে। উপশহরের প্রধান সড়কে এখনো কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমর পর্যন্ত। তালতলা, তেররতন, ঘাসিটুলাসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো পানি রয়েছে।

সিলেটে পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী একেএম নিলয় পাশা জানান, সুরমা নদীর পানি আরও কমবে। তবে কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ার কারণে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কিছু এলাকা নতুন করে প্লাবিত হতে পারে। এ ছাড়া গোয়াইনঘাট, কোম্পানিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, সদর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ, ওসমানীনগর, বালাগঞ্জের অনেক এলাকার পানি ধীরে ধীরে কমছে।

‘নিরাপত্তার জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ’

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা) জানান, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয, আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখায় ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যুৎ সংক্রান্ত জরুরি প্রয়োজনে ০১৩১৩০৯৬২৯৬ (সিলেট) ও ০১৭০৮১৪৯৫০২-৩ (ঢাকা) নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বন্যার্তদের জন্য আরও বরাদ্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা) জানান, গতকাল বন্যার্তদের সাহায্যার্থে নেত্রকোনার জন্য আরও ১০০ মেট্রিক টন চাল, ১০ লাখ টাকা এবং তিন হাজার প্যাকেট শুকনো ও অন্যান্য খাবার বরাদ্দ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এর আগে দেশের ১১ জেলায় বন্যায় মানবিক সহায়তা হিসেবে জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে ১৭ মে থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত ২ হাজার ১২০ মেট্রিক টন চাল, তিন কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং ৬৮ হাজার শুকনো ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বিমানবন্দর চালু হতে আরও অন্তত ২ দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা) জানান, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বন্যার পানি সরলেও রানওয়ে পরিষ্কার আর নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরীক্ষার জন্য উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে অন্তত আরও দুদিন লাগবে। বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা আবদুল গনি গতকাল বলেন, বিমান ওঠানামার জন্য যে সংকেত বাতিগুলোর প্রয়োজন হয়, সেগুলো এখন চেক করা হচ্ছে। পাশাপাশি রানওয়ের কাছে পানি উঠে যাওয়ায় সেখানেও পরিষ্কার ও পরীক্ষা করে দেখার বিষয় আছে। সব মিলিয়ে দুদিন সময় লাগতে পারে।

গত শুক্রবার বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ওঠানামা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ বিমানবন্দর থেকে দিনে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট ওঠানামা করে, এগুলোর রুট মূলত সিলেট থেকে ঢাকা ও লন্ডন।

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারের প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গতকাল সকালে মনু নদের চাঁদনীঘাট পয়েন্টের পানি বিপদসীমার দেড় সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বেড়েছে কুশিয়ারা নদীতে। জেলায় সব মিলিয়ে ১৫৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কুলাউড়া-বড়লেখা আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ প্লাবিত হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। বড়লেখা, জুড়ি, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলার নতুন করে প্লাবিত হয়েছে আরও ৮০টি গ্রাম।

ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি ‘মহাবিপদ সীমায়’ চলে গেছে বলে জানিয়েছেন ফেঞ্চুগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা গিয়াসউদ্দিন মোল্লা।

বিয়ানীবাজার (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৭০ ভাগ এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। আলীনগর ও চারখাই ইউনিয়ন এবং কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী দুবাগ, শেওলা, কুড়ারবাজার, মাথিউরা এবং সোনাই নদীর তীরবর্তী তিলপাড়া, মোল্লাপুর, লাউতা ও মুড়িয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার ৮০ শতাংশ সড়ক তলিয়ে গেছে। গতকাল সকালে কুশিয়ারার শেওলা পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

জকিগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, সুরমা নদীর পানিতে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টায় আমলশীদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে জকিগঞ্জ-সিলেট সড়ক। সেখানে ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার ৪ উপজেলায় ৩৪টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার গ্রামে পানি ঢুকেছে। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। খোয়াই নদীর পানি সীমান্ত সংলগ্ন বাল্লা পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪৭ সেন্টিমিটার এবং হবিগঞ্জ সদরে মাছুলিয়া পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। যে কোনো সময় শহররক্ষা বাঁধ ভেঙে যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় শহরবাসীকে সতর্ক থাকার জন্য মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন। এদিকে কুশিয়ারা নদীর পানিও বেড়ে যাওয়ায় নবীগঞ্জ ও আজমিরিগঞ্জ উপজেলায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

বাহুবল (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, বাহুবলে করাঙ্গী নদীর পানি বাড়ায় আশপাশের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও।

নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, কুশিয়ারা-কালনী-বিবিয়ানা নদীর পানি বেড়ে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি জানান, বন্যার পানিতে এক হাজার ৮২০টি পুকুর ডুবে গেছে। এতে ভেসে গেছে ২২১ মেট্রিক টন মাছ। সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি ৩ লাখ টাকা।

ইসলামপুর (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, বন্যার পানিতে গতকাল সকালে চিনাডুলীর পশ্চিম বামনা ঘোনাপাড়ায় আরিফা আক্তার (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে ওই গ্রামের আলম মিয়ার মেয়ে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। জেলার ১০ উপজেলার ৬২ ইউনিয়নের ৩৯ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় আছেন।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঘোড়াউত্রা ও কালনী নদীর পানি বাড়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এরই মধ্যে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া করিমগঞ্জ, তাড়াইল, নিকলী, বাজিতপুর ও ভৈরবের নিচু এলাকা ডুবে মগেছে। এসব এলাকার রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। ভেসে গেছে কয়েক হাজার মাছের খামার।

অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, হাওর ও নদনদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে উপজেলার অধিকাংশ গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলার আট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

রাউজান (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, সদর ইউনিয়ন, ডাবুয়া, বিনাজুরি, উরকিরচর, কদলপুর, পূর্বগুজরা, পশ্চিম গুজরা এবং পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বসতঘর, ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

সোনাগাজী (ফেনী) প্রতিনিধি জানান, সম্ভাব্য বন্যার কবল থেকে রক্ষার জন্য ফেনী নদীর সোনাগাজীতে অবস্থিত ফেনী রেগুলেটরের ৪০টি সøুইসগেট খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর আগে গতকাল সকালে মুহুরী নদীর ‘১২২ কিলোমিটার’ বাঁধের দুটি স্থানে ভেঙে ফুলগাজীর কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়।

সূত্র : আমাদের সময়
এম এস, ২১ জুন

Back to top button