ব্যবসা

ডলারের বাজার সংকটে ব্যাংকই ভূমিকা রেখেছে কি?

হাছান আদনান

ঢাকা, ১৪ জুন – ব্যবসায়ীরা আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে গেলে ব্যাংক বলছে, ডলার নেই। আবার বাড়তি দাম পরিশোধ করলে চাহিদামাফিক ডলারের ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তেই। দেশের ব্যাংক খাতের এ হালচাল চলছে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে। ডলারের বাড়তি চাহিদা কাজে লাগিয়ে গ্রাহকদের জিম্মি করছে কোনো কোনো ব্যাংক। এ পরিস্থিতিতে ডলারের বিদ্যমান তীব্র সংকট কৃত্রিম কিনা, সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। ডলারের দাম নিয়ে ব্যাংকারদের কারসাজির প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে।

ব্যাংকগুলো প্রতিদিন নিজেদের মতো করে ডলারসহ শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রাগুলোর দর ঘোষণা করে। নীতি অনুযায়ী, নিজেদের ঘোষিত দরেই লেনদেন করার কথা ব্যাংকগুলোর। কিন্তু গত কয়েক মাসে ব্যাংকগুলো নিজেদের ঘোষিত দর নিজেরাই ভঙ্গ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো নিজেদের ঘোষিত দর যেমন লঙ্ঘন করেছে, একইভাবে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স কেনার ক্ষেত্রেও ঘোষিত দর মানেনি। এক্ষেত্রে আগ্রাসী ভূমিকায় ছিল বেসরকারি খাতের বড় কয়েকটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর ঘোষিত দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে ডলার কেনাবেচার কারণেই বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে নীতিভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত ব্যাংকগুলোকে ডেকে নিয়ে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের বিপুল চাহিদা আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ডলার সংকট হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কিছু ব্যাংকের অনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণেই বিদ্যমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আবার সংকটকে সামনে রেখে গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি মূল্য আদায় করায় অনেক ব্যাংকের মুনাফার পরিমাণও বেড়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কিছু ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। এ কারণে ডলারের সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া পদক্ষেপের সুফলও পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলছেন, ডলারের বাজার নিয়ে কোনো কারসাজি যাতে না হয়, এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরু থেকেই সতর্ক ছিল। কিন্তু তার পরও আমরা দেখছি, কিছু ব্যাংক ঘোষিত দরের চেয়ে বেশি দামে ডলার কেনাবেচা করেছে। এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোকে সতর্কও করা হয়েছে। রোববার কিছু ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের ডাকা হয়েছিল। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোর জন্য বেশকিছু কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। রফতানি আয় প্রত্যাবাসন করার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে নগদায়ন করা, বাড়তি দামে রেমিট্যান্স কেনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর পরও নির্দেশনার ব্যত্যয় হলে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে গতকালও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিন টাকার অবমূল্যায়ন করা হয়েছে ৫০ পয়সা। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৯২ টাকা ৫০ পয়সা ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে আরো ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। এতে চলতি অর্থবছরেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিক্রি করা ডলারের পরিমাণ প্রায় ৭ বিলিয়নে গিয়ে ঠেকেছে।

২ জুন প্রতি ডলার ৮৯ টাকায় বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ হিসাবে চলতি মাসেই এখন পর্যন্ত ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়েছে সাড়ে ৩ টাকা। আর ২০২১ সালের জুনে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়েছে ৭ টাকা ৭০ পয়সা। একই সময়ে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৯ শতাংশেরও বেশি।

বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রায় প্রতিদিনই রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরও বাজার স্থিতিশীল করতে না পেরে ডলারের এক দর বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার সপ্তাহ না পেরোতেই সেটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ডলার বিক্রি, দাম বেঁধে দেয়া ছাড়াও বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আরো বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে বিলাসপণ্যের ঋণপত্রের মার্জিন ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার মতো পদক্ষেপও। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া সিদ্ধান্তের সুফল এখনো দৃশ্যমান হয়নি। ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতার কারণেই ডলারের বাজারে শৃঙ্খলা ফিরছে না বলে অভিযোগ উঠছে।

ডলারের বাজারে শৃঙ্খলা না থাকায় দেশের অনেক আমদানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে দেশের প্রথম সারির একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বলেন, ডলার নেই এ অজুহাতে ব্যাংক এলসি খুলতে চায়নি। আবার বাড়তি দাম দিলে অন্য ব্যাংক থেকে ডলার কিনে এনে দেবেন, এমন প্রস্তাব দিয়ে এলসি খুলেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জেনেছি, ওই ব্যাংক নিজের কাছে থাকা ডলার দিয়েই এলসি খুলেছে। এভাবে ব্যাংকারদের কারসাজির শিকার হয়ে আমার মতো অনেক আমদানিকারকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের সত্যতা আছে বলে মনে করেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। তিনি বলেন, অনৈতিক অনেক লেনদেনের কথা আমাদের কানেও এসেছে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক বরাবরের মতোই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজেদের রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স দিয়েই আমরা আমদানি ব্যয় পরিশোধে সক্ষম। এ কারণে কারো কাছ থেকে ডলার কিনে আনার প্রয়োজন আমাদের হয়নি।

মুনিরুল মওলা জানান, কভিডে অনেক এলসির পেমেন্ট যথাসময়ে হয়নি। ওইসব পেমেন্ট এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার দেশের আমদানির যে প্রবৃদ্ধি সে তুলনায় রফতানি আয় বাড়েনি। রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক কমেছে। রফতানির কাগজপত্র আসতেও অনেক বিলম্ব হচ্ছে। বিদেশ ভ্রমণ উন্মুক্ত হওয়ায় এখন খুচরা বাজারেও ডলারের চাহিদা অনেক বেশি। সব মিলিয়ে দেশে ডলারের তীব্র চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। তবে এক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক। এক-দুই মাসের মধ্যে পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে।

রেকর্ড আমদানির চাপে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ৪১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। ৮ জুন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ১৭০ কোটি বা ৪১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। যদিও গত আগস্টে রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৪ হাজার ১১০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ, যেটি ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। বিপরীতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশে ৬ হাজার ৮৬৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪১ দশমিক ৪২ শতাংশ। রেকর্ড এ আমদানি প্রবৃদ্ধি দেশের ২ হাজার ৭৫৭ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করেছে। এতদিন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ হয়েছে। কিন্তু এখন রফতানি আয়ের সঙ্গে রেমিট্যান্স যুক্ত করেও আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৭৩০ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কম। সব মিলিয়ে এপ্রিল শেষে সরকারের চলতি হিসাবে রেকর্ড ১ হাজার ৫৩১ কোটি বা ১৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বেশি দামে ডলার কিনতে অনেক ব্যাংক বাধ্য হয়েছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের সব ব্যাংকের ব্যবসায়িক সক্ষমতা সমান নয়। কিন্তু সবাই যথাসময়ে এলসি দায় পরিশোধ চায়। ব্যাংকের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় এলসি দায় পরিশোধ করতে আমরা বাধ্য। এ পরিস্থিতিতে কেউ কেউ বেশি দামে ডলার কিনতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এর মধ্যেও সংকটের সময় কেউ সুযোগ নিলে সেটি ভিন্ন কথা। ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে বিলাসপণ্য আমদানি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু আমরা প্রস্তাবিত বাজেটে সেটি দেখিনি। বিলাসী গাড়ি আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়নি। উড়োজাহাজ-হেলিকপ্টারের মতো বিলাসী পরিবহনের শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

সূত্র : বণিক বার্তা
এম এস, ১৪ জুন

Back to top button