শিক্ষা

চাকরি স্থায়ী হচ্ছে না শিক্ষকদের

ঢাকা, ০৭ জুন – বছরের পর বছর শিক্ষক নিয়োগ হলেও সরকারি মাধ্যমিকে সহকারী শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ী হচ্ছে না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের টানাপোড়েন এবং কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার অভাবে সব বিধি-শর্ত পূরণ করেও চাকরি স্থায়ী করতে ব্যর্থ হচ্ছেন শিক্ষকরা।

তারা বলছেন, চাকরি স্থায়ী না হওয়ার কারণে সরকারি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ থাকার পরও বাস্তবায়ন করতে গড়িমাসি করছে মাউশির সরকারি মাধ্যমিক শাখা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক জানান, তিনি এ বছর প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছিলেন ইতালি। কিন্তু চাকরি স্থায়ী না হওয়ার কারণে যেতে পারেননি। এই নিয়ে নানা চেষ্টা-তদবিরও করেছেন। কিন্তু কর্মকর্তাদের অসহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত আর কোনো কাজ হয়নি।

অন্য এক শিক্ষক বলেন, আমার মা মৃত্যু পথযাত্রী। তাকে নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু আমার চাকরি স্থায়ী না হওয়ার কারণে নিজের পাসপোর্ট হচ্ছে না। এখন কী করবো তা বুঝতে পারছি না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাধ্যমিক স্তরে চাকরি স্থায়ী করতে ৩০-৪০ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহণ করে দপ্তর সংশ্লিষ্টরা। এর আগেও অহরহ এমনই ঘটনা ঘটেছে। ৩৪,৩৫,৩৬তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ননক্যাডার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকগণের চাকরির বয়স চার বছরের বেশি হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ীকরণের জন্য কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি মাউশি।

আশ্চর্যের বিষয় গেল তিন বছরে চাকরি স্থায়ী হয়েছে মাত্র এক জন শিক্ষকের! তিনি সরকারি মাধ্যমিকে ১৯৯২ সালে যোগদান করেছিলেন। যখন অবসরে যাচ্ছিলেন তখন দেখা গেল তার চাকরিই স্থায়ী হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর ৬ অক্টোবর ৩৪তম বিসিএস নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক শিক্ষিকাদের চাকরি স্থায়ীকরণ তথ্য চেয়েছিল মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আলমগীর হুছাইনের সই করা চিঠিতে বলা হয়, এই চিঠি প্রাপ্তির দুই কার্যদিবসের মধ্যে শিক্ষকদের তথ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু বছরের পর বছর গেলেও তা অদৃশ্য কারণে দিতে পারেনি মাউশির মাধ্যমিক শাখা।

হয়রানির নাম মাধ্যমিক শাখা

একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, ২০২০ সালে চিঠির আলোকে গত দুই বছরে একই কাগজ তারা তিনবারের বেশি সময় মাউশিতে জমা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ এসব ফাইল অধিদপ্তর থেকে অদৃশ্য কারণে গায়েব হয়েছে।

এদিকে ৩৪ তম বিসিএস থেকে যারা সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন, এসব কর্মকর্তার স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া ১ বছর আগেই শেষ হয়েছে। ৩৫তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের স্থায়ীকরণের প্রজ্ঞাপন বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশ করা হচ্ছে। শুধু সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া দুই বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। বছরের পর বছর স্থায়ীকরণ ঝুলিয়ে রাখার কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষকদের হয়রানি করা হচ্ছে। যার নেপথ্যে ঘুষ বাণিজ্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।

অফিসের নির্দেশনায় দিশাহীন শিক্ষকরা

সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সময় যে সকল শর্ত প্রদান করা হয়েছে তার সব শর্ত পূরণ করে স্থায়ীকরণের অপেক্ষায় রয়েছে বর্তমানে ৫ শতাধিক শিক্ষক। ৩৪ তম বিসিএস থেকে যারা সরকারি মাধ্যমিকে শিক্ষক হয়েছেন তারা বলছেন, ২০১৭ সালে নিয়োগ পাওয়ার তিন বছর পর চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য ২০২০ সালের মার্চে কাগজপত্র উপ-পরিচালকের কার্যালয় হতে মহাপরিচালক কার্যালয়ে পাঠায়। কিন্তু স্থায়ীকরণের জন্য কোন কোন কাগজপত্র প্রয়োজন তার কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকায় হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর সহকারী শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ করার ক্ষেত্রে যেসব কাগজপত্র লাগবে তার জন্য সুস্পষ্ট কাগজপত্রের একটি লিস্ট অফিস অর্ডারের সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছে। আবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ শাখায় প্রভাষক ও প্রশাসন শাখার সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য যে সব কাগজপত্র জমাদান করা দরকার সেই সব কাগজপত্র জমাদান সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই অধিদপ্তরের কলেজ শাখা এবং প্রশাসন শাখা যেখানে স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কাগজপত্রের তালিকা এবং প্রক্রিয়া দেয়া হয় সেখানে মাধ্যমিক শাখা সম্পূর্ণ বিপরীত।

সমন্বয়হীনতায় অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়

স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে সব শর্ত পূরণ করার পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ৪৭ জন শিক্ষকের কাগজপত্র সম্পর্কিত একটি ফাইল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মাধ্যমিক শাখায় অক্টোবর ২০২১ সালে পাঠানো হয়। অথচ এখন পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোনো গেজেট প্রকাশ করেনি। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে দুই কার্যদিবসের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে মাউশির কাছে স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হলেও মাউশি এখন পর্যন্ত এই তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়নি।

স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাবে অর্থ লেনদেনে বাধ্য করা হচ্ছে

স্থায়ীকরণের চিঠিতে দিকনির্দেশনা না থাকায় সহকারী শিক্ষকগণ যেসকল কাগজপত্র জমা দিবেন তা অনেক স্কুলের প্রধান শিক্ষকগণ জানেন না ফলে সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়ার শুরুটি স্কুলেই থমকে দাঁড়ায়। তাছাড়া কোনোভাবে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে বুঝিয়ে স্থায়ীকরণের কাগজপত্র ফরওয়ার্ডিং করা গেলেও আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের কার্যালয় সঠিক তথ্যের অভাবে পুনরায় হয়রানি করতে থাকে। তথ্যের অভাবে জটিলতা দেখা দেওয়ার ফলে আবার ডিডি অফিসগুলোতে আর্থিক লেনদেন করে কাগজপত্র ফরওয়ার্ডিং করে মাউশি বরাবর পাঠাতে হয়। মাউশিতে স্থায়ীকরণের জন্য আবার জনপ্রতি ২০-৩০ হাজার টাকার একটি সিন্ডিকেট চলমান। এই টাকা ঘুষ দেয়া হলেই তখন আর কাগজ-পত্রের হিসাব থাকেনা বলে অভিযোগ শিক্ষকদের।

স্থায়ীকরণ না হওয়া এসডিজি-৪ অর্জনের ক্ষেত্রে বাধা

স্থায়ীকরণ না থাকায় শিক্ষকদের অগ্রিম বর্ধিত বেতন সুবিধার কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি মন্ত্রণালয়। উচ্চশিক্ষার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো ধরনের ছাড়পত্র পাচ্ছেন না শিক্ষকরা। এর ফলে বৈদেশিক বৃত্তি, বিএড ডিগ্রি অর্জনের পর এমএড ডিগ্রির জন্য আবেদন করতে পারছেন না। সময়মতো স্থায়ীকরণ না হওয়ার কারণে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ধরনের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ এমনকি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডেপুটেশন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়াও স্থায়ীকরণ না করা হলে একজন শিক্ষক ব্যক্তিগত, চিকিৎসা বা ধর্মীয় যেকোনো কাজে দেশের বাইরে যেতে পারছেন না তারা।

যা বলছেন কর্মকর্তারা

এ বিষয়ে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

মাউশির মাধ্যমিক শাখার সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম টুকু বলেন, চাকরি স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে শর্ত দুটো। চাকরিতে প্রশিক্ষণ অর্থাৎ বিএড লাগবে এবং বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কিন্তু ২০২১ সালের যে বিধি হয়েছে সেখানে বিভাগীয় পরীক্ষার বিষয়টি নেই। মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে বিষয়টি আমরা জানিয়ে দিয়েছি। সর্বশেষ আমরা ৪৭ জনের একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আশা করছি এই ৪৭ জনের চাকরি স্থায়ী হয়ে যাবে।

অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়টি শিক্ষকদের সঙ্গে যায় না। এক্ষেত্রে যে যোগ্যতা ও শর্ত চাওয়া হয়েছে, তা অনেকের নেই। তিনি বলেন, এভাবে গড়পরতা কথা শুনলে মনে হয় মন্ত্রণালয় কোনো কাজ করে না। শিক্ষকদের উচিত আমার কাছে এসব সমস্যা নিয়ে আসা। তবেই হয়তো সমাধান বা নির্দেশনা দেয়া যেত।

সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল
এম এস, ০৭ জুন

Back to top button