জাতীয়

গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বিএনপি-জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের পদায়নের অভিযোগ

ঢাকা, ০৩ জুন – সরকারের আমলাদের বিরুদ্ধে ব্যপাক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতারা। স্বাস্থ্য খাতসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বিএনপি-জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধীদের পদায়ন করা হচ্ছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।

বৃহস্পতিবার (২ জুন) রাতে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটশন বাংলাদেশ (আইইবি) হল রুমে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে পেশাজীবীদের মত বিনিময় সভায় পেশাজীবী নেতারা অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক বলেন, আমার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন জামায়াত-বিএনপির অভয়ারণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যদি তাই হয়, আর শেখ হাসিনার অনুসারীরা অপসারিত হয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ বিশেষ করে সিভিল সার্জন, পরিচালক এবং অন্যান্য পদে প্রসাশন ক্যাডারে কিছু ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে, যারা আমাদের চেতনাকে লালন করে না।

তিনি আরও বলে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন যোগ্যতা, দক্ষতা জেষ্ঠ্যতা পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্য হবে সরকারি কর্মক্ষেত্রের বিবেচ্য বিষয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি বাদ দিয়ে যেভাবে বিরুধীদের পদায়ন করা হচ্ছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ সমূহে, আমি শঙ্কিত আমাদের সরিয়ে আমাদের পেছনে ফেলে দিয়ে কোনো একটি কুচক্রি মহল ফায়দা হাসিল করতে চায়।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটশন বাংলাদেশ (আইইবি)-এর সভাপতি প্রকৌশলী নূরুল হুদা বলেন, বাংলাদেশ ইন্হিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বাক্ষাত চেয়ে চারটা চিঠি দিয়েছি। প্রকৃতিক ভাবে যে সমস্য আছে কোভিড-১৯ এর মধ্যে আমলারা তো ঠিকই দেখা করেছে, আমরা কোভিড টেষ্ট করে দেখা করতে পারতাম। কিন্তু একটি অদৃশ্য দেয়াল সেটা বন্ধ করে রেখেছে। কোভিড-১৯ এ প্রমাণিত হয়েছে, ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে যারা কর্মে আছেন তারাই হচ্ছে প্রথম সারির যোদ্ধা। আর বিশ্বে যত উন্নয়ন হয়েছে তাদের প্রথম কাতারের সৈনিক হচ্ছে প্রকৌশলীরা। আজকে প্রথম শ্রেণির সৈনিক যারা তাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কোনো ব্যবস্থা নাই, আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে। পেশাজীবীদের দূরে সরিয়ে রাখলে আগামী নির্বাচনে প্রভাব পড়বে। এই পেশাজীবীদের সঙ্গে জনগনের যে সম্পর্ক এর একটা বিরাট ইফেক্ট আগামী নির্বাচনে পড়বে। এখন যদি ডিসিরাই সমস্ত বাংলাদেশের কাজ করে তহাহলে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, আমাদের মেডিক্যাল কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেন।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজকে ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ ডিসিদের দিয়ে করাচ্ছেন। আজকে একটা পদ্মা ব্রিজের মধ্যে রড কতটুকু লাগবে সেটা কি পদ্মা ব্রিজের পিডি শফিক জানবে? না মুন্সীগঞ্জের ডিসি বলবে। সমস্ত কাজ ডিসিদের হাতে দিয়ে প্রকৌশলীদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন। আমরা বাংলাদেশের ১ লাখ প্রকৌশলী করোনাভাইরাসের মধ্যে কাজ করেছি, আর তাদের দূরে সরিয়ে দিয়ে ডিসিদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যেই সংস্থা থেকে এমন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে তা বাতিল করতে হবে।

বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, শিক্ষকদের কিছু জিনিস আপনি অবাক হয়ে যাবেন, আমাদের বেসরকারি শিক্ষকরা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালও হতে পারবে না, সরকারি কলেজ থেকে ডেপুটেশনে দায়িত্ব নিয়ে এসে বসবেন। গত তিন বছরে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী একদিনের জন্যও আমাদের সঙ্গে দেখা করেননি, বসেন নি। তিনি সমস্ত শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তন করে দিলেন। আমরা জানিও না, আমাদের বাদ দিয়ে কি কারিকুলাম তিনি করলেন আর কিভাবে চালাবেন তিনিই জানেন। আমরা ধৈর্য্ ধরছি আন্দোলনে যাচ্ছি না। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়। এমন সব লোকদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে যাদের সঙ্গে শিক্ষদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আজকে আমলাতন্ত্র, যারা মন্ত্রনালয়ে আছেন তারা আমাদের বিরালের মতো মনে করে।

আওয়ামী লীগের স্বাস্থ বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা বলেন, এমন সকল লোকদের স্বাস্থ মন্ত্রনালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কর্মকর্তা যারা দায়িত্বে আছেন মেডিক্যালের একটা বইয়ের নামও উচ্চারণ করতে পারে না। আপনারা জানেন একটা বিষয়ের উন্নতি কল্পে যেগুলো দরকার তাদের ক্ষমতা নাই। কোথা থেকে নেয় অধিদফতর থেকে। অধিদফতর কিন্তু মন্ত্রণালয়ের আন্ডারে। আমার মনে হয় যার যার মন্ত্রণালয় তার হাতে যেন দেওয়া হয়।

পেশাজীবীদের এ ক্ষুব্ধ বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এখন খুবই চ্যালেঞ্জিং একটা সময় আমরা পার করছি। সব খানে অস্থিরতা, ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে সবাই বিষয়টা মর্মে মর্মে বুঝতেছে। আমরাও উপলব্ধি করছি। আমাদের অর্থনৈতিক জীবনেও এই যুদ্ধ প্রভাবিত করতে পারে সেটা আমরাও আচ করতে পেরেছি। আমাদের ভাগ্য ভালো আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো একজন ডায়নামিক নেতা পেয়েছি। তিনি জেগে আছেন বলেই বাংলাদেশের মানুষ শান্তিতে ঘুমুতে পারে।

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, আজকে আমাদের মধ্যে আর তার (শেখ হাসিনা) মধ্যে একটি সম্পর্কের দেয়াল উঠে গেছে। সেটা তিনি তুলেন নি, সেটা হয়েছে কোভিড-১৯ এর কারণে। তিনি সুস্থ না থাকলে জাতিকে কে, কিভাবে সুস্থ রাখবে। সংকটে তিনি ক্রাইসিস ম্যানেজার। আমাদেরকেও তিনি বিভিন্ন নির্দেশনা টেলিফোনে দিতেন। মোবাইলে নির্দেশনা দিতেন।

পেশাজীবীদের এ সব কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর আশ্বাস দিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগের অফিসে এখন প্রচুর ভিড়। সেই ভিড় আওয়ামী লীগ নেতাদের নয়, সেখানে যারা যায় তাদের বেশির ভাগই চাকরির প্রার্থী অথবা ট্রান্সফার (বদলি) নিয়ে তদবির করতে আসে। দলীয় লোক কম আসে। শেখ হাসিনা আপনাদের দূরে সরিয়ে দেননি, এমন একটি অবস্থা পার করেছেন যেখানে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে জীবনের সঙ্গে জীবিকার সমন্বয় রেখেছেন। আর সেটা তার জন্যই সম্ভব হয়েছে। সময়মত তিনি আপনাদের সঙ্গে বসবেন। আমি সব মনোযোগ দিয়ে শুনেছি, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সব স্পষ্ট করে বলবো।

এ সময় বিএনপির সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, মির্জা ফখরুল আজকে আমাকে বলেন, আমি নাকি সংযত ভাষায় কথা বলতে পারি না। অথচ তারাই বলেছেন ‘৭৫ এর হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’। ফখরুল সাহেব তার কর্মীদের, সহকর্মীদের থামাতে পারেন না। এর প্রতিবাদ করেন না। তা হলে এতে বুঝে নিতে হবে বিএনপির নেতৃত্বের ‘টপ টু বটম’ এই খুনের রাজনীতি এখনও পরিহার করতে পারে নি। এখনও বিএনপি আকড়ে ধরেছে তাদের হত্যা সন্ত্রাসের যে রাজনীতি, যে রাজনীতি দিয়ে তারা ক্ষমতায় বসেছে বন্দুকের নল উচিয়ে।

পেশাজীবী সমন্নয় পরিষদের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, পেশাজীবী সমন্নয় পরিষদের সদস্য সচিব ডা. কামরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি প্রফেসর মাকসুদ কামাল, আইইবির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহাদাত হোসেন শীবলু, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল নূর দুলাল প্রমুখ।

সূত্র : বাংলানিউজ
এম এস, ০৩ জুন

Back to top button