ফুটবল

ইতালিকে উড়িয়ে আর্জেন্টিনার ফাইনালিসিমা জয়

রক্ষণ জমাট রেখে ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপট দেখাল আর্জেন্টিনা। মাঝে অল্প কিছু সময় নিজেরা পরীক্ষা দিলেও আক্রমণের পর আক্রমণে তার ব্যতিব্যস্ত রাখল ইতালিকে। লিওনেল মেসি-লাউতারো মার্তিনেজ-আনহেল দি মারিয়ারা উপহার দিলেন নজরকাড়া নৈপুণ্য। তাতে ২০২২ সালের লা ফাইনালিসিমার শিরোপা নিজেদের করে নিল লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।

বুধবার রাতে ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছে ইউরোর শিরোপাধারী ইতালিকে। প্রথমার্ধে তাদের পক্ষে লক্ষ্যভেদ করেন লাউতারো ও দি মারিয়া। শেষদিকে বদলি নামা পাওলো দিবালা বাড়ান জয়ের ব্যবধান।

ম্যাচের ৫৬ শতাংশ সময়ে বল পায়ে রেখে গোলমুখে ১৭টি শট নেয় দুইবারের সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। এর মধ্যে লক্ষ্যে ছিল নয়টি। অন্যদিকে, কাতার বিশ্বকাপে উঠতে ব্যর্থ হওয়া চারবারের সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালির সাতটি শটের মধ্যে লক্ষ্যে ছিল তিনটি।

দ্বিতীয় মিনিটেই প্রতিপক্ষের গোলমুখে হানা দেয় আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠে রদ্রিগো দি পলের কাছ থেকে বল পেয়ে যান দি মারিয়া। ইতালিয়ান গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুমা গোলপোস্ট ছেড়ে অনেকখানি এগিয়ে ছিলেন। সুযোগ বুঝে মাঝমাঠের একটু সামনে থেকেই দূরপাল্লার শট নেন দি মারিয়া। তার বিলাসী প্রচেষ্টা থাকেনি লক্ষ্যে।

দ্বাদশ মিনিটে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে দিতে হয় পরীক্ষা। মিডফিল্ডার জর্জিনহো বিনা বাধায় আক্রমণে উঠে খুঁজে নেন জিয়াকোমো রাসপাদোরিকে। ডি-বক্সের বাইরে থেকে তার বাঁকানো শট বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ষা করেন মার্তিনেজ।

২০তম মিনিটে ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরো বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়ালে গোল পাওয়া হয়নি ইতালির। সতীর্থের কাছ থেকে ডান প্রান্তে উঁচু করে বাড়ানো পাস পেয়ে গোলমুখে বল বাড়ান ফেদেরিকো বার্নারদেস্কি। আন্দ্রেয়া বেলোত্তি তাতে পা ছোঁয়ানোর আগেই কর্নারের বিনিময়ে বিপদমুক্ত করেন রোমেরো।

পরের মিনিটে মার্তিনেজের দক্ষতায় জাল অক্ষত থাকে আর্জেন্টিনার। নিকোলাস ওতামেন্দির ফাউলে পাওয়া ফ্রি-কিক নেন ফরোয়ার্ড রাসপাদোরি। বেলোত্তির নিচের দিকে নামতে থাকা হেড ক্রসবারের খুব কাছ থেকে লুফে নেন মার্তিনেজ।

আক্রমণের ঝাপটা সামলে ২৮তম মিনিটে গোলের সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। দি মারিয়ার পাস লিওনার্দো বোনুচ্চি প্রতিহত করার পর বল পেয়ে যান দি পল। তিনি খুঁজে নেন রেকর্ড সাতবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসিকে। তার ডান পায়ের কোণাকুণি শট ঝাঁপিয়ে লুফে নেন দোন্নারুমা।

এরপর কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বল প্রবেশ করে ইতালির জালে। বামদিক দিয়ে দ্রুতগতিতে বল নিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন মেসি। ছয় গজের বক্সের মধ্যে দারুণ ক্রস করেন তিনি। গোল হতে কেবল দরকার ছিল আলতো একটি টোকার। ফরোয়ার্ড লাউতারো সেই সহজ কাজটা করতে ভুল না করলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

৩০তম মিনিটে লাউতারো নিজেদের ডি-বক্সের সামনে বলের নিয়ন্ত্রণ হারালে ৪০ গজ দূর থেকে শট নেন নিকোলো বারেল্লা। কর্নারের বিনিময়ে তা ঠেকান দোন্নারুমা। আট মিনিট পর এমারসনের ক্রসে বেলোত্তি মাথা ছোঁয়াতে না পারলে হতাশা বাড়ে ইতালির।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনার পক্ষে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন দি মারিয়া। বোনুচ্চিকে দারুণভাবে এড়িয়ে লাউতারো রক্ষণচেরা পাস বাড়ান। ইতালির ডি-বক্সে ঢুকে আগুয়ান দোন্নারুমার উপর দিয়ে অসাধারণ দক্ষতায় চিপ করেন দি মারিয়া। বল জালে পৌঁছাতে উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা স্টেডিয়াম।

ম্যাচে ফিরতে তিন পরিবর্তন নিয়ে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করে ইতালি। এই ম্যাচ দিয়ে অবসরে যাওয়া জর্জিও কিয়েলিনি, বেলোত্তি ও বার্নারদেস্কির জায়গায় নামেন মানুয়েল লাজ্জারি, জিয়ানলুকা স্কামাক্কা ও মানুয়েল লোকাতেল্লি। কিন্তু উল্টো তাদের অসহায় করে আরও দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা।

৫৬তম মিনিটে বোনুচ্চির ব্যাক পাসে জেগেছিল ইতালির আত্মঘাতী গোল হজমের সম্ভাবনা। তবে শেষ মুহূর্তে গোললাইন থেকে বল বিপদমুক্ত করেন দোন্নারুমা। তিন মিনিট পর ডি-বক্সের বাইরে থেকে লোকাতেল্লির শট গিদো রদ্রিগেজের গায়ে লাগার পর লুফে নেন মার্তিনেজ।

৬০তম মিনিটে নিজেদের অর্ধ থেকে উঁচু করে বল বাড়ান নিকোলাস ওতামেন্দি। তা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে দি মারিয়ার শট কর্নারের বিনিময়ে বাঁচান দোন্নারুমা। পরের গল্পটা আর্জেন্টিনা ও তাদের অধিনায়ক মেসির একচ্ছত্র প্রাধান্যের। দোন্নারুমা দৃঢ়তা না দেখালে ইতালির হারের ব্যবধান হতে পারত অনেক বড়।

এক মিনিটের ব্যবধানে মেসির বুদ্ধিদীপ্ত কর্নারে দি মারিয়ার দূরপাল্লার জোরালো ভলি দোন্নারুমার দিকে সরাসরি যাওয়ায় গোল পায়নি আর্জেন্টিনা। ৬৪তম মিনিটে ছয় গজের বক্সের ভেতরে মেসির ক্রসে লাউতারো অল্পের জন্য পা ছোঁয়াতে পারেননি। তার পেছনে থাকা জিওভান্নি লো সেলসোর শট অল্পের জন্য হয় লক্ষ্যভ্রষ্ট।

৬৫তম মিনিটে নিজেদের অর্ধ থেকে মেসি একাই আক্রমণে উঠে ডি-বক্সে ঢুকে শট নেন। তা কোনোমতে ঠেকিয়ে দেন দোন্নারুমা। চার মিনিট পর বাঁকানো শট ফিরিয়ে ফের মেসিকে হতাশ করেন তিনি। ৮৩তম মিনিটে মেসির আরেকটি প্রচেষ্টা প্রতিহত হয় ইতালির ডি-বক্সে।

আর্জেন্টিনা অবশেষে তৃতীয় গোলের দেখা পায় দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে। গোলের খোঁজে থাকা মেসি ডি-বক্সের প্রান্তে গিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের চাপে বল হারিয়ে ফেলেন। তবে সৌভাগ্যবশত সেখানেই অবস্থান করছিলেন তিন মিনিট আগে বদলি নামা ফরোয়ার্ড দিবালা। নিচু শটে নিশানা ভেদ করে ইতালির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন তিনি।

সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার
এম এস, ০২ জুন

Back to top button