ব্যবসা

আমদানিকারকদের বাড়তি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে

জিয়াদুল ইসলাম

ঢাকা, ০১ জুন – বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দামে আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রি করতে চাইছে না ব্যাংকগুলো। সংকটের দোহাই দিয়ে আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতে আগের মতোই বেশি রেট দাবি করা হচ্ছে। যারা বেশি রেট দিতে রাজি হচ্ছেন না, তাদের নিজ উদ্যোগে ডলার সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া নতুন এলসি খোলা থেকেও বিরত রয়েছে অনেক ব্যাংক। এতে বিপাকে পড়ছেন আমদানিকারক-ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে বাজার থেকে বেশি দামে ডলার সংগ্রহের দোহাই দিয়ে এলসি নিষ্পত্তিতে বাড়তি রেট আদায় করছে। অন্যদিকে ব্যাংকাররা বলছেন, ডলারের দাম যে পর্যায়ে উঠেছিল, সেখান থেকে অনেক কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই রেটে এলসি নিষ্পত্তি করা অনেক ব্যাংকের পক্ষেই কঠিন। কারণ তাদের এখনো ডলার কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা কাটাতে গত রবিবার ডলারের একক দাম বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোমবার থেকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ দাম হবে ৮৯ টাকা। এর মাধ্যমে আরেক দফা কমানো হয় টাকার মান, প্রায় ১ টাকা ১০ পয়সা। প্রবাসী আয় আহরণ ও রপ্তানিকারকদের বিল নগদায়নের ক্ষেত্রে এ হার অনুসরণ করবে ব্যাংকগুলো। আর আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রির দাম নির্ধারণ করা হয় ৮৯ টাকা ১৫ পয়সা। বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) প্রস্তাব পর্যালোচনা করে এ রেট নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গত দুদিনে এই রেটে এলসি নিষ্পত্তি করতে পারেননি অনেক আমদানিকারক, বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত ছোটরা। এ ছাড়া নতুন এলসি খুলতেও বেশি রেট দাবি করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, আমাদের কাছেও কিছু কিছু আমদানিকারক অভিযোগ করেছেন যে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত রেটে ডলার পাননি। আবার কেউ কেউ নির্ধারিত রেটে ডলার পেয়েছেন এমনটিও জানিয়েছেন। তবে অভিন্ন হার সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হয়েছে কি-হয়নি, তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, আমি যতদূর জানি, খুচরা বা কার্ব মার্কেটেও অভিন্ন হার অনুসরণ করা হচ্ছে না। এখনো কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলারের জন্য ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে প্রায় ৯৬-৯৭ টাকা। তার মতে, অভিন্ন হার মানি চেঞ্জার না মানলে ব্যাংকগুলোয় ডলারের সংকট তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাজারে অস্থিরতা রোধে ডলারের দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এটা বাফেদা ও এবিবির প্রস্তাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এরপরও যদি কোনো ব্যাংক আমদানিকারকদের কাছে বেশি রেট আদায় করে এবং তা বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে প্রমাণিত হয়, তা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনে নিয়োজিত অথরাইজড ডিলার শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, সব ব্যাংকের প্রবাসী আয় আহরণের নেটওয়ার্ক সমান নয়। যাদের নেটওয়ার্ক ভালো তাদের রেমিট্যান্স আহরণের পরিমাণও বেশি। যাদের নেটওয়ার্ক কম, তাদের বেশি রেট দিয়ে প্রবাসী আয় আনতে হয়। আবার এক ব্যাংকের রপ্তানি আয় অন্য ব্যাংকে নগদায়নের সুযোগও এখন বন্ধ। ফলে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর সংকট আরও বেড়েছে। ফলে বাজার থেকে বেশি দামে নগদ ডলার কিনে এলসি নিষ্পত্তি করতে হচ্ছে।

বিভিন্ন ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা মুদ্রার বিনিময় হারের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া ৮৯ টাকা দরে নিজেদের মধ্যে ডলার কেনাবেচা করেছে ব্যাংকগুলো। আমদানিকারকদের কাছে বিক্রির রেট নির্ধারণ করা ৮৯ টাকা ১৫ পয়সাই দিয়ে রেখেছে। কিন্তু খুচরা পর্যায় নগদ ডলার আগের মতোই ৯৯ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছে। গতকাল ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক নগদ ডলার বিক্রি করেছে ৯৯ টাকায়। বিদেশি খাতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া বিক্রি করেছে সাড়ে ৯৯ টাকা।

দ্য সিটি ব্যাংক নগদ ডলার বিক্রি করেছে ৯৬ টাকায়। ৯৮ টাকা বিক্রি করে এইচএসবিসি। ৯৭ টাকা ৪০ পয়সায় বিক্রি করে ট্রাস্ট ব্যাংক। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও ইউসিবি ব্যাংক বিক্রি করেছে ৯৭ টাকায়। ব্র্যাক ব্যাংক বিক্রি করেছে ৯৬ টাকা ৯০ পয়সায়। অন্য ব্যাংকগুলো ৯৩ থেকে ৯৬ টাকার মধ্যে বিক্রি করেছে।

এ বিষয়ে এবিবির চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম আরএফ হোসেন বলেন, কোনো ব্যাংক বেশি রেট নিয়েছে, আর কোনো ব্যাংক নেয়নি আমার পক্ষে তা বলা মুশকিল। তবে আমার মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলারের যে অভিন্ন হার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, সেটি সব ব্যাংকে পুরোপুরি কার্যকর হতে একটু সময় লাগবে, অন্তত চার থেকে পাঁচ দিন।

বেশ কিছুদিন ধরেই অনেক ব্যাংক প্রবাসী ও রপ্তানিকারকদের থেকে ৯৫ টাকা পর্যন্ত দরে ডলার কিনেছে। আমদানিকারকদের কাছে তা বিক্রি করেছে ৯৬ থেকে ৯৮ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া খোলাবাজারে ডলারের দাম উঠে যায় ১০২ টাকা। কিছু কিছু ব্যাংকেও নগদ ডলারের দাম ১০০ টাকার ওপরে উঠে যায়। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হঠাৎ করে এমন অস্থিরতার জন্য অনেকেই বৈদেশিক মানি এক্সচেঞ্জ ও ব্যাংকগুলোর অতি মুনাফা করার প্রবণতাকে দায়ী করে আসছেন। এটা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি খাতের ১২টি ব্যাংকের ডলার কেনাবেচা ও মজুদের তথ্য খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অভিযোগ উঠেছে এসব ব্যাংক বেশি দামে প্রবাসী আয় এনে বাজারে ডলারের দাম বাড়িয়েছে। আবার কৌশলে সীমার বেশি ডলার মজুদ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ভুল তথ্য দিয়েছে।

এদিকে, গতকাল খোলাবাজারে নতুন করে ডলারের দাম বাড়েনি বলে জানিয়েছেন মানি চেঞ্জার ব্যবসায়ীরা। এদিন খোলাবাজারে প্রতি ডলার ৯৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৯৭ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে লেনদেন হয়েছে।

সূত্র : আমাদের সময়
এম এস, ০১ জুন

Back to top button