জাতীয়

কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শী পরিকল্পনায় ভুগছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

শামীম রাহমান

ঢাকা, ৩০ মে – বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫০ শতাংশই রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। দেশের প্রধান এ দুই নগরীকে যুক্ত করেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ এ মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৬-১৭ মেয়াদে দুই থেকে চার লেনে উন্নীত করা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। খরচ হয় ৩ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। তবে চালুর মাত্র পাঁচ বছরেই দেখা দিয়েছে সড়কটি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে মহাসড়কটি ‘এক্সপ্রেসওয়ে’ মানে তৈরির সুযোগ ছিল, যা বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতার কারণে হয়নি। এখন বাড়তি টাকা খরচ তো হবেই, যথাযথ মানে তা সম্প্রসারণও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

তবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কর্মকর্তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক নির্মাণে নিজেদের অদূরদর্শী বলতে নারাজ। এর দায় চাপাচ্ছেন তারা দেশের দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির ওপর। সওজ কর্মকর্তারা বলছেন, যখন ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক তৈরি হয়, তখন সেই সময়ের উপযোগী করেই করা হয়। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেক দ্রুত বাড়ছে। ফলে মহাসড়কটির সক্ষমতা কমেছে।

২০১১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চালু হয় ২০১৭ সালে। বর্তমানে মহাসড়কটিতে দুটি প্রকল্প চলমান আছে। ৭৯৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ ও ৫৬৯ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন পয়েন্টে আন্ডারপাস ও ইউলুপ তৈরি করা হচ্ছে। অন্যদিকে সম্প্রসারণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশাসহ অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে পরামর্শক নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সওজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাসড়কটির দুই পাশে স্থানীয় ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস লেন তৈরি করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান চার লেন সম্প্রসারণের প্রয়োজন হবে কিনা, তাও যাচাই করা হবে। মহাসড়কটি সম্প্রসারণে কত টাকা খরচ হবে, তা জানা যাবে সমীক্ষার পর।

ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরের অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরে দেশের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দেশের অর্থনীতির প্রয়োজনে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া উচিত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেনে তৈরি করাকে অদূরদর্শী পরিকল্পনার ফল হিসেবে অভিহিত করছেন তারা।

বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, মহাসড়কটি একবারেই ছয় বা আট লেনে তৈরি করা সম্ভব ছিল। দুঃখজনক হলো, এটা আমরা করতে পারিনি। এখন আবার সড়কটি সম্প্রসারণ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ একটি সড়ক তৈরির জন্য দুবার আয়োজন করতে হচ্ছে। খরচ তো দ্বিগুণ হচ্ছেই, সম্প্রসারণকাজেও আরেক দফা সড়ক ব্যবহারকারীরা ভোগান্তিতে পড়তে যাচ্ছে। এ জনভোগান্তিকেও এক ধরনের আর্থিক ক্ষতি।

সওজ কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের পরিকল্পনা ছিল প্রথমে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক তৈরি করা হবে। এরপর একই করিডোরে একটি এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করা হবে। কিন্তু এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনাটি আপাতত স্থগিত থাকার কারণে চার লেনের সড়ক বিদ্যমান যানবাহনের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়টি হয়ে গেলে চার লেনের সড়কটি আর সম্প্রসারণের প্রয়োজন হতো না।

তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলছেন, শুরুতেই মহাসড়কটি এক্সপ্রেসওয়ে মানে তৈরি করার সুযোগ ছিল। এজন্য দুই পাশে সার্ভিস লেন ও যানজটপ্রবণ মোড় বা হাটবাজার এলাকাগুলোয় ফ্লাইওভার, ইন্টারচেঞ্জের মতো অবকাঠামো তৈরি করলেই হতো। খরচও খুব বেশি হতো না। এখন কিন্তু চাইলেই মহাসড়কটি যথাযথ মানে উন্নীত করা যাবে না। কেননা সড়কের দুই পাশে প্রচুর অবকাঠামো তৈরি হয়ে গেছে, যেগুলো উচ্ছেদ করে সড়ক সম্প্রসারণকাজ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও সরকারের অদূরদর্শী এবং অপেশাদারি সিদ্ধান্তের কারণে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করিডোরটি অচলাবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের কাজ সময়ে না করায় বাড়তি টাকা তো খরচ হচ্ছেই, আবার কাজ করার সুযোগও কমে এসেছে। এখন চাইলেই কিন্তু আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে আন্তর্জাতিক মানের একটি মহাসড়ক তৈরি করতে পারব না।

অন্যদিকে সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই মহাসড়কটি যথাযথ মানে উন্নীত করা জরুরি বলে মনে করছেন পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি ও ওয়েল ডিজাইনার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারের যে ভিশন ছিল তা সময় উপযোগী। তবে ভিশনের সঙ্গে কার্যক্রমের মিল ছিল না। চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের একমাত্র বন্দর, সেটা আমাদের আমদানি ও রফতানির জন্য ব্যবহার করা হয়। চট্টগ্রামের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থাটি ছয় বা আট লেনের করা উচিত ছিল। সেটা করা হয়নি, যা প্রধানমন্ত্রীর ভিশনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে। এতে বাড়তি চাপ সামলাতে যোগাযোগের জন্য সরকারকে এখনই নজর দিতে হবে। দ্রুততার সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে গতি রেখে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।

সওজের নির্দেশিকায় মহাসড়কের ট্রাফিক গ্রোথ (যানবাহন চলাচল) অন্তত ১০ শতাংশ ধরার নির্দেশনা থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের সময় ডিজাইন ম্যানুয়েলে ট্রাফিক গ্রোথ ধরা হয়েছিল ৮ শতাংশ হারে। চালুর পরই চার লেনের মহাসড়কটিতে গাড়ির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশেরও বেশি। ফলে যানবাহনের চাপে এরই মধ্যে ভঙ্গুর দশায় সড়কটি। নকশা প্রণয়নের সময় মহাসড়কটিতে ইকুইভ্যালেন্ট সিঙ্গেল এক্সেল লোড (ইএসএএল) হিসাব করা হয়েছিল ১৩৩ মিলিয়ন। অথচ বর্তমানে তা ১৭৭ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে, যা প্রক্ষেপণের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু প্রক্ষেপণ ও নকশায় ত্রুটি নয়, মহাসড়কটি নির্মাণের বিভিন্ন ধাপেও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন বলছে, কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক। পাশাপাশি মহাসড়কটি তৈরির সময় ভবিষ্যতে চলাচল করা যানবাহনের যে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, তাও সঠিক ছিল না। ফলে চালুর এক বছর না পেরোতেই মহাসড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সক্ষমতার চেয়ে বেশি যানবাহন চলে পেভমেন্টের (পিচ) আয়ু ফুরিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা চার লেনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাকে অদূরদর্শী বললেও সওজ কর্মকর্তারা বলছেন, সড়কটি নির্মাণের পরিকল্পনা সময়োপযোগীই ছিল। বিষয়টি সম্পর্কে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী একেএম মনির হোসেন পাঠান বলেন, আমরা কখনো জাম্প করি না। দুই লেন থেকে চার লেন করি। যখন দেখি চার লেনেও কাজ করছে না, তখন আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিই। যখন ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কটি তৈরি করা হয়, তখন সেই সময়ের উপযোগী করেই সেটি তৈরি করা হয়। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি এত দ্রুত বদলে

গেছে, এটা দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় সড়ক-মহাসড়কে গাড়ির চাপ বেড়েছে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ার কারণে যে প্রজেকশন করে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক তৈরি হয়েছিল, তা আসলে কাজ করছে না। এজন্য আমরা এখন যেসব নতুন সড়ক তৈরি করছি, সেগুলোয় চার লেনের পাশাপাশি আলাদা সার্ভিস লেন রাখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সার্ভিস লেন করার উদ্যোগ নিয়েছি। এটা যত দ্রুত সম্ভব করা দরকার। আর কোনো বিকল্প নেই।

সূত্র : বণিক বার্তা
এম এস, ৩০ মে

Back to top button