জাতীয়

গান কবিতা নৃত্যে জাতীয় কবির ১২৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

ঢাকা, ২৬ মে – দ্রোহ, প্রেম ও চেতনার কবি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নিজের সৃজনশীলতায় বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনেও উন্নীত করেছেন তিনি। বুধবার ছিল বাঙালির চেতনা ও অস্তিত্বের কবি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা, কথামালা, নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটকসহ বর্ণাঢ্য আয়োজনে দিনব্যাপী কবির জন্মদিন উদযাপন করেছে গোটা জাতি।

রাষ্ট্রীয়ভাবে কবির জন্মদিনের মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে কবির স্মৃতিবিজড়িত কুমিল্লা শহরে। জন্মবার্ষিকীর এবারের প্রতিপাদ্য ‘বিদ্রোহীর শতবর্ষ’।

পুব আকাশে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির সমাধিতে ঢল নামে। এ সময় শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে কবির সমাধিকে ঢেকে দেন ভক্ত-অনুরাগী, সুহৃদ ও স্বজনরা। শ্রদ্ধা নিবেদনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, শতবর্ষ আগে রচিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা অফুরান। যুগে যুগে সমাজের সর্বক্ষেত্রে নজরুলের কবিতার তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। তাই জাতীয় কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কালজয়ী। এর আগে ভোরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমবেত হয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শোভাযাত্রা সহকারে কবির সমাধিতে গমন, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করেন।

এদিকে কবির জয়ন্তীতে শিল্পকলা একাডেমিতে ‘দামাল ছেলে নজরুল’ নাটক মঞ্চায়ন করেছে নাটকের দল জেনেসিস থিয়েটার। সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চায়ন হয় নাটকটি। এতে কবির শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের নানা সময় তুলে ধরা হয়েছে। নূর হোসেন রানার নির্দেশনায় নাটকটিতে অভিনয় করেছেন সানজিদা রোজ, ফারজানা রনি, জারা অন্তরা, ইমন খান, তিথি, ফেন্সি. নূর হোসেন রানা প্রমুখ।

কবির জন্মজয়ন্তী উদযাপনে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। সন্ধ্যায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনের এই আয়োজনে ছিল একক সংগীত, দলীয় সংগীত, দলীয় নৃত্য ও আবৃত্তি। অনুষ্ঠানে শারমীন সাথী ইসলাম পরিবেশন করেন ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়’, ‘চেয়ো না সুনয়না’, ‘আমি গগন গহনে সন্ধ্যাতারা’, ‘সৃজন ছন্দে আনন্দে’। ছন্দা চক্রবর্তী গেয়ে শোনান ‘সন্ধ্যা গোধূল লগনে/ আধো ধরণী আলো’; মো. ইয়াকুব আলী খান গেয়ে শোনান ‘বঁধু তোমার আমার এই যে বিরহ’; শেখ জসীম পরিবেশন করেন ‘আমি গানে গানে ঢাকবো আমার গভীর অভিমান’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’, ‘তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয়’। মো. মফিজুর রহমানের কণ্ঠে গীত হয় ‘খোল গো আঁখি খোল গো আঁখি’, ‘নীলাম্বরি শাড়ি পরে নীল যমুনায়’, ‘ঝর ঝর বারি ঝরে অম্বর ব্যাপিয়া’। বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী শোনান ‘সাদা মন চাহে’, ‘আমার আপনার চেয়ে’, ‘শাওন আসিল ফিরে’। শোভন মজুমদার শোনান ‘সৃজন ছন্দে আনন্দে’ গানটি। একক সংগীত পরিবেশন করেন ইয়াসমিন মুশতারী এবং ড. নাশিদ কামাল।

সরকারি সংগীত কলেজ দলীয়ভাবে গেয়ে শোনায় ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘ঝড় ঝঞ্ঝায়’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ সমবেতভাবে পরিবেশন করে ‘জাগো অমৃত পিয়াস’। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ পরিবেশন করে ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’। দলীয়ভাবে আরও সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পকলা একাডেমি শিশু সংগীত দল ও বাংলাদেশ নজরুল সংগীত শিল্পী সংস্থার শিল্পীরা। ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায়’, ‘বেল ফুল এনে দাও চাই না বকুল’, ‘আমি পূরব দেশের পুর নারী’, ‘ঘন মায়াময় স্বপনে’ গানগুলোর সঙ্গে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, শিমুল মুস্তাফা ও ঝর্ণা সরকার।

এর আগে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. হাকিম আরিফ।

জাতীয় কবির ১২৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নজরুল ইনস্টিটিউট। সন্ধ্যায় আয়োজনের উদ্বোধন করেন কবি কামাল চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাকীর হোসেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফাহিমুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন ইয়াকুব আলী খান, ড. লীনা তাপসী খান, মইনুল ইসলাম খান, রওশন আরা ইসলাম সোমা, সুমন দাস প্রমুখ। আবৃত্তি করেন শিমুল মুস্তাফা ও সাবিনা ইয়াসমিন। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন মন্দিরা চৌধুরী, মনিরুল ইসলাম ও তাঁর দল।

দুই দিনের নজরুল উৎসবের আয়োজন করে ছায়ানট। একক গান, সম্মেলক গান, নৃত্যালেখ্য ও আবৃত্তি দিয়ে সাজানো হয় এ আয়োজন।

প্রথম দিনে সংগীত পরিবেশন করেন প্রিয়াংকা গোপ, ইয়াকুব আলী খান, অনামিকা সরকার সোমা, শুক্লা সরকার, সৈয়দা সন্‌জিদা জোহরা বীথিকা, ফারহানা আক্তার শ্যার্লী, ঐশ্বর্য সমদ্দার, নুসরাত জাহান রুনা, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী, শর্মিষ্ঠা দাশ, মফিজুর রহমান, জগদানন্দ রায়, আশা সরকার, সঞ্জয় কবিরাজ, মণীষ সরকার প্রমুখ। সম্মেলক গান পরিবেশন করে ছায়ানটের ছোটদের ও বড়দের দল। আবৃত্তি করেন কৃষ্টি হেফাজ, আশরাফুল হাসান বাবু ও রফিকুল ইসলাম। নৃত্য পরিবেশন করেন শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইরা বালা, সুদেষ্ণা স্বয়ম্প্রভা ও ছায়ানটের শিক্ষার্থীরা।

জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপনে নজরুল মেলার আয়োজন করেছে চ্যানেল আই। চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী-সাহিত্যিক, নজরুল বিশেষজ্ঞ, নজরুল সংগীতশিল্পী ও চ্যানেল আইয়ের পরিচালকরা। সারাদিন গান, কবিতা, নৃত্যের ঝংকারে কবিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হয় ‘নজরুল মেলা’য়। মেলায় ছিল বইয়ের স্টল। নজরুল মেলা সরাসরি সম্প্রচার করে চ্যানেল আই। জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কাজী নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের হলরুমে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আবদুল হাই শিকদারের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম।

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘উন্নত মম শির’ শিরোনামে আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র। জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এ আয়োজনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিশিষ্ট কবি আল মুজাহিদী।

সূত্র : সমকাল
এম এস, ২৬ মে

Back to top button