জাতীয়

পুঁজিবাজারে দরপতন রোধে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা

ঢাকা, ২২ মে – পুঁজিবাজারের অব্যাহত দরপতন রোধে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনায় এবার বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি। এতে আইসিবির মাধ্যমে ব্যাংকের বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগসীমা বা এক্সপোজার লিমিটের বাইরে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহের ধারাবাাহিকতায় রোববার সপ্তাহের প্রথম দিন আরও ১১৫ পয়েন্ট পতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক এখন গত বছরের ২৯ জুনের পর সর্বনিম্ন অর্থাৎ ছয় হাজার ১৪২ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে। সেদিন ডিএসইএক্সের অবস্থান ছিল ৬ হাজার ৪২ পয়েন্ট।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য আইসিবিকে দেয়া দেড়শ কোটি টাকার যে তহবিলের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটির মেয়াদ বাড়িয়ে তহবিলের আকার দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। সোমবার থেকেই এই তহবিল থেকে বিনিয়োগ করা হবে।

টানা দরপতনের মধ্যে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহর সঙ্গে বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বৈঠকে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু দিক-নির্দেশনা দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, করোনা মহমারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি যেখানে মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারের খারাপ অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। যে করেই হোক বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

সূত্র অনুসারে, অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবির বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোনো ব্যাংকের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হয়ে থাকলে তা আলোচিত ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য না করার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ আইসিবিকে দেয়া ঋণের অর্থ যদি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে ওই ঋণের অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির পুঁজিবাজার এক্সপোজারের বাইরে রাখতে হবে।

পুঁজিবাজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে বেশ কিছু মতপার্থক্যের ইস্যু ধরেই বাজারে সংশোধন শুরু হয়। গত কয়েক বছর ধরেই পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। একটি ব্যাংক কত টাকা বিনিয়োগ করতে পারে, তাকে বলে এক্সপোজার লিমিট। আর এ জন্য বৈঠকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।

বর্তমানে কোনো শেয়ারের ক্রয়মূল্য অথবা বাজার দর যেটি বেশি, সেটি এক্সপোজার লিমিট হিসেবে গণ্য হয়। তবে বিএসইসি চাইছে এটি শেয়ারের ক্রয়মূল্যে নির্ধারণ হোক।

আবার কোনো ব্যাংক নিজে যে বিনিয়োগ করে, সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য যে টাকা দেয়, আইসিবিকে যে ঋণ দেয়, সবই এক্সপোজার লিমিটের ভেতরে পড়ে।

এছাড়া ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য আইসিবিকে দেয়া ১৫৩ কোটি টাকার যে তহবিলের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটির মেয়াদ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তহবিলের আকারও বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হবে।

প্রসঙ্গত, ১৫ ফ্রেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ব্যাপারে একটি সার্কুলার জারি করে। এর পর থেকেই দেশের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছিলো, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ধারণকৃত পুঁজিবাজারের সকল প্রকার শেয়ার, ডিবেঞ্চার, কর্পোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট এবং অন্যান্য নিদর্শনপত্রের বাজারমূল্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা জারির পর ২২ মে পর্যন্ত দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ৯০১ দশমিক ০১ পয়েন্ট।

শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সার্কুলারই নয়, বাজারের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে ২৪ ফ্রেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা এবং সম্প্রতি শ্রীলংকার চরম অর্থনৈতিক সংকট, দেশের বাজারে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি এবং আমদানি বৃদ্ধি বাজারকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

দরপতন প্রতিরোধে ইতোমধ্যে বিএসইসির গৃহীত পদক্ষেপ

দুই শতাংশ সার্কিট ব্রেকার আরোপ এবং সংশোধন

অব্যাহত দরপতন রোধে ৮ মার্চ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন সার্কিট ব্রেকারের নির্দেশনা দেয়। ওই নির্দেশনায় বলা হয় এখন থেকে কোনো কোম্পানির শেয়ার দর সর্বোচ্চ দুই শতাংশ কমতে পারবে; কিন্ত শেয়ার দর বাড়ার ক্ষেত্রে আগের নিয়ম অর্থাৎ ১০ শতাংশ বহাল থাকবে।

কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পরেও বাজারে পতন অব্যাহত থাকে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেয়ার দর সর্বোচ্চ দুই শতাংশ কমতে পারার নির্দেশনা থেকে সরে এসে এই দর কমার সর্বোচ্চ সীমা পাঁচ শতাংশ করার নির্দেশনা দেয় ২০ এপ্রিল। নতুন নির্দেশনায়ও দর বাড়ার সর্বোচ্চ সীমা ১০ শতাংশ বহাল থাকে।

ব্যাংকগুলোর সাথে বিএসইসির বৈঠক

৯ মার্চ বিএসইসির সাথে ব্যাংকগুলোর বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় পুঁজিবাজারে যেসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে অথচ এখনও সেই সীমার নিচে রয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তারা ২ শতাংশ বিনিয়োগে যাবে।

দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে কিছু দিনের মধ্যে পুঁজিবাজারকে ‘সাপোর্ট’ দেয়ার জন্য গঠিত ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করবে।

বৈঠকে তৃতীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাংকগুলো মূলধন বাড়াতে বন্ডের জন্য আবেদন করলে তা দ্রুত বিএসইসি অনুমোদন দেবে। কিন্তু এই বৈঠকের পরেও পুঁজিবাজার পতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি।

মার্জিন ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি

পুঁজিবাজারের চলমান মন্দাবস্থা কাটাতে মার্জিন ঋণ সুবিধা বাড়িয়ে রোববার নুতন নির্দেশনা জারি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এবার মার্জিন ঋণ সুবিধা ১:১ বা নিজস্ব ১ টাকার বিপরীতে ১ টাকা পর্যন্ত মার্জিন ঋণ নেয়ার বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যা সোমবার থেকেই কার্যকর হবে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৪০ মূল্য-আয় অনুপাতের (পি/ই রেশিও) পর্যন্ত যেকোনো সিকিউরিটিজে ১০০% হারে মার্জিন ঋণ পাওয়া যাবে।

প্রসঙ্গত, নতুন এই নির্দেশনার আগে শেয়ারবাজারে ১:৮০ বা বিনিয়োগকারীদেরকে নিজস্ব ১ টাকার বিপরীতে ৮০ পয়সা মার্জিনের সুযোগ ছিল।

সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল
এম এস, ২২ মে

Back to top button