অন্যান্য

নিখাত জারিন: ‘মুসলমান মেয়ে শর্টস পরে প্রতিযোগিতা করেছিল বলে কত সমালোচনা হয়েছিল’

হায়দ্রাবাদ, ২০ মে – মেয়েদের জামা-কাপড় নিয়ে একশ্রেণির পুরুষ এমনকী কিছু নারীদের মাঝে নাক সিঁটকানো ভাব আছে। বাংলাদেশের নরসিংদী রেলস্টেশনে সম্প্রতি ঘটেছে এমন ঘটনা। তবে গল্পটি ভারতের তেলেঙ্গনা রাজ্যের নিখাত জারিনের। যিনি গতকাল বৃহস্পতিবার ইস্তাম্বুলে মহিলাদের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ফ্লাইওয়েট (৫২ কেজি) বিভাগের একতরফা ফাইনালে থাইল্যান্ডের জিতপং জুতামাসকে ৫-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

নিখাত জেরিন এমন একটি জায়গায় থাকতেন, যেখানে মেয়েদের ছোট জামাকাপড় পরাকে ভালো চোখে দেখা হতো না। কিন্তু বক্সিং রিংয়ে লড়তে গেলে শর্টস তো পরতে হবেই। ফলে নিখাত জারিন যখন বক্সিং শুরু করেছিলেন, তখন তাকে অনেক কটুক্তি সহ্য করতে হয়েছিল। পুরুষ-নারী কেউই তাকে কটুক্তি করতে ছাড়েনি। এবার বিশ্বসেরা হয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন জারিন। প্রমাণ করে দিয়েছেন, সমাজের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাকে পার করেও বিশ্বমঞ্চে সফল হওয়া যায়।

ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাতকারে জারিনের বাবা সাবেক ফুটবলার মোহাম্মদ জামিল বলেছেন, ‘সৌদি আরবে প্রায় ১৫ বছর সেলস বিভাগে যুক্ত থাকার পর আমি নিজামাবাদে ফিরে আসি। মেয়েদের পড়াশুনো এবং খেলাধুলোর দিকে নজর দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। জারিনের দুই বড় বোন ডাক্তার। তাই নিখাত এবং তার বোন, যে ব্যাডমিন্টন খেলে, দুজনের দিকেই নজর দিতে চেয়েছিলাম। নিখাত যখন বলেছিল সে বক্সার হতে চায়, তখন আমাদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা ছিল না। ‘

নিজে খেলোয়াড় হওয়ায় জামিল চেয়েছিলেন তার চার মেয়েই কোনো না কোনো খেলাকে বেছে নিক। কিন্তু প্রথম দুই মেয়ে ডাক্তারির দিকে মন দিয়েছিল। নিখাত প্রথমে বেছে নিয়েছিলেন অ্যাথলেটিক্স। স্প্রিন্টে রাজ্য চ্যাম্পিয়নও হয়েছেন। তবে চাচার পরামর্শে বক্সিংয়ে আসেন। মোহাম্মদ জামিল বলেন, ‘অনেক আত্মীয় এবং বন্ধুরাই বলেছিল যে বক্সিং খেলা উচিত নয়। কারণ সেখানে তাকে শর্টস পরতে হবে। কিন্তু আমরা জানতাম নিখাত যেটা চায় আমরা সেটাকেই সমর্থন করব। ‘

নিখাতের চাচা সামসামুদ্দিনের দুই ছেলেই ছিলেন বক্সার। ফলে অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য পরিবারের বাইরে অন্য কাউকে দেখার প্রয়োজন হয়নি। ১৪ বছর বয়সে জিতে নেন বিশ্ব যুব বক্সিং শিরোপা। তবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতার আগে পর্যন্ত তাকে থাকতে হয়েছে ভারতের আরেক খ্যাতিমান বক্সার মেরি কমের ছায়ায়। ২০১৬ সালে সিনিয়র পর্যায়ে খেলা শুরু করেন জারিন। জাতীয় পর্যায়ে ফ্লাইওয়েট বিভাগে জিতে নেন শিরোপা। ২০১৭ সালে একটি বছর নষ্ট হয় চোটের কারণে।

২০১৮ সালে রিংয়ে ফিরে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জয় করেন। ২০১৯ সালে এশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ এবং থাইল্যান্ড ওপেনেও পদক পান। ২০১৮ সালে কমনওয়েলথ এবং এশিয়ান গেমসে সুযোগ না পেলেও ভেঙে পড়েননি। জামিল আরও বলেছেন, ‘আমি তাকে বার বার বলতাম, কত মেয়ে তোমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে খেলতে আসছে। তোমার এটা দেখেই খুশি হওয়া উচিত। নিজের খেলায় উন্নতি করার কথাও বলতাম। ‘

টোকিয়ো অলিম্পিকে মেরির বিপক্ষে ট্রায়ালে হেরে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক বছরের মধ্যে বিশ্বসেরা হয়ে নিখাত বুঝিয়ে দিলেন, বক্সিংয়ে তিনি থাকতেই এসেছেন। কমনওয়েলথ এবং এশিয়ান গেমসের পরেই নিজের বিভাগ বদলাবেন জারিন। এরপর থেকে তিনি ৫৪ কেজি বিভাগে লড়াই করবেন। তার জন্য শারীরিক শক্তি যেমন বাড়াতে হবে, তেমনই টেকনিকেও বদল আনতে হবে। জারিনের লড়াই তাই শেষ হয়ে যায়নি। বরং নতুন করে শুরু হলো।

সূত্র: কালের কণ্ঠ
এম ইউ/২০ মে ২০২২

Back to top button