মৌলভীবাজার

বিজিবির দুই ফাঁড়ির মাঝ দিয়েই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ

এম. এ. কাইয়ুম

মৌলভীবাজার, ১৯ মে – রোহিঙ্গা আসছে সীমান্ত দিয়ে, এমন খবর আগে থেকেই ছিলো জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসই) কাছে। ব্যাপক অনুসন্ধানে কুলাউড়া উপজেলার সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গার বহর আসছে এমন তথ্য তারা পায়। গোয়েন্দা সংস্থার টিম কয়েক দফা কুলাউড়া সীমান্তে ঝাটিকা সফর দেয়। কিন্তু সফলতা আসেনি। শেষ অবধি গত ১২ মে গোয়েন্দা সংস্থার জালে ধরা পড়ে ১৮ রোহিঙ্গা। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাদের মৌলভীবাজার মডেল থানায় হস্তান্তর করেন।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে রোহিঙ্গারা জানায়, তারা কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী শিকড়িয়া গ্রাম দিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। এরপর থেকেই তোলপাড় শুরু হয়েছে সর্বমহলে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে উদ্বিগ্ন হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। প্রশ্ন ওঠে কুলাউড়া সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী’র (বিজিবি) ভূমিকা নিয়ে। বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে এক পর্যায়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি অস্বীকার করেন ৪৬ বিজিবির অধিনায়ক।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ইস্যু নিয়ে বিভাগীয় আইনশৃঙ্খলা সভায়ও ব্যাপক আলোচনা হয়। হঠাৎ বাড়তি তৎপর হয়ে উঠেছে বিজিবি। নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশও। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিহত করতে সীমান্তবর্তী মুরইছড়া বাজারে প্রচারণা চালায় কুলাউড়া থানা পুলিশ। আর বিজিবির উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে দফায় দফায় করেন বৈঠক।

কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে কীভাবে রোহিঙ্গা আসে, এমন অনুসন্ধানে করতে গিয়ে পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী শিকড়িয়া গ্রাম দিয়ে গত এক বছর ধরে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা। চারটি স্পষ্ট দিয়ে অবৈধভাবে খুব সহজেই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। এ কাজে জড়িত স্থানীয় দুটি চোরাকারবারি গ্রুপ। তারা সবাই বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির নারী, শিশু, মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি দলের তালিকাভুক্ত।

এ চক্রের একাধিক সদস্য সন্ধ্যা ৬টায়, রাত ১২টায় এবং ভোর ৫টায় (বাংলাদেশ সময়) বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করায় রোহিঙ্গাদের। প্রতিজন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নিয়ে আসতে পারলে ১০-১৫ হাজার টাকা তারা পান। পরে সুবিধা বুঝে সিএনজিচালিত অটোযোগে মৌলভীবাজার বাসস্ট্যান্ড অবধি পৌঁছে দিয়ে আসে চক্রের সদস্যরা। তবে দু’এক চালান রোহিঙ্গা পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও সিংহভাগ ধরা পড়ছে না।

কুলাউড়া সীমান্তবর্তী গনকিয়া ও শিকড়িয়া গ্রামের কেউ কেউ লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেছেন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করিয়ে। একাধিক প্রাইভেটকার, মোটরবাইক, সিএনজিচালিত অটোর মালিক হয়েছেন এসব অপরাধচক্রের হোতারা।

যেভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে শিকড়িয়া সীমান্ত দিয়ে:

সীমান্ত এলাকা সন্ধ্যার পর চোরাকারবারিদের দখলে থাকে। একক আধিপত্য এদের। ইচ্ছেমতো তাণ্ডব চালায় সেখানে। সন্ধ্যা থেকেই ওঁৎ পেতে থাকে চোরাকারবারিরা। নিজস্ব একাধিক সোর্স বিজিবি ক্যাম্পের আশপাশসহ নানা স্থানে বসিয়ে রাখে চোরাকারবারি চক্রের হোতারা। অন্য ৫/১০ জনের চোরাকারবারির দল চলে যায় কাঁটাতারের পাশে।

কাঁটাতারের ওপর লম্বা শক্ত কাঠ দিয়ে, উপরে বাঁশ বেঁধে দুই পাশে মই লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের বহর বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ করানো হয়। ১. ইন্ডিয়ার পাশের বুরোর ঘর, ২. বাংলাদেশের সর্দারের বাড়ির হ্যাচারীর পার, ৩. পাগলার বাড়ি ও ৪. সেগুন টিলার পাশে- এই চারটি স্পট দিয়ে অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের জোন হিসেবে বেছে নিয়ে নিয়েছে চোরাকারবারিরা।

এই চারটি স্পটই ৪৬ বিজিবি আলীনগর বিওপি এবং মুড়ইছড়া বিওপির অধীনস্থ; বিওপি দুটি মধ্যেবর্তী স্থানে। এসব স্পষ্ট দিয়ে একই কায়দায় মাদক, গরু, কাপড় ও নাসির বিড়ি আনা হয়। বিনিময়ে টাকা ছাড়াও বংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হচ্ছে ইলিশ মাছ, হাঁস এবং নানা ধরনের মাছ ধরার জাল ও পোনাজাতীয় মাছ।

সূত্র বলছে, সীমান্তের চোরাকারবারির চক্রগুলো সুযোগ পেলেই বিজিবির ওপর তেড়ে আসে। নিরুপায় হয়ে বিজিবি কৌশলে দায়িত্ব পালন করে ক্যাম্পে ফেরে।

সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় প্রভাবশালী চোরাকারবারি শিকড়িয়া গ্রামের মৃত আনর আলীর ছেলে মো. সিদ্দিক মিয়ার নেতৃত্ব একটি গ্রুপ রয়েছে। এ গ্রুপের সদস্য হলো সিদ্দিক মিয়ার ছেলে আরজত আলী ও একই গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে মো. কালাম মিয়া। অন্য গ্রুপে রয়েছে স্থানীয় চিহ্নিত চোরাকারবারি দক্ষিণ গনকিয়া গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে শারমিন মিয়া ও মনাই, গনকিয়া গ্রামের চান্দু মিয়ার দুই ছেলে দুদু মিয়া ও তোফেল মিয়া এবং একই গ্রামের লালই মিয়ার ছেলে মুন্নি পরিবহন নামক সিএনজির মালিক সালাম।

সিদ্দিক মিয়ার নেতৃত্বাধীন গ্রুপটির বসতবাড়ি সীমান্ত ঘেঁষে। এরা এলাকার প্রভাবশালী চোরাকারবারি। এরা রাতে নানা তাণ্ডব চালায় সীমান্তে। মাদক, বিড়ি, গরু ও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নিয়ে আসার একক আধিপত্য তাদের। গত ১২ মে মৌলভীবাজার আটককৃত ১৮ জন রোহিঙ্গা এই গ্রুপের সদস্য আরজত আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে আসে। এমনটাই প্রত্যক্ষদর্শী সোর্স নিশ্চিত করে।

গত ১১ মে সন্ধ্যায় ভারতের দেবিপুরের ১৮৪২-১৮৫১ নাম্বার সীমানা পিলারের ১৮৪৮ নাম্বার পিলারের পাশ দিয়ে ১৮ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ করায় এই গ্রুপ। এর আগেও তারা রোহিঙ্গার বিশাল বিশাল বহর নিয়ে আসে দেশে। গত এক বছর ধরে এ চক্রটি সাপ্তাহে ৪/৫ বার ১৫-২০ জন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করাচ্ছে।

২০২১ সালের ১৬ জুলাই (শুক্রবার) ২১ জন রোহিঙ্গা শিকড়িয়া গ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানো হয় এই চক্রের সদস্য কালামের নেতৃত্বে। পরদিন ১৭ জুলাই ভোরে চক্রের সদস্য শিকড়িয়া গ্রামের রফি মিয়ার ছেলে ফরিদ মিয়া (বর্তমানে গনকিয়া এলাকার সিএনজি স্ট্যান্ডের পাশে বসতবাড়ি) সিএনজিতে করে মৌলভীবাজার নিয়ে শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রেখে আসার কিছুসময় পর ৭ শিশু, ৮ নারী ও ৬ জন পুরুষ রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। সেসময় রোহিঙ্গারা স্বীকার করে তারা শিকড়িয়া গ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।

অন্যদিকে আরেক সূত্র জানায়, আরেকটি গ্রুপ চিহ্নিত চোরাকারবারি দক্ষিণ গনকিয়া গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে শারমিন মিয়া ও মনাই, গনকিয়া গ্রামের চান্দু মিয়ার দুই ছেলে দুদু মিয়া ও তোফেল মিয়া এবং একই গ্রামের লালই মিয়ার ছেলে মুন্নি পরিবহন নামক সিএনজির মালিক ড্রাইভার সালাম রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সক্রিয়। ইতিমধ্যে শারমিন মিয়া প্রায় ৮ লক্ষ টাকা আয় করেছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কাজ করে।

এই চক্রটি ১. ইন্ডিয়ার পাশের বুরোর ঘর, ২. বাংলাদেশের সর্দারের বাড়ির হ্যাচারীর পার ও ৩. পাগলার বাড়ি- এ তিনটি স্পষ্ট ব্যবহার করে দেশে রোহিঙ্গা নিয়ে আসে। এ চক্রের নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় চালান আসে গত ২৯ রমজান। প্রায় ২৫ জনের মতো ছোট-বড় রোহিঙ্গা ছিলেন সে বহরে। পরে চক্রের সদস্য সালাম তার নিজস্ব মালিকানাধীন সিএনজি (মুন্নি পরিবহন) চালিয়ে মৌলভীবাজার পৌঁছে দেয়। সেখান থেকে তাদের পাঠানো হয় উখিয়া। এ চক্রটি প্রতিনিয়ত দু’টি সিএনজিযোগে যাত্রীবেশে রোহিঙ্গাদের শহর অবধি পৌঁছে দেয়। ইতিমধ্যে একটি সিএনজির ড্রাইভার প্রবাস যাওয়াতে শুধুমাত্র মুন্নি পরিবহন রোহিঙ্গা পরিবনের কাজে সক্রিয়।

সোর্স নিশ্চিত করে, ভারত থেকে টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা দেশে অনুপ্রবেশের ন্যাক্কারজনক কাজ শিকরিয়া গ্রামের সুয়ুব আলীর ছেলে চোরাকারবারি মুজিবুর রহমানের হাত দিয়ে শুরু হয়। এ কাজে যুক্ত পৃথিমপাশা ইউনিয়নের করইগ্রামের সিরাজের ছেলে হান্নান ও শিকড়িয়ার গ্রামের কালাম, আরজদ ও সিএনজি ড্রাইভার ফরিদ। প্রবাস থেকে দেশে ফিরে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু করে আলীনগর গ্রামের রাইছ মিয়ার ছেলে চিহ্নিত চোরাকারবারি আক্তার।

কী করছে/ভাবছে সংশ্লিষ্টরা:

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তৎপরতা চোখে পড়েছে সীমান্ত এলাকায়। সীমান্তে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। রোববার (১৫ মে) দ্বিতীয় দফা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে সভা করেছে বিজিবি। পুলিশও নজরদারি বাড়িয়েছে। শিগগিরই সীমান্ত এলাকায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সচেতনতামূলক সভা হবে বলেও জানা গেছে।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী ও অফিসার ইনচার্জ বিনয় ভূষণ বলেছেন, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনাতামূলক সভা করবো সীমান্ত এলাকায়।

৪৬ বিজিবি শ্রীমঙ্গলের সহকারী পরিচালক মাহফুজ মুঠোফোনে বলেন, আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে সচেতনাতামূলক সভা করেছি। চোরাকারবারিরা যেন অন্ধকার পথ ছেড়ে ভালোর পথে আসে।

অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আপাতত চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা নেই। আর আমরা আমাদের ডিউটি করছি। স্থানীয় কিছু সাধারণ মানুষ আমাদের সহযোগীতার জন্য এগিয়ে এসেছে। এর বাইরে কিছু না।

জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান মুঠোফোনে বলেন, আলোচনায় কুলাউড়ার সীমান্তের কথা বারবার শোনাযাচ্ছে। রোহিঙ্গারা নাকি এই পথ দিয়ে আসছে। আমরা এ বিষয়টিকে ছোট করে দেখছি না। বিভাগীয় আইনশৃঙ্খলা সভায় ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। আমরা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে পুলিশ, বিজিবি সাথে নিয়ে কুলাউড়া সীমান্তে সাধারণ মানুষের সাথে সচেতনতারমূলক সভা করবো খুব দ্রুত।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, দুর্ভাগ্যবশত অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসছে। আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এরা ২০১২ সালে ভারতে গিয়েছিল এবং সে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ছিল। ভারতের সাথে আলোচনা হয়েছে। ভারতকে আমরা জানিয়েছি, সীমান্তে ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে।

সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল
এম ইউ/১৯ মে ২০২২

Back to top button