জাতীয়

পিকে হালদার কি স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছেন?

হাছান আদনান

ঢাকা, ১৭ মে – দেশান্তরী হওয়ার পর থেকেই দেশে ফেরার চেষ্টায় ছিলেন পিকে হালদার। এজন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন তিনি। কোনো দিক থেকেই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে আদালতের জিম্মায় ও তত্ত্বাবধানে দেশে ফেরার আরজি জানিয়েছিলেন। যদিও পরে দেশে না ফিরে ভারত, সিঙ্গাপুর, দুবাই, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি।

১৪ মে ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন পিকে হালদার। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোকনগরের নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। দেশের আর্থিক খাতের আলোচিত এ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে ভারতীয় সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তার গ্রেফতারের পর থেকেই নানা ধরনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এমনকি তিনি ফেরারি হতে চেয়েছিলেন, নাকি স্বেচ্ছায় ভারতীয় সংস্থার হাতে ধরা দিয়েছেন, সে বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তার পরিবার ও ভারতীয় একাধিক সূত্রের দাবি, পিকে হালদার ভারতীয় গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছেন। এজন্য এক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন তিনি। গ্রেফতারের পর নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন পিকে হালদার। এজন্য তিনি বাংলাদেশের চেয়ে ভারতীয় সংস্থাকেই বেশি নিরাপদ মনে করেছেন।

পিকে হালদারের পরিবারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছে, দেশে তার এর চেয়েও বেশি পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। স্থাবর-অস্থাবর এসব সম্পদ বিক্রি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়দেনা পরিশোধ করে দেয়ার কথা একাধিকবার পরিবারের সদস্যদের বলেছেন তিনি। পিকে হালদার বলতেন, নামে- বেনামে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নেয়া সব অর্থের সুবিধাভোগী তিনি একা নন। বরং বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ ও তদবিরে ওইসব ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ঋণ অনুমোদনের নথিতে সেসব গোষ্ঠীর নাম লেখাও রয়েছে।

নামে-বেনামে শেয়ার কিনে দেশের চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়েছিলেন প্রশান্ত কুমার হালদার। আর্থিক খাতে পিকে হালদার নামে বেশি পরিচিত তিনি। দখলকৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের ঘটনায় পিকে হালদারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল দুদক। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান পিকে হালদার।

গ্রেফতারের পর থেকে ভারতের ইডির হেফাজতে রয়েছেন পিকে হালদার। গতকাল মেডিকেল চেকআপ শেষে ইডি কার্যালয়ে প্রবেশের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন তিনি। ওই সময় পিকে হালদার বলেছেন, আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যে। আমি দেশে ফিরতে চাই।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পিকে হালদারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে দুদক। সে মামলায় ২৭৫ কোটি টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। একই মামলায় ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা পাচারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়।

এর পর থেকে আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এখন পর্যন্ত পিকে হালদার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে একটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তিনটি মামলার অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কমিশন অনুমোদন দিলে দ্রুত এসব অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হবে।

পিকে হালদারের নেতৃত্বে লুট হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল)। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিতরণ করা সিংহভাগ ঋণের সুবিধাভোগী পিকে হালদার নিজেই। গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্গঠন করা হয়েছিল। পিকে হালদারের পালিয়ে যাওয়া ও অর্থ লুণ্ঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ২০২০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে একটি আবেদন করে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। ওই আবেদনে অর্থ উদ্ধারের জন্য আদালতের জিম্মায় ও তত্ত্বাবধানে পিকে হালদারকে দেশে ফেরার সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পিকে হালদারের লিখিত আবেদনের ভিত্তিতেই উচ্চ আদালতে এ আরজি জানিয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। যদিও শেষ পর্যন্ত পিকে হালদার দেশে ফেরেননি।

দেশ ছাড়ার পরও দেশের বড় ব্যবসায়ীদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল পিকে হালদারের। মাঝেমধ্যেই নিজ নম্বর গোপন রেখে ব্যবসায়ীদের ফোন করতেন তিনি। এ রকমই দুজন ব্যবসায়ী নিজেদের নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেছেন, পিকে হালদার বলতেন তিনি পরিস্থিতির শিকার। তাকে ব্যবহার করে দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যবসায়ী লাভবান হয়েছেন। কিন্তু বিপদের সময়ে সুবিধাভোগীদের কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না। জীবন সংশয় না থাকলে তিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশে ফিরতেন। কিন্তু প্রভাবশালীদের অনেকেই তাকে দেশে ফিরতে দিতে চান না।

এর আগে সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত অনেকেই ভারতে পালানোর পর সেখানে গ্রেফতার হয়েছেন। এবারই প্রথম দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির জন্মদাতা কোনো ব্যক্তি ভারতে পালিয়ে গ্রেফতার হলেন। পিকে হালদার গ্রেফতারের সংবাদে দেশের ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ীরাও একে অন্যের কাছে এ গ্রেফতারের রহস্য জানতে চান। কিন্তু কেউই পিকে হালদারের হঠাৎ গ্রেফতার হওয়ার যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তবে পিকে হালদারের গ্রেফতারের সংবাদে দেশের আর্থিক খাতের লুটেরাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানা গিয়েছে।

পিকে হালদারের অনিয়ম-দুর্নীতির অনুসন্ধান করে দুদকের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছিল বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটির প্রধান কর্মকর্তা মো. মাসুদ বিশ্বাস বলেন, পিকে হালদারের অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে সবার আগে বিএফআইইউ তদন্ত করেছে। আমাদের তদন্তে যেসব অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো প্রতিবেদন আকারে দুদকের কাছে পাঠানো হয়। ভারতে পালিয়ে গিয়েও পিকে হালদারের গ্রেফতার হওয়াটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য ভালো সংবাদ। এর মাধ্যমে দুর্বৃত্তদের কাছে একটি বার্তা যাবে। দেশ থেকে অর্থ পাচার প্রতিরোধ থেকে শুরু করে আর্থিক খাতের জালজালিয়াতি প্রতিরোধে বিএফআইইউ সজাগ রয়েছে।

সূত্র : বণিক বার্তা
এন এ/ ১৭ মে

Back to top button