জাতীয়

অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারে নারীদের ব্যবহার করেছেন পিকে হালদার

ঢাকা, ১৬ মে – দেশের আর্থিক খাতের আলোচিত নাম প্রশান্ত কুমার হালদার, যিনি পিকে হালদার নামেই এখন পরিচিত। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুট করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ অর্থ আত্মসাতে তিনি ব্যবহার করেছেন নারীদের। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও তদন্ত বলছে, একাধিক নারীকে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা দিয়েছেন পিকে হালদার, যার পরিমাণ ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ঋণ সুবিধার পাশাপাশি উপহার হিসেবে দিয়েছেন বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।

পিকে হালদারের কাছ থেকে মূল্যবান উপহার পাওয়া নারীদের তালিকায় রয়েছেন নাহিদা রুনাই ও অবন্তিকা বড়াল। এর মধ্যে নাহিদা রুনাইকে দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্সের শেয়ার কিনে উপহার দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ৮০০ কোটি টাকা খরচ করে পিপলস লিজিংয়ের শেয়ার কিনে উপহার দিয়েছেন অবন্তিকা বড়ালকে। পাশাপাশি অবন্তিকার মাধ্যমে পিপলস লিজিংয়ের ৩ হাজার কোটি টাকা পাচারও করেছেন বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে।

সূত্র বলছে, বিভিন্ন সময়ে পিকে হালদারের ভ্রমণসঙ্গী হয়ে দেশের বাইরে গিয়েছেন দুই নারী। এ বিদেশ ভ্রমণের সংখ্যা ৬০ বারের বেশি। এর মধ্যে কেবল নাহিদা রুনাইকে সঙ্গে নিয়েই ২২ বার ভারত গিয়েছেন তিনি। নাহিদাকে বিভিন্ন সময় ২০ কোটি টাকা দিয়েছেন বলেও দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে উঠে এসেছে।

পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া নাহিদা রুনাই ২০০৮ সালের আগস্টে আইআইডিএফসি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের চট্টগ্রাম শাখায় অফিসার হিসেবে যোগ দেন। তখন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন আসাদুজ্জামান খান এবং ডিএমডি ছিলেন পিকে হালদার। সেখানে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চাকরি করেন নাহিদা। এরপর সে মাসেই রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের লোন ডিভিশনে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি সরাসরি পিকে হালদারের অধীনে কাজ করতে থাকেন। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে নাহিদা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের বিজনেস হেড হিসেবে যোগ দেন। পরের বছর সেখানেই মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন। একই সঙ্গে শেয়ার ডিভিশনের দায়িত্বও ছিল তার হাতে।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো নাহিদা রুনাইয়ের কথামতো। পরবর্তী সময়ে তদন্তে উঠে আসে যে পিকে হালদারের নির্দেশে বিভিন্ন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন প্রতিবেদন ছাড়াই ঋণ অনুমোদনে সহায়তা করতেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রে কোনো মর্টগেজ না নিয়ে ব্যাংকিং নীতিমালার বাইরে গিয়ে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের কাজেও দিতেন সহাযোগিতা। এ ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে যোগ দেয়ার পরই পিকে হালদারের সঙ্গে একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণে যান নাহিদা রুনাই।

পিকে হালদারের আরেক ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন অবন্তিকা বড়াল। দুদকের তদন্তে দেখা গিয়েছে, রাজধানীর ধানমন্ডি-১০-এর সাতমসজিদ রোডের ৩৯ নম্বর বাড়ির একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট পিকে হালদারই অবন্তিকাকে কিনে দেন। পিকে হালদার ও অবন্তিকা দুজনের বাড়িই পিরোজপুরে। মূলত এলাকার মেয়ে হিসেবে ২০১০ সালে পিকে হালদারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ২০১৪ সালে তিনি পিপলস লিজিংয়ে যোগ দেন। একপর্যায়ে পিপলস লিজিং পরিচালিত হতে শুরু করে অবন্তিকার নির্দেশনা অনুযায়ী।

এর বাইরে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একাধিক নারীকে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন পিকে হালদার। তার আইনজীবী হিসেবে পরিচিত সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধার সঙ্গেও পিকে হালদারের সখ্য ছিল। কাগুজে প্রতিষ্ঠান উইন্টেল ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক হিসেবে অনিন্দিতাকে দেয়া হয়েছে ঋণসুবিধা। প্রতিষ্ঠানটির নামে দুই মেয়াদে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ৬৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়, যা পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া এফএএস নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়, সেটিও ছিল ভুয়া। দুদকের অনুসন্ধান বলছে, পিকে হালদার অনিন্দিতা মৃধাকে উত্তরায় ৪০ কোটি টাকার নয়তলা বাণিজ্যিক ভবন উপহার দিয়েছেন।

ভাইয়ের স্ত্রী সুস্মিতা সাহাকে ১০০ কোটি টাকার বেনামি ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন পিকে হালদার। তার কাছের লোক হিসেবে পরিচিত নেচার এন্টারপ্রাইজ নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী পাপিয়া ব্যানার্জিকে দিয়েছেন ৩০০ কোটি টাকার ঋণ। আরেক কাগুজে প্রতিষ্ঠান এমটিবি মেরিন লিমিটেডের মালিক হিসেবে পরিচিত মমতাজ বেগমও ছিলেন পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ। তিনিও ঋণ পেয়েছেন ৩০০ কোটি টাকা। পিকে হালদারের বন্ধুর স্ত্রী ওকায়ামা লিমিটেডের পরিচালক শুভ্রা রানী ঘোষও ছিলেন কাছের মানুষদের একজন। সেই সুবাদে বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ১০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণসুবিধা নিয়েছেন শুভ্রা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে নেয়া এসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা একেবারেই অনিশ্চিত।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পিকে হালদারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করে দুদক। সেই মামলায় ২৭৫ কোটি টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। একই মামলায় ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা পাচারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়।

এর পর থেকে আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এখন পর্যন্ত পিকে হালদার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে একটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তিনটি মামলার অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কমিশন অনুমোদন দিলে দ্রুত এসব অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হবে।

তবে কেবল পিকে হালদারের বিরুদ্ধেই নয়, তার কাছ থেকে অবৈধভাবে সুবিধা নিয়েছেন এমন সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নারী কিংবা পুরুষ আলাদা হিসেবে নয়, সবাই আইনের চোখে সমান। কেউ যদি পিকে হালদারের মাধ্যমে কোনো অবৈধ সুবিধা নেয় তাহলে তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে আমি মনে করি, প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়বে। কারণ মূল অভিযুক্ত এবং তার সহযোগীদের ভারতে আটক করা হয়েছে। এখন বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যাশা হলো যত দ্রুত সম্ভব তাকে দেশে নিয়ে আসা। ফেরত আনার ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। দুই দেশের সব প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ করে তাকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, দুদক ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়—চারটি সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়েরও একটা ভূমিকা প্রয়োজন হবে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরো বলেন, সাধারণত যেকোনো দেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন থাকে। পিকে হালদার ভারতে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্পদের মালিকানা লাভ করেছেন, সেগুলো ভোগ করছেন। এছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে সে দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র তৈরি করেছেন। এসব কাজ স্পষ্টতই আইনের লঙ্ঘন। তাই এখন ভারত কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেয় তার ওপর নির্ভর করছে পিকে হালদারকে কত দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়টি।

পিকে হালদারের অর্থ পাচারের একাধিক অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করছেন দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের আরো নতুন নতুন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। শিগগিরই পিকে হালদার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আরো এক ডজন মামলা করা হবে। সেসবের জন্য এখন প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

পিকে হালদারের অর্থ আত্মসাতের সংশ্লিষ্টতায় এখন পর্যন্ত ৮৩ ব্যক্তির প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের মাধ্যমে ফ্রিজ করেছে দুদক। প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ অন্যান্য স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তিন ধাপে এখন পর্যন্ত ৬৪ জনকে আসামি ও অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। ১৩ জনকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ১১ জন আদালতে দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে শনিবার ভারতে আত্মগোপনে থাকা পিকে হালদারকে গ্রেফতার করে দেশটির অর্থসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। সেখানে তিনি ও তার সহযোগীরা নামে-বেনামে যেসব সম্পত্তির মালিকানা নিয়েছেন সেগুলোও খুঁজে বের করা হচ্ছে। আলোচিত পিকে হালদারকে গ্রেফতারের খবর প্রকাশ হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যত দ্রুত সম্ভব তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

পিকে হালদারকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহও বলেন, প্রশান্ত কুমার হালদারকে আইনের মুখোমুখি করতে যত দ্রুত সম্ভব ফেরত আনার চেষ্টা করা হবে। এক্ষেত্রে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করা হবে না। দুই দেশের মধ্যকার বহিঃসমর্পণ চুক্তির আওতায় অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে ফেরত আনার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সূত্র : বণিক বার্তা
এন এ/ ১৬ মে

Back to top button