ইসলাম

রমজানেই দিন সাদকাতুল ফিতর

ঈদের দিন ধনীর আনন্দ-বিনোদন ও খুশীর সঙ্গে গরিব-অসহায় মানুষের হাসি-খুশীর অনুসঙ্গ ফিতরা। ঈদের আগেই এ ফিতরা আদায় করতে হয়। ফিতরার সামগ্রী বা অর্থ দিয়ে গরিব-অসহায় মানুষ আনন্দ-বিনোদনে মেতে ওঠে। খুশী মনে ঈদগাহে যায়। রমজানের শেষ দিকে ঈদের আগের বিশেষ আর্থিক ইবাদতও এটি। এ আর্থিক ইবাদতকে সাদকাতুল ফিতর আবার জাকাতুল ফিতরও বলা হয়।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন এবং প্রত্যেক স্বাধীন ও গোলাম এবং নারী-পুরুষের জন্য এক সা’ খেজুর কিংবা যদ দান করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (বুখারি)

হাদিসের এ ‘ফরজ’ নির্দেশনাকে অধিকাংশ ইসলামিক স্কলারগণ ফরজ কিংবা ওয়াজিববলেছেন। আবার কেউ কেউ ফরজ দ্বারা ‘নির্ধারণ’ সাব্যস্ত করেছেন। কেউ কেউ আবার সাদকাতুল ফিতর বা জাকাতুল ফিতরকে সুন্নাতে মোয়াক্কাদাহ বলেছেন।

রমজানেই দিন ফিতরা

রমজান মাসের রোজা পালনে যে ত্রুটি-বিচু্যতিগুলো হয়েছে; তা থেকে মুক্ত হতেই ফিতরা আদায় করা জরুরি। ঈদের নামাজ পড়ার আগেই ফিতরা আদায় করার নির্দেশনা রয়েছে। রমজানে কিংবা ঈদের আগে সাদকাতুল ফিতর বা জাকাতুল ফিতর আদায় করার মাধ্যমে যেমন অধিক সওয়াব ও মর্যাদা পাবেন আবার নিজেদের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে তাকে বিশুদ্ধ ও পবিত্র করে।

ঈদের আগে ফিতরা দেবেন কেন?

রোজাদার এ ফিতরা দেওয়ার মাধ্যমে রোজাকে পবিত্র করে। রমজানের বিশেষ সওয়াব বৃদ্ধির কাজ করে থাকেন। শরীরের ময়লা দূর করার জন্য যেমন পানি দিয়ে গোসল করার প্রয়োজন হয়; তেমনি রোজার ত্রুটি ও দোষগুলো দূর করার জন্য সাদকাতুল ফিতর বা জাকাতুল ফিতর আদায় করেন। হাদিসে এসেছে-

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাকাতুল ফিতরকে রোজাদারের বেহুদা কথা ও কাজ এবং গুনাহ থেকে পবিত্র করা এবং নিঃস্ব-অসহায় মিসকিনদের খাবার উদ্দেশ্যে ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে তা আদায় করে; সেটি মহান আল্লাহর কাছে কবুল হবে। আর যে ব্যক্তি তা ঈদের নামাজের পর ফিতরা আদায় করে তা অন্যান্য সাধারণ দান-সাদকার মতো বিবেচিত হবে।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, মুসতাদরাকে হাকেম)

মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুমিন মুসলমান শাওয়াল মাসের প্রথম দিন ঈদ উদযাপন করে থাকেন। মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশেই মুমিন মুসলমান ঈদের আগে ফিতরা আদায় করে থাকেন।

তাছাড়া নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গরিবদের ফিতরা দেওয়ার জন্য ধনীদের প্রতি বিশেষ একটি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাহলো-

اَغْنُوْهُمْ فِىْ هَذَا الْيَوْمِ

‘আজ তাদেরকে (গরিব-অসহায়দের) ধনী করে দাও।’

অর্থাৎ ঈদের দিন গরিব-মিসকিন ও অসহায় মানুষকে ধনীদের মতো আনন্দ করার উদ্দেশ্যে সচ্ছল করে দাও।

ফিতরা আদায়ের নিয়ম

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ২ পরিমাপে ৫ জিনিস দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়। আর তাহলো গম, যব, কিসমিস, খেজুর, পনির। এসব গুলোর মধ্যে গমের পরিমাপ হলো অর্ধ সা আর বাকিগুলোর পরিমাপ এক সা। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী যে কোনো একটি দিয়ে এ ফিতরা আদায় করতে পারবেন। বর্তমান বাজারমূল্য হিসেবে তা তুলে ধরা হলো-

১. গম/আটা

গম বা আটার পরিমাপ হবে অর্ধ সা। যা ৮০ তোলা সেরের মাপে ১ সের সাড়ে বারো ছটাক। আর কেজির হিসাবে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম। তবে ন্যূনতম পূর্ণ ২ সের/কেজির মুল্য আদায় করা উত্তম ৷ যার বর্তমান বাজার মূল্য ৭৫ টাকা।

২. যব

যবের পরিমাপ হবে এক সা। কেজির হিসাবে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। যার বর্তমান বাজার মূল্য- ৩০০ টাকা।

৩. কিসমিস

কিসমিসের পরিমাপও এক সা। কেজির হিসাবে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। যার বর্তমান বাজার মূল্য- ১ হাজার ৪২০ টাকা।

৪. খেজুর

খেজুরের পরিমাপ এক সা। কেজির হিসাবে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। যার বর্তমান বাজার মূল্য- ১ হাজার ৬৫০ টাকা।

৫. পনির

পনিরের পরিমাপও এক সা। কেজির হিসাবে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম। যার বর্তমান বাজার মূল্য- ২ হাজার ৩১০ টাকা।

তবে যব, কিসমিস, খেজুর ও পনির-এর ক্ষেত্রে ৪ কেজির মূল্য পরিশোধ করাই উত্তম।

মনে রাখতে হবে

যদি কোনো পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, শিশু-কিশোর ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, এবং মা-বাবাসহ মোট ৮ জন সদস্য থাকে তবে পরিবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এ ৮ জনের ফিতরা আদায় করবেন। এভাবে হিসাব করে ফিতরা দিতে হবে।

ফিতরা দেবেন যারা

সামর্থ্যবান মুমিন নারী-পুরুষের ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। সামর্থ্যবানদের অধীনস্ত পরিবারের সব সদস্যদের ফিতরাও দায়িত্বশীল ব্যক্তি আদায় করবেন। অর্থাৎ পরিবারের শিশু-কিশোর যদি অর্থের মালিক না হয় তবে বাবাই পরিবারের লোকদের ফিতরা আদায় করবেন।

এক কথায় সামর্থ্যবান নারী-পুরুষ, শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সব স্বাধীন, পরাধীন এমনকি হিজড়া সম্প্রদারে ওপরই ফিতরা আদায় করা আবশ্যক। বালেগ সন্তান যদি পাগল হয় তবে পিতার পক্ষ থেকে তা আদায় করা ওয়াজিব৷

এ সম্পদ ঋণ এবং মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। তবে ব্যতিক্রম হলো- জাকাতের জন্য এ সম্পদ পূর্ণ এক বছর মালিকানায় থাকতে হবে, আর ফিতরার ক্ষেত্রে এক বছর থাকা শর্ত নয়। আর এসব ব্যক্তির জন্য ফিতরা গ্রহণ করাও হারাম।

আবার বাড়ি-ঘর, আসবাবপত্র, স্থাবর সম্পদের মূল্য (যদি ব্যবসার জন্য না হয়) জাকাতের নিসাবের অন্তর্ভূক্ত নয় ৷ কিন্ত ফিতরার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আসবাবপত্র,ঘর-বাড়ি ও স্থাবর সম্পদ, ভাড়া বাড়ি, মেশিনারীজ, কৃষিযন্ত্র ইত্যাদি (উপার্জনের জন্য না হলেও) এসবের মূল্যের হিসাবও ফিতরার নেসাবে অন্তর্ভূক্ত হবে৷

ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার সময়

ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পর সব সামর্থ্যবান মুমিনের ওপর ফিতরা আদায় করা আবশ্যক। এ সময়ের ঠিক আগ মুহূর্তে যদি কারো বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয় তবে ওই বাচ্চার জন্যও ফিতরা আদায় করতে হবে।

একটি বিষয় লক্ষণীয়…

সমাজের প্রায় সব মানুষই ৭৫ টাকা হারে ফিতরা হিসাব করে থাকে। কিন্তু ফিতরা আদায়ের হিসাবটি মুলত এমন নয়, কারণ অনেক মানুষ আছেন, যারা অঢেল সম্পদের মালিক। তারা চাইলে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১০ টাকার চেয়ে বেশি ফিতরা দিতে পারেন। অথচ এ পর্যায়ের অনেক মানুষ ফিতরার ক্ষেত্রে ৭৫ টাকা হিসাব করে ফিতরা দিয়ে থাকেন। এমনটি যেন না হয়। তাহলে অবস্থা অনুযায়ী ওই ব্যক্তির ফিতরা আদায়ে ইনসাফ হবে না। কেননা ফিতরা গরিবের আনন্দ বিনোদন ও উৎসব করার হক।

তাই কোনো ব্যক্তি যদি খেজুর দিয়ে ফিতরা দিতে চান তবে ওই ব্যক্তি উন্নত মানের আজওয়া খেজুর দিয়ে ফিতরা আদায় করা উচিত। এভাবে বাকি ৪ জিনিসের ক্ষেত্রেও উন্নত মানের দাম অনুযায়ী ফিতরা দেয়া জরুরি।

সাদকাতুল ফিতরের মাধ্যমে একদিকে যেমন অভাবী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূরা হয়; অন্যদিকে পবিত্র উৎসবের দিনে এটি একটি বিরাট মানবিক বিষয়। তাই সব রোজাদারের উচিত, রমজানেই সাদকাতুল ফিতর আদায় করা। নিজেদের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া। রমজানের দানের বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা অর্জন করা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সব সম্পদশালী ব্যক্তিকে রমজান মাসে তথা ঈদের আগেই যার যার অবস্থান অনুযায়ী ফিতরা আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এম এস, ২৮ এপ্রিল

Back to top button