ইউরোপ

‘বড়’ যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে ইউক্রেন-রাশিয়া

কিয়েভ, ১১ এপ্রিল – বড় আকারের ট্যাংক ও কামানের লড়াই আশঙ্কা করছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এই লড়াই ‘আমাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেবে’। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সপ্তাহের শুরু থেকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে সেনা ও সামরিক শক্তির সমাবেশ বাড়াতে শুরু করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। অঞ্চলটিতে রাশিয়ার সামরিক হামলা জোরদার হতে থাকায় স্থানীয়রা এলাকাও ছাড়ছে।

রাশিয়ার প্রধান সামরিক লক্ষ্য এখন ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলের পূর্বাংশ দখল করা।

ছয় সপ্তাহের প্রথম ধাপের মতো হবে না আসন্ন যুদ্ধটি। ট্যাংক, কামান ও যুদ্ধবিমানের ব্যবহারও থাকবে এবার। আর এই ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে রাশিয়া।

ইতোমধ্যে কিয়েভ থেকে প্রত্যাহার হওয়া রুশ ট্যাংক ও কামান ইউনিট ও সেনারা জড়ো হতে শুরু করছে। রুশ সামরিক টেলিভিশনের ফুটেজে এমন দৃশ্য প্রচার হয়েছে।

আক্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও টেলিভিশনটি জানিয়েছে।

ইউক্রেনও রুশ সেনা প্রত্যাহারের পর উত্তরাঞ্চল থেকে তাদের সেনাদের ডনবাসের দিকে পাঠাতে শুরু করেছে।

ডনবাসের সংযোগ রেখা এবং আশেপাশের এলাকায় প্রতিদিন বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হচ্ছে। রুশ সেনারা ইজিউমের দক্ষিণ থেকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে।

পশ্চিমা ও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, বড় ধরনের আক্রমণ কখন শুরু হবে তা নির্ভর করছে রাশিয়ার ওপর।

তাদের মতে, রাশিয়া হয়তো মোতায়েনকৃত সেনা দিয়েই হামলা শুরু করতে পারে। অথবা উত্তর ইউক্রেনে ব্যর্থ সেনাদের পুনর্গঠিত করতে কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা লাগতে পারে।

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা আরও বলছেন, ডনবাস দখল করেই ক্ষান্ত হবে না মস্কো। পুতিন চান, ডনবাসের লড়াইয়ে ইউক্রেনের সেরা ইউনিটগুলো ধ্বংস করতে। এরপর তারা কিয়েভসহ পুরো দেশ দখলের চেষ্টা করবে।

সংঘাতের নতুন ধাপের আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জরুরি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেন দখলের আশা ছাড়েনি মস্কো।

তার কথায়, ‘রাশিয়া এখনও ভ্রমের মধ্যে বাস করতে পারে, নতুন অস্ত্র ও সেনা আমাদের মাটিতে জড়ো করতে পারে। যার অর্থ হলো আমাদের আরও নিষেধাজ্ঞা এবং আমাদের দেশের জন্য আরও অস্ত্র প্রয়োজন।’

ইউক্রেনে সেনা মোতায়েন ব্যহত করতে ইউক্রেনীয় রেলস্টেশনে বিমান হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। শুক্রবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৭ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইউক্রেন।

তবে ওই হামলার কথা অস্বীকার করেছে মস্কো। রবিবার রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল ইগর কোনাশেনকভ দাবি করেছেন, সমুদ্র থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে দিনিপ্রো শহরের একটি হ্যাঙ্গারে থাকা ইউক্রেনের চারটি এস-৩০০ লঞ্চার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দেশটির ২৫ সেনা সদস্যও আহত হয়েছে।

ইউক্রেন নিয়ন্ত্রিত ডোনেস্ক ও লুহানস্ক কর্তৃপক্ষ বেসামরিকদের দ্রুত অঞ্চলটি ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। স্থানীয়দের সরিয়ে নিতে বিশেষ ট্রেন ও বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ডনবাসের পশ্চিমে দিনিপ্রোপাত্রোভস্ক অঞ্চলে রবিবার (১০ এপ্রিল) বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে একটি এয়ারপোর্ট টারমিনাল ও দনিপ্রো শহরের আরেকটি অবকাঠামো এবং পাভলোহরাদ শহরে শিল্প স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এমন দাবি করেছে আঞ্চলিক প্রশাসন।

ইউক্রেনের সেনারা মধ্যরাতে ইজিউম শহরগামী রুশ সেনাদের একটি কলাম ধ্বংস করেছে বলে জানিয়েছেন খারকিভের গভর্নর। স্বতন্ত্রভাবে কোনও সংবাদমাধ্যম এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

মার্চের শেষ দিকে কিয়েভ ও উত্তর ইউক্রেনীয় শহর দখলে রাশিয়ার প্রাথমিক লক্ষ্য ব্যর্থ হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের দেওয়া জ্যাভেলিনের মতো হালকা ও বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের এই সফলতায় বড় ভূমিকা রেখেছে। তুরস্কে নির্মিত ড্রোন ‘বায়রাকতার টিবি২’-এর অবদানও ছিল উল্লেখযোগ্য।

ইউক্রেন ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, উত্তর ইউক্রেন থেকে প্রত্যাহার হওয়ার রুশ সেনাদের ট্যাকটিক্যাল গ্রুপগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। শিগগিরই তাদের ডনবাস অঞ্চলে পুনরায় মোতায়েন করা সম্ভব হবে না।

এক সিনিয়র পেন্টাগন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দেখেছি কয়েকটি ইউনিট একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। জনবলের ঘাটতি মেটাতে রাশিয়া চেষ্টা করছে তাদের রিজার্ভে থাকা ৬০ হাজার সেনা মোতায়েনের।’

আসন্ন আক্রমণের আগে জেনারেল আলেকজান্ডার ডভোর্নিকভকে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব মস্কো দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।

যুদ্ধের প্রথম দিকে যখন রাশিয়া বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ চালায় তখন চার সামরিক জেলা স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হয়।

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে সমন্বয়ের অভাব ঘটেছে। যার ফলে যুদ্ধে রাশিয়াকে ভুগতে হয়েছে।

অবশ্য মস্কোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জেনারেল ডভোর্নিকভকে কমান্ডার হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

ইউক্রেনীয় ও পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, ডনবাস রণক্ষেত্রে কৌশলগত পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য সুবিধাজনক। এখানে রাশিয়ার সাপ্লাই লাইন দীর্ঘ নয়। অভিযানের এলাকা ঘনীভূত হওয়ার কারণে কার্যকরভাবে রাশিয়া বিমান সহায়তাকে কাজে লাগাতে পারবে।

যুদ্ধের ধরন পাল্টে যাওয়ায় বিশাল রুশ বাহিনীর মোকাবিলা ছোট ছোট ইউনিট দিয়ে করা সম্ভব হবে না ইউক্রেনের পক্ষে। এ কারণেই কিয়েভ জরুরিভিত্তিতে ভারী অস্ত্র চাচ্ছে। তালিকায় আছে— কামান, ট্যাংক, বিমান-বিধ্বংসী ব্যাটারি ইত্যাদি। এসব অস্ত্র পশ্চিমা মিত্ররা এখনও ইউক্রেনকে দেয়নি।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেভা গত সপ্তাহে ন্যাটো জোটের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেছিলেন, ডনবাসের লড়াই আপনাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেবে। বিশাল অভিযান ও কৌশল, হাজারো ট্যাংক, সাজোয়াঁ যান, যুদ্ধবিমান ও কামানের অংশগ্রহণ থাকবে এই লড়াইয়ে। রাশিয়ার প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে এটি কোনও স্থানীয় অভিযান হবে না।

ন্যাটোর মন্ত্রীদের প্রতি তিনি বলেন, আপনারা এখুনি আমাদের সহযোগিতা করুন। আমি সপ্তাহের কথা বলছি না, দিনের কথা বলছি। নতুবা অনেক মানুষের প্রাণহানী হবে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
এম ইউ/১১ এপ্রিল ২০২২

Back to top button