ফুটবল

মায়ের ডাক উপেক্ষা করে বাবার ক্লাবে খেলছেন আবিদ

রফিকুল ইসলাম

ঢাকা, ২৭ মার্চ – যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে মা যখনই ফোন করেন, ছেলে আবিদ হোসেনকে বলেন ‘বাবা তুই ফিরে আয়।’ মায়ের এই ভালোবাসা মাখা ডাক উপেক্ষা করে আবিদ হোসেন খেলে যাচ্ছেন দেশের ঐতিহ্যবাহী দল মোহামেডানে।

আবিদ হোসেনের বাবা আবুল হোসেন দেশের ফুটবলের বিখ্যাত এক নাম। মোহামেডানের ইতিহাসের অন্যতম এই তারকার ছেলে আবিদ হোসেন এখন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ খেলছেন তার বাবার স্মৃতি বিজরিত ক্লাবে। সাদা-কালো জার্সিতেই নয়, জাতীয় দলের লাল-সবুজ জার্সিতেও বাবার কীর্তিকে ছাড়িয়ে যেতে চান ২৪ বছর বয়সী এই যুবক।

আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে ঢাকার মাঠ মাতানো আবুল হোসেন ক্লাব ও জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন, ছিলেন প্রিয় ক্লাব মোহামেডানের কোচও। দেড় যুগ আগে পরিবারসহ আবুল হোসেন পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। আবিদের বয়স তখন ৬ বছর।

ফুটবলের রক্ত যার ধমনীতে সে কি ফুটবল ছাড়া থাকতে পারে? দেশে থাকার সময় বাবার হাত ধরে ফুটবল মাঠে ও ক্লাবে যাতায়াত করায় ফুটবলের নেশা চেপে বসেছিল আবিদের। ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পামবিচ ফুটবল ক্লাবের হয়ে তৃতীয় বিভাগ লিগেও তিন বছর খেলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বাংলাদেশে এসে কেন ফুটবল খেলছেন আবিদ? এর পেছনে তিনটি সূত্র কাজ করেছে। এক. যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় বিভাগ ও দ্বিতীয় বিভাগ লিগের পার্থক্য অনেক। দ্বিতীয় বিভাগের কোন ক্লাবে খেলতে যে সামর্থ্য দরকার আবিদের তাতে ঘাটতি আছে। দুই. আবিদের তার বাবার ক্লাব মোহামেডানে খেলার ইচ্ছা তিন. বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন। এই তিনটি সমীকরণ মিলিয়ে আবিদ হোসেন এখন মোহামেডানের জার্সিতে ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করছেন।

রোববার মোহামেডান ক্লাবে বসে আবিদ হোসেন শোনালেন এই দেশে তার ফুটবল খেলার গল্প। ‘আমি ২০১৭ সালে মোহামেডানের ট্রায়ালে এসেছিলাম। তখন এখানকার আবহাওয়া ও খাদ্যের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে চলে গিয়েছিলাম আমেরিকা। দুই বছর পর আবার এসে ক্লাবে নাম লেখাই। কিন্তু কোন ম্যাচ খেলা হয়নি। আবার এসেছি খেলতে। এবার স্বাধীনতা কাপে মুক্তিযোদ্ধার বিপক্ষে মোহামেডানের জার্সিতে অভিষেক হয়। লিগে অভিষেক হয়েছে টঙ্গীতে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের বিপক্ষে ম্যাচে’- বলছিলেন আবিদ হোসেন।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটে আবাহনীর বিপক্ষে খেলে একটা রেকর্ডও করে ফেলেছেন আবিদ। প্রথম ফুটবলার হিসেবে বাবার পর ছেলেও খেলেছেন মোহামেডান-আবাহনী ম্যাচে। মোহামেডানের অস্ট্রেলিয়ান কোচ শন লিন আবিদকে রাখছেন প্রায় প্রতি ম্যাচে। এ পর্যন্ত খেলা লিগের ৯ ম্যাচের ৮টিতেই দলে ছিলেন আবিদ। যার ৬টিতেই খেলেছেন শুরুর একাদশে। একটি ম্যাচ মিস করেছেন সামান্য ইনজুরিতে থাকায়।

এক জায়গা বাবা ও ছেলের বেশ মিলও রয়েছে। বাবা খেলতে রাইট ব্যাকে, আবিদ খেলেন লেফট ব্যাকে। তবে এক সময় আবিদ লেফট উইংয়ে খেলতেন। ‘আমি লেফট উইংয়েই খেলতাম। নাসির ভাই (অনেক বড় এবার জাতীয় দলে ডাক পাওয়া নাসিরুল ইসলাম) আমাকে বললেন লেফট ব্যাকে খেলতে। কোচও আমাকে লেফট ব্যাকের জন্য পছন্দ করলেন। তাই এখানেই থিতু হয়েছি’- বলছিলেন আবিদ হোসেন।

দেশের অন্যতম তারকা ফুটবলার আবুল হোসেনের ছেলে আবিদ হোসেন তার বাবাকেও ছাড়িয়ে যেতে চান, ‘আমি চাই বাবার মতো ফুটবলার হতে। মোহামেডানে নিয়মিত খেলতে চাই। পাশাপাশি জাতীয় দলেও জায়গা করে নিতে চাই।’

বাবার মতো কিংবা তার চেয়ে বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কতটা আত্মবিশ্বাসী আপনি? জবাবে আবিদ হোসেন বলেন, ‘প্রথমে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল না। এখানে খাপ খাওয়াতে পারবো কি না, ভালো খেলতে পারবো কি না- এসব নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। এখন সবকিছু বিল্ডআপ হয়েছে, আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। এখন মনে হচ্ছে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো।’

ফ্লোরিডার পামবিস স্টেট ইউনিভার্সিটি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবিদ। লিগ শেষ হলে অনলাইনে ক্লাস শুরু করবেন। পড়াশোনা ও খেলা একসঙ্গেই চালিয়ে যেতে চান তিনি। মজার বিষয় হলো তার খেলা নিয়ে বাবা আবুল হোসেন বেশি কিছু বলেন না।

‘আমি আমার মতো করে খেলি। যখন ঢাকায় খেলবো বলে বাবাকে বলেছিলাম, তখন তিনি দ্বিধায় ছিলেন। পড়ে রাজি হন। আমার খেলা তিনি ইউটিউবে দেখেন। আবার টিভিতে দেখালে সরাসরি দেখেন। কোথাও কোন ভুল করলে সেটা শুধরিয়ে দেন। এর বাইরে বাবা ফুটবল নিয়ে তেমন কিছু বলেন না’- জানালেন আবুল হোসেনের ছেলে আবিদ হোসেন।

আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসে খেলার ব্যাপারে আবিদের মা প্রথমে ততটা সায় দেননি। এখন উৎসাহ দেন। তবে যখনই ফোনে কথা হয় তখনই নাকি বলেন ‘তুমি চলে আসো।’

আবিদ বলছিলেন, ‘আমরা এক ভাই দুই বোন। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে আমি। যে কারণে তারা আমাকে বেশি মিস করেন। মা বেশি ফোন দেন এবং তখন একবার বলবেনই ‘তুমি চলে আসো।’ আমার এখানে খেলার আগ্রহ দেখে আবার উৎসাহও দেন।’

প্রথমবার এসে কোন কিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা আবিদের এখন আর ওই সমস্যা নেই। জানালেন, ‘এখন আবহাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। খাওয়া নিয়ে একআধটু সমস্যা হলেও মানিয়ে নিচ্ছি। প্রয়োজন হলে হোটেলে গিয়ে পাস্তা বা আমার পছন্দের খাবার খেয়ে নেই। আস্তে আস্তে সবকিছু অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। এখন সতীর্থদের সঙ্গেও আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে। সবাই আমাকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করি, দুষ্টমি করি। অনেক ভালো সময় কাটাচ্ছি।’

ফ্লোরিডায় খেলা তৃতীয় বিভাগ লিগ সম্পর্কে বলেন, ‘ওই লিগের কোনো প্রমোশন বা রেলিগেশন নেই। যে কারণে আমাদের ক্লাব দুইবার রানার্সআপ হয়েও দ্বিতীয় বিভাগে উঠতে পারেনি। ওখানকার দ্বিতীয় বিভাগ লিগেও ব্রাজিলসহ অনেক বিদেশি খেলোয়াড়রা খেলে থাকেন। দ্বিতীয় বিভাগে লিগের জন্য একবার ট্রায়ালে ডাক পেয়েছিলাম। কিন্তু অনেক দূর বলে যাওয়া হয়নি। আমরা যে ক্লাবে খেলেছি ওয়েস্টপাম বিচ ফুটবল ক্লাবে তাদেরও একটা নিজস্ব স্টেডিয়াম আছে। সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার দর্শক খেলা দেখার মতো ব্যবস্থাও আছে ওই স্টেডিয়ামে।’

সূত্র : জাগো নিউজ
এন এইচ, ২৭ মার্চ

Back to top button