জাতীয়

ভর্তুকি ব্যয় মেটাতে বিকল্প কৌশল খুঁজছে সরকার

ঢাকা, ২৬ মার্চ – রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সার, এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। বেড়ে গেছে ভর্তুকির চাপ। ইতোমধ্যে বাজেটে রাখা ভর্তুকি বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে গেছে। ফলে ভর্তুকি ব্যয় মেটানোর কৌশল খুঁজছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থবছর শেষ হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি। বাদবাকি সময়ে অতিরিক্ত ভর্তুকির কারণে বাজেটে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। বর্ধিত এই অর্থ কীভাবে মেটানো হবে তার জন্য একটি কৌশলের কথা চিন্তা করছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরে অস্বাভাবিক ভর্তুকি ব্যয়ের কিছু অংশ আগামী অর্থবছরেও টেনে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, চলতি অর্থবছরের কিছু ভর্তুকি আগামী বাজেট থেকে দেওয়া হবে।

সূত্র জানায়, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ মাসে ভর্তুকির ৭১ ভাগ টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। এরপরও বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ভর্তুকির বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ধরনা দিয়ে চলেছে। ভর্তুকির অর্থ চাওয়ার দিক থেকে শীর্ষ দুই মন্ত্রণালয় হচ্ছে- কৃষি ও জ্বালানি। তারা ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি অতিরিক্ত প্রণোদনা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।

এই ভর্তুকি ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে? এ বিষয়ে সূত্র জানায়, শুধু এই তিন খাতেই নয়; আরো কয়েক খাতে প্রণোদনা-ঋণ দেওয়া হয়। এটিও বাজেটে ভর্তুকি খাতে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে। ফলে এসব বিষয় যোগ করলে মোট ভর্তুকি রয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সিংহভাগ ভর্তুকিই কৃষি, জ্বালানি খাতে ব্যয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে ভর্তুকি বাড়ানোর চাপ রয়েছে। চেয়েছিলাম সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে কিছুটা ভর্তুকি অর্থ পুষিয়ে নিতে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকার এই তিন পণ্যের দাম বাড়াতে চাচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। ফলে কৃষি, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, রেমিট্যান্স খাতে যে ২৮ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে; বছর শেষে তা বেড়ে ৪০-৪৫ হাজার কোটি টাকা গিয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বর্ধিত অর্থ চলতি অর্থবছরের বাজেট থেকে দেওয়া সম্ভব হবে না। আমরা চাচ্ছি, অতিরিক্ত কিছু অর্থ আগামী অর্থবছরের বাজেট থেকে পরিশোধ করতে। এই বিষয়ে একটি প্রস্তাব এ সংক্রান্ত কমিটির পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করার চেষ্টা চলছে।

সূত্র আরো জানায়, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, বিদ্যুৎ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতে মোট ২৮ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে জুলাই-জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে ২০ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ৭১ শতাংশ। সাত মাসে ভর্তুকি প্রাপ্তির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। বাজেটে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভর্তুকির অর্থ ছাড় করা হয়েছে ৫ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাত তাদের ৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি বিপরীতে পেয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা।

একইভাবে রপ্তানি খাতের ৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে ৭ মাসে ব্যয় করা হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। রেমিট্যান্স খাতে খরচ করা হয়েছে ৩২ শ’ কোটি টাকা। এখাতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে রেমিট্যান্স প্রণোদনার হার ২ থেকে বাড়িয়ে আড়াই ভাগ করা হয়েছে। ফলে এ খাতে প্রণোদনা পরিমাণ সংশোধিত বাজেটে বাড়িয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে।

তিনি জানান, কৃষি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বর্ধিত ভর্তুকি চেয়ে আমাদের কাছে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। এ বছর বাজেটে রক্ষিত প্রণোদনা লক্ষ্যমাত্রা আমাদের ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ বছর শেষে কৃষি ও জ্বালানি খাতে আরো ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন পড়বে। ইতোমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয় ৩২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে।

এর আগে, কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী ফেব্রুয়ারি মাসে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে সারের দাম বাড়ায়নি সরকার। সারের দাম যদি না বাড়ানো হয় তাহলে এ বছর ভর্তুকির প্রয়োজন পড়বে ২৮ হাজার কোটি টাকা।

তিনি আরো বলেন, এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি ইউরিয়া সার আন্তর্জাতিক বাজারে ৩২ থেকে বেড়ে ৯৬ টাকা হয়েছে। কিন্তু সরকার এই সার আগের দামেই প্রতি কেজি ১৬ টাকা দরে বিক্রি করছে। কারণ এই মুহূর্তে সারের দাম বাড়ালে কৃষি উৎপাদনের দাম বাড়বে। যা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ফলে সরকার বিকল্প পথ খুঁজছে।

সূত্র : রাইজিংবিডি
এন এইচ, ২৬ মার্চ

Back to top button