দক্ষিণ এশিয়া

ঋণের ফাঁদে আটকা শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কী

কলম্বো, ২৪ মার্চ – চরম এক সংকটকাল পার করছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে এখন শুধুই হাহাকার। খাবারের দাম আকাশচুম্বী। চলছে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। তেল সংগ্রহের জন্য হাজার-হাজার মানুষ লাইনে ভিড় করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রল পাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে লঙ্কান সরকার।

কাগজের অভাবে স্কুল পর্যায়ের পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে শ্রীলঙ্কা। কারণ, কাগজ আমদানির মতো বৈদেশিক মুদ্রা তাদের কাছে নেই। বিদেশি ঋণের ভারে আজ জর্জরিত দ্বীপরাষ্ট্রটি। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় ঠেকেছে, তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয়ও মেটাতে পারছে না। যার ফলে জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আর কখনো এতটা দুরবস্থায় পড়েনি দেশটি।

এক সময়ের শক্তিশালী লঙ্কান অর্থনীতি এভাবে ভেঙে পড়লো কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীলঙ্কার এই সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। বহু বছর ধরে একের পর এক অলাভজনক মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন আর অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই এমন ঘোর বিপদে পড়েছে দক্ষিণ এশীয় দেশটি।

অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প
শ্রীলঙ্কা গত ১৫ বছরে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, মহাসড়কসহ নানা ধরনের প্রকল্প রয়েছে। রাজধানী কলম্বোর কাছে সমুদ্র থেকে ভূমি উদ্ধার করে কলম্বো পোর্ট সিটি নামে আরেকটি শহর তৈরি করা হচ্ছে। এর কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ২৫ বছর এবং বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার। বলা হচ্ছে, হংকং, দুবাই, সিঙ্গাপুরকে টেক্কা দেবে শ্রীলঙ্কার এই নতুন শহর। চীনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে লঙ্কানরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন উৎস থেকে দেদারছে ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু বিপুল অর্থখরচ হলেও অনেক প্রকল্পই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়নি।

কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শ্রিমাল আবিরত্নে বলেন, কিছু বড় প্রকল্প শ্রীলঙ্কার জন্য ‘সাদা হাতিতে’ রূপান্তরিত হয়েছে। এর মধ্যে হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর অন্যতম।

তার কথায়, গত ১৫ বছরে শ্রীলঙ্কায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ তেমন আসেনি। এর পরিবর্তে বিভিন্ন সরকার ঋণ নেওয়াতেই বেশি মনোযোগী ছিল।

গত এক দশকে চীনের কাছ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। এই অর্থে বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করেছে তারা।

অধ্যাপক আবিরত্নে বলেন, শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকটের জন্য শুধু চীনা ঋণকে দোষারোপ করলে হবে না। চীন হচ্ছে শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। এর বাইরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মুদ্রা বাজার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপানের কাছ থেকেও ঋণ নিয়েছে লঙ্কানরা।

আবিরত্নের ভাষ্যমতে, চীনের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া সহজ বলেই তা নেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কার মোট ঋণের মাত্র ১০ শতাংশ চীন থেকে নেওয়া আর ৪৭ শতাংশ নেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন বন্ড ইস্যু করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণের অর্থ অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে ব্যবহার করেছে লঙ্কান সরকার, যা থেকে অর্থনৈতিকভাবে কোনো লাভ হয়নি।

ঋণের ভারে জর্জরিত
গত দেড় দশকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে দুহাত ভরে ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন সরকার। এর অন্যতম উৎস ছিল সার্বভৌম বন্ড। ২০০৭ সাল থেকে দেশটির সরকার অর্থ জোগাড়ের জন্য সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করছে।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, একটি দেশের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে এ ধরনের সার্বভৌম বন্ড বিক্রি করা হয়। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে এ ধরনের বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। শ্রীলঙ্কা সেটাই করেছে।

কিন্তু এই অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে সে বিষয়ে খুব একটা চিন্তা-ভাবনা করেনি লঙ্কান সরকার।

ঋণ পরিশোধে বেহাল অবস্থা
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড বাবদ শ্রীলঙ্কার ঋণ রয়েছে অন্তত ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলার। দেশীয় উৎস থেকেও ঋণ নিয়েছে লঙ্কান সরকার। সব মিলিয়ে চলতি বছর দেশটিকে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ (আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড) রয়েছে ১৫০ কোটি ডলারের।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছর ঋণের সব কিস্তি পরিশোধ করতে পারবে না শ্রীলঙ্কা। যদিও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করেছে, এই ধারণা ঠিক নয়।

লঙ্কান কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড বাবদ যে ঋণ নেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে ২৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। সবশেষ গত জানুয়ারি মাসে ৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে শ্রীলঙ্কা।

তবে ঋণ মেটাতে গিয়ে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। যে কারণে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে পারছে না লঙ্কানরা।

২০২১ সালে সেপ্টেম্বর মাসে লঙ্কান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশটিতে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা জারি করেন। এর ফলে মৌলিক খাদ্যপণ্য সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের হাতে। তবুও দেশটিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।

গত জানুয়ারি মাসে লঙ্কান প্রেসিডেন্ট ঋণ পরিশোধের বিষয়টি সমন্বয় করার জন্য চীনের কাছে অনুরোধ করেছেন। এছাড়া ইরানের কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ ২৫ কোটি মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। এর বদলে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডলারের চা পাঠাচ্ছে লঙ্কান সরকার। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে এভাবে ধীরে ধীরে ইরানের পাওনা পরিশোধ করবে তারা।

কর ছাড়
২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ক্ষমতাগ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কায় ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর ঘোষণা দেন। তার এ সিদ্ধান্তে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। সেসময় ভ্যাট প্রদানের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে আট শতাংশে আনা হয়। বলা হয়েছিল, এর মূল কারণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা।

২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসেও (বর্তমান প্রেসিডেন্টের ভাই) একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর ফলে তখন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে গতি এসেছিল। সেটি মাথায় রেখে বর্তমান প্রেসিডেন্টও একই পদক্ষেপ নেন। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য। এর কয়েক মাস পরেই বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হয়।

অধ্যাপক শ্রিমাল আবিরত্নে বলেন, আয়কর ও ভ্যাট কমানোয় দেশটির রাজস্ব আয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে সরকার আরও বেশি ঋণ নিতে বাধ্য হয়।

শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র ডেপুটি গভর্নর বলেন, ট্যাক্স কমানোর সিদ্ধান্ত ছিল লঙ্কান সরকারের একটি বড় ভুল। ট্যাক্স কমানোয় সরকারের আয় কমে যায়। আবার করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু সরকারকে ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ঠিকই মেনে চলতে হয়। সবমিলিয়ে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয় লঙ্কান অর্থনীতির ওপর।

পর্যটন ও প্রবাসী আয়ে বিপর্যয়
শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস দেশটির পর্যটন খাত। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে প্রায় দুই বছর পর্যটন শিল্পের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্বাভাবিকভাবেই চরম সংকটে পড়েছে দেশটির অর্থনীতি।

মহামারির আগে শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক যেতো চীন থেকে। কিন্তু চীনে করোনা সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ কঠোর থাকায় এ দু’বছর তেমন পর্যটক যেতে পারেনি। এর ফলে শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাতে বিপর্যয় নেমে আসে।

শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেকটি বড় জায়গা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে কর্মরত লঙ্কান নাগরিকদের পাঠানো ডলার। কিন্তু মহামারির মধ্যে সেটিও অনেক কমে গেছে।

অধ্যাপক আবিরত্নে জানান, করোনাভাইরাস মহামারির আগে পর্যটন ও রেমিট্যান্স থেকে শ্রীলঙ্কা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার আয় করতো।

জৈব চাষে বিপর্যয়
২০১৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কায় জৈব কৃষি চালু করেন। সেজন্য কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। যার ফলে বন্ধ হয়ে যায় রাসায়নিক সার আমদানি।

কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দ্বীপরাষ্ট্রের কৃষিতে। তাদের চালের উৎপাদন ২০ শতাংশের মতো কমে যায়। একসময় চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্রীলঙ্কা বাধ্য হয় ৪৫ কোটি ডলারের চাল আমদানি করতে। দেশীয় বাজারে এর দামও বাড়তে থাকে হু হু করে।

জৈব কৃষির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল দেশটির চা উৎপাদনেও। চা রপ্তানি করে শ্রীলঙ্কা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। কিন্তু রাসায়নিক সারে নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা লাগে সেখানেও।

কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে লঙ্কান সরকার ২০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। তবে সারা দেশে খাদ্য ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করে।

আবিরত্নে বলেন, জৈব কৃষি চালুর আগে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা করা হয়নি। এতে ফল হয়েছে উল্টো। উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামের কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে এবং খাদ্য আমদানির জন্য আরও বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়েছে।

সংকট সামলানোর চেষ্টা
বর্তমান সংকট সামাল দিতে শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। সেজন্য বহু দেশ ও সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছে দেশটি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা করছে লঙ্কান সরকার। সংস্থাটির কাছ থেকে ঋণ পেতে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে দেশটি। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে শ্রীলঙ্কার রুপির মান ২৩০।

এছাড়া চীন ও ভারতের কাছে আরও ঋণের জন্য আবেদন করেছে শ্রীলঙ্কা। জরুরি খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি কিনতে চলতি মাসে লঙ্কান সরকারকে ১০০ কোটি ডলার দিয়েছে ভারত।

শ্রীলঙ্কার ওপর যেভাবে ঋণের পাহাড় বাড়ছে, তা থেকে দেশটি সহসা বেরিয়ে আসতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। লঙ্কান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুসারে, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে শ্রীলঙ্কার কাছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৫০ কোটি ডলারেরও কম, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

অর্থনীতিবিদ শ্রিমাল আবিরত্নে বলেন, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগের মাধ্যমে চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে শ্রীলঙ্কা। তবে তার জন্য দেশটির রপ্তানি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, রপ্তানি বাড়াতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য দরকার। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগ লাগবে। কারণ, শ্রীলঙ্কার ব্যবসা ছোট এবং তাদের পক্ষে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।

এছাড়া মধ্যম মেয়াদে দেশটির রাজস্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে হবে বলেও উল্লেখ করেন কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক।

সূত্র: জাগো নিউজ
এম ইউ/২৪ মার্চ ২০২২


Back to top button
🌐 Read in Your Language