ইসলাম

পারিবারিক জীবনে নারীর মর্যাদা

সৃষ্টির সৌন্দর্য ও আদর্শ পরিবার গঠনে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই নারীর অংশগ্রহণ ও দায়িত্ব পালন করার বিষয়টি কোরআন-সুন্নায় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। পারিবারিক জীবন নারী ছাড়া কল্পনাতীত। পারিবারিক জীবনে নারীর গুরুত্ব ও দায়িত্ব কী?

নারীর অধিকার ও প্রয়োজনীয়তার এমন কোনো দিক বা বিষয় কোরআন-সুন্নাহর আলোচনা থেকে বাদ যায়নি। যেখানে ইসলাম পূর্ব জীবনাদর্শ ও সমাজগুলোতে নারীকে মানবাত্মাই মনে করা হতো না। সেখানে ইসলাম নারীকে দিয়েছে সর্বক্ষেত্রে সর্বোত্তম অধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা।

১. মা হিসেবে নারীর গুরুত্ব ও দায়িত্ব

ইসলাম নারীকে দান করে সর্বোচ্চ সম্মান মায়ের মর্যাদা। মা তার সন্তানের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করার কারণেই মহান আল্লাহ মায়ের মর্যাদায় ঘোষণা করেন-

وَ وَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡهِ اِحۡسٰنًا ؕ حَمَلَتۡهُ اُمُّهٗ کُرۡهًا وَّ وَضَعَتۡهُ کُرۡهًا ؕ وَ حَمۡلُهٗ وَ فِصٰلُهٗ ثَلٰثُوۡنَ شَهۡرًا ؕ حَتّٰۤی اِذَا بَلَغَ اَشُدَّهٗ وَ بَلَغَ اَرۡبَعِیۡنَ سَنَۃً ۙ قَالَ رَبِّ اَوۡزِعۡنِیۡۤ اَنۡ اَشۡکُرَ نِعۡمَتَکَ الَّتِیۡۤ اَنۡعَمۡتَ عَلَیَّ وَ عَلٰی وَالِدَیَّ وَ اَنۡ اَعۡمَلَ صَالِحًا تَرۡضٰهُ وَ اَصۡلِحۡ لِیۡ فِیۡ ذُرِّیَّتِیۡ ۚ اِنِّیۡ تُبۡتُ اِلَیۡکَ وَ اِنِّیۡ مِنَ الۡمُسۡلِمِیۡنَ

আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস। অবশেষে যখন সে তার শক্তির পূর্ণতায় পৌঁছে এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে, ‘হে আমার রব, আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার উপর ও আমার মাতা-পিতার উপর যে নেয়ামত দান করেছ, তোমার সে নেয়ামতের যেন আমি শোকর আদায় করতে পারি এবং আমি যেন সৎকর্ম করতে পারি, যা তুমি পছন্দ কর। আর আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মধ্যে সংশোধন করে দাও। নিশ্চয় আমি তোমার কাছে তাওবা করলাম এবং নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা আহকাফ : আয়াত ১৫)

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, একজন লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে আবেদন করে, হে আল্লাহর রাসুল! আমার উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত কে? তিনি বলেন, তোমার মা! পুনরায় জানতে চাইলেন, তারপর কে? বললেন, তোমার মা! পুনরায় জানতে চাইলেন, তারপর কে? বললেন তোমার মা; পুনরায় জানতে চাইলেন, তারপর কে? বললেন, তোমার পিতা।’ (বুখারি)

২. কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা

পারিবারিক জীবনে কন্যা সন্তান অনেক মর্যাদার। তাঁর প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনকে জান্নাতের অধিকারী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বনবি। পরকালের নেয়ামতের ঘোষণাই নয় বরং দুনিয়াতেও নারীকে পরিবারের বাবা ও স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারী করেছেন।

কন্যা সন্তানের যেখানে বাঁচার অধিকার ছিল না, সেখানে তাকে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েই ইসলাম। শুধু তা-ই নয় বরং সামাজিক এবং পারিবারিক সম্মানের উপর নারী জাতিকে অধিষ্ঠিত করে উত্তরাধিকার হওয়ার উপযুক্ত করেছে। আল্লাহ বলেন-

یُوۡصِیۡکُمُ اللّٰهُ فِیۡۤ اَوۡلَادِکُمۡ ٭ لِلذَّکَرِ مِثۡلُ حَظِّ الۡاُنۡثَیَیۡنِ ۚ فَاِنۡ کُنَّ نِسَآءً فَوۡقَ اثۡنَتَیۡنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَکَ ۚ وَ اِنۡ کَانَتۡ وَاحِدَۃً فَلَهَا النِّصۡفُ ؕ وَ لِاَبَوَیۡهِ لِکُلِّ وَاحِدٍ مِّنۡهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَکَ اِنۡ کَانَ لَهٗ وَلَدٌ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَکُنۡ لَّهٗ وَلَدٌ وَّ وَرِثَهٗۤ اَبَوٰهُ فَلِاُمِّهِ الثُّلُثُ ۚ فَاِنۡ کَانَ لَهٗۤ اِخۡوَۃٌ فَلِاُمِّهِ السُّدُسُ مِنۡۢ بَعۡدِ وَصِیَّۃٍ یُّوۡصِیۡ بِهَاۤ اَوۡ دَیۡنٍ ؕ اٰبَآؤُکُمۡ وَ اَبۡنَآؤُکُمۡ لَا تَدۡرُوۡنَ اَیُّهُمۡ اَقۡرَبُ لَکُمۡ نَفۡعًا ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا

‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ। তবে যদি তারা দুইয়ের অধিক মেয়ে হয়, তাহলে তাদের জন্য হবে, যা সে রেখে গেছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ; আর যদি একজন মেয়ে হয় তখন তার জন্য অর্ধেক। আর তার বাবা-মা উভয়ের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ সে যা রেখে গেছে তা থেকে, যদি তার সন্তান থাকে। আর যদি তার সন্তান না থাকে এবং তার ওয়ারিশ হয় তার মা-বাবা তখন তার মার জন্য তিন ভাগের এক ভাগ। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে তবে তার মায়ের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ। অসিয়ত পালনের পর, যা দ্বারা সে অসিয়ত করেছে অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের মা-বাবা ও তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্য থেকে তোমাদের উপকারে কে অধিক নিকটবর্তী তা তোমরা জান না। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা নিসা : আয়াত ১১)

কন্যা সন্তানদের প্রতিপালনে উৎসাহ দিয়ে বিশ্বনবী বলেন, ‘যে ব্যক্তি বালেগ হওয়া পর্যন্ত দুটো কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করলো সে কেয়ামতে দিন এভাবে আসবে যে, আমি এবং সে অনুরূপ হব, এই বলে তিনি তাঁর আঙ্গুল দুটো একত্রিত করলেন।’ (বুখারি)

৩. বোন হিসেবে নারীর মর্যাদা

পারিবারিক জীবনে বোন হিসেবেও নারী মর্যাদা ও দায়িত্ব অত্যধিক। বোন হিসেবে নারীর ওয়ারিশী স্বত্ব সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-

وَ لَکُمۡ نِصۡفُ مَا تَرَکَ اَزۡوَاجُکُمۡ اِنۡ لَّمۡ یَکُنۡ لَّهُنَّ وَلَدٌ ۚ فَاِنۡ کَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَکُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَکۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ وَصِیَّۃٍ یُّوۡصِیۡنَ بِهَاۤ اَوۡ دَیۡنٍ ؕ وَ لَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَکۡتُمۡ اِنۡ لَّمۡ یَکُنۡ لَّکُمۡ وَلَدٌ ۚ فَاِنۡ کَانَ لَکُمۡ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَکۡتُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ وَصِیَّۃٍ تُوۡصُوۡنَ بِهَاۤ اَوۡ دَیۡنٍ ؕ وَ اِنۡ کَانَ رَجُلٌ یُّوۡرَثُ کَلٰلَۃً اَوِ امۡرَاَۃٌ وَّ لَهٗۤ اَخٌ اَوۡ اُخۡتٌ فَلِکُلِّ وَاحِدٍ مِّنۡهُمَا السُّدُسُ ۚ فَاِنۡ کَانُوۡۤا اَکۡثَرَ مِنۡ ذٰلِکَ فَهُمۡ شُرَکَآءُ فِی الثُّلُثِ مِنۡۢ بَعۡدِ وَصِیَّۃٍ یُّوۡصٰی بِهَاۤ اَوۡ دَیۡنٍ ۙ غَیۡرَ مُضَآرٍّ ۚ وَصِیَّۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیۡمٌ حَلِیۡمٌ ﴿ؕ۱۲﴾

‘আর তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীগণ যা রেখে গেছে তার অর্ধেক, যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে। আর যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তারা যা রেখে গেছে তা থেকে তোমাদের জন্য চার ভাগের এক ভাগ। তারা যে অসিয়ত করে গেছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর স্ত্রীদের জন্য তোমরা যা রেখে গিয়েছ তা থেকে চার ভাগের একভাগ, যদি তোমাদের কোনো সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে তাহলে তাদের জন্য আট ভাগের এক ভাগ, তোমরা যা রেখে গিয়েছে তা থেকে। তোমরা যে অসিয়ত করেছ তা পালন অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর যদি মা বাবা এবং সন্তান-সন্ততি নাই এমন কোনো নারী-পুরুষ মারা যায় এবং তার থাকে এক ভাই অথবা এক বোন, তখন তাদের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের একভাগ। আর যদি তারা এর থেকে অধিক হয় তবে তারা সবাই তিন ভাগের এক ভাগের মধ্যে সমঅংশীদার হবে, যে অসিয়ত করা হয়েছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। কারো কোনো ক্ষতি না করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে অসিয়তস্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।’ (সুরা নিসা : আয়াত ১২)

মনে রাখতে হবে

পারিবারিক জীবনে নারীর প্রতি পুরুষের জন্য দেখাশোনা ও খোঁজ-খবর রাখার গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য আছে। ঠিক নারীরও রয়েছে পরিবারের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পরিবারের পরস্পরের দায়িত্ববোধ যথাযথভাবে পালনেই সংরক্ষিত হবে নারীর যথাযথ অধিকার।

মুসলিম উম্মাহর উচিত, কুরআন-সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী পারিবারিক জীবনে নারীর সব অধিকার অক্ষুন্ন রাখা। আবার নারীর জন্যও জরুরি পরিবারের দায়িত্ব পালনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। ইজ্জত-আব্রু ও সম্মান বজায় রাখা।

আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক পরিবারের সবাইকে নারীর পারিবারিক অধিকার রক্ষা করার মানসিকতা অর্জন করার তাওফিক দান করুন। পারিবারিক জীবনে নারীকেও তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এম এস, ০৮ মার্চ

Back to top button