আইন-আদালত

পিপলস লিজিংয়ের ৬৬ ঋণখেলাপিকে হাইকোর্টে তলব

ঢাকা, ০৭ মার্চ – পি কে হালদার কাণ্ডে আলোচনায় আসা অবসায়নের প্রক্রিয়ায় থাকা নন-ব্যাংকিং বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফএসএল) ৬৬ জন ঋণখেলাপিকে তলব করেছেন হাইকোর্ট।

ঋণ নিয়ে তা ফেরত দেওয়ার শর্তে আদালত থেকে সময় নেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে ঋণের অর্থ ফেরত না দিয়ে শর্ত ভঙ্গ করায় তাদের তলব করেছেন আদালত।

৬৬ ঋণখেলাপিকে তিন ভাগে আগামী ১১, ১২ এবং ১৯ এপ্রিল সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে বলে আদেশে বলা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশনায় গঠিত পরিচালনার বোর্ডের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (৭ মার্চ) বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের (কোম্পানি কোর্ট) হাইকোর্টের একক বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

কোম্পানিগুলোর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া আইনজীবী ব্যারিস্টার মেজবাহুর রহমান জানিয়েছেন, এককভাবে ৬৩ প্রতিষ্ঠানের ৬৩ জন এবং অপর একটি প্রতিষ্ঠানের (নাহার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির) চেয়ারম্যান, এমডি ও পরিচালকসহ মোট ৬৬ জনকে তলব করা হয়েছে। তবে আদালত সূত্র বলছে, ৭৭ জনকে তলব করা হয়েছে।

ব্যারিস্টার মেজবাহুর শুনানি শেষে সাংবাদিকদের জানান, ২০২১ সালের ১৩ জুলাই পিপলস লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছিলেন হাইকোর্ট। পিপলস লিজিং যেন আবারও কার্যকর হয়ে ওঠে সেজন্য পুনর্গঠিত বোর্ড চেয়ারম্যান ও সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, দুর্নীতি দমন কমিশন, পিপলস লিজিং-এর ঋণগ্রহীতাসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কয়েক দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ওইদিন (২০২১ সালের ১৩ জুলাই) আদেশে যেসব ঋণগ্রহীতারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা জমা দিতে পারেননি, তাদের টাকা জমা দেওয়ার জন্য বলেছিলেন আদালত। কিন্তু আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ওনারা কোনো টাকা জমা দেননি। তাই পরিচালনা বোর্ডের করা আবেদন শুনানি নিয়ে ঋণগ্রহীতাদের তলব করেন আদালত। আরও ঋণগ্রহীতা রয়েছেন, তাদেরও তলব করা হতে পারে বলেও জানান এ আইনজীবী।

এর আগে পি কে হালদার কাণ্ডে আলোচনায় আসা আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে পুনর্গঠন বা পুনরুজ্জীবিত করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য ১০ সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করেন হাইকোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলমকে চেয়ারম্যান করে গত ১৩ জুলাই হাইকোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক (কোম্পানি কোর্ট) ভার্চুয়াল বেঞ্চ লিখিত আদেশে বোর্ড সদস্যদের এ আদেশ দেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠিত বোর্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত ১০ সদস্যের মধ্যে চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হওয়া সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম ছাড়া অন্যান্যরা হলেন- সরকারের সাবেক সচিব আনোয়ারুল ইসলাম শিকদার, জেলা ও দায়রা জজ (অব.) হাসান শাহেদ ফেরদৌস, পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হালিম চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার (অব.) কাজী তাওফিকুল ইসলাম, এফসিএ নুর-ই খোদা আব্দুল মবিন ও মাওলা মোহাম্মাদ, প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চয়কারীদের প্রতিনিধি ডা. নাশিদ কামাল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. নুরুল কবির এবং আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ জালালুদ্দিন।

হাইকোর্টের লিখিত আদেশে বোর্ডের চেয়ারম্যানকে প্রথম সভা আহ্বান করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে অডিট রিপোর্ট তৈরি করা, আদালতের নির্দেশনাসমূহ বোর্ড সদস্যদের সামনে তুলে ধরতে এবং সবার কার্যাবলি নির্ধারণ করতে বলা হয়। এছাড়াও বোর্ড সদস্য ও আমানতকারীদের বিষয়ে পৃথক নির্দেশনা দেন আদালত।

গত বছরের ২১ জুন প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠন বা পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশনা চেয়ে ২০১ জন আমানতকারী হাইকোর্টে আবেদন জানান। সে আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২৮ জুন পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে (পিএলএফএসএল) পুনর্গঠন বা পুনরুজ্জীবিত করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য একটি বোর্ড গঠন করে আদেশ দেন হাইকোর্ট।

ওইদিন আদালতে আমানতকারীদের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আহসানুল করিম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব-উল আলম। পিএলএফএসএল-এর সাময়িক অবসায়ক (প্রবেশনাল লিক্যুইডেটর) মো. আসাদুজ্জামানের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মেজবাহুর রহমান।

ওই আদেশের ধারাবাহিকতায় বিচারপতির স্বাক্ষরের পর লিখিত অনুলিপিতে প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠিত বোর্ড সদস্যদের তালিকা প্রকাশ করেন আদালত।

১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিপলস লিজিংকে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পিপলস লিজিংকে অবসায়নের পক্ষে সম্মতি দেয় সরকার।

এরপর আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে অবসায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অবসায়ক নিয়োগের পর এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। তবে এখনই আমানতকারীরা কোনো টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।

অবসায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯ সালের জুলাইয়ে সাময়িক অবসায়ক (প্রবেশনাল লিক্যুডেটর) হিসেবে মো. আসাদুজ্জামান খানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার করা এক আবেদনের ওপর শুনানিকালে পিপলস লিজিং-এর প্রায় ৫০০ জনের বেশি ঋণগ্রহীতার একটি তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। এরপর পাঁচ লাখ টাকা এবং তার ওপরে নেওয়া ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে যারা খেলাপি হয়েছে এমন ২৮০ জনকে ২০২১ সালের ২১ জানুয়ারি তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। তাদের হাজির হয়ে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল। পরে ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তারা হাজির হয়ে নিজের ব্যাখ্যা দেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ২১ জুন ২০১ জন আমানতকারী প্রতিষ্ঠানটি অবসায়ন না করে পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেন।

সূত্র : জাগো নিউজ
এন এইচ, ০৭ মার্চ

Back to top button