জাতীয়

দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার অঙ্গীকার

মুহম্মদ আকবর

মানিকগঞ্জ, ০৬ মার্চ – সুন্দর আগামীর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে সবাইকে দেশ ও দেশের বাইরের ষড়যন্ত্র থেকে সাবধান থাকতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

গতকাল শনিবার মানিকগঞ্জের শহীদ মিরাজ তপন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ঢাকা পশ্চিমাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনমেলা ২০২২-এর দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে দেশের সূর্যসন্তানরা এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বক্তারা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে অল্প সময়ের মধ্যে উন্নয়নের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনককে নির্মমভাবে হত্যা করে। এর পর দেশ আবার উল্টোপথে যাত্রা শুরু করে। টানা ২১ বছর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ চলে এ দেশে। শুধু তাই নয়, একের পর এক হত্যা ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে জাতির জনকের কন্যার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ এগিয়ে চলেছে উন্নয়নের মহাসড়কে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে পেয়েছেন তাদের সম্মান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে পুনরায় শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার জন্যও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তারা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আবার ক্ষমতায় আসে। তারা চায়নি বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হোক। তারা তাদের সাবেক রাষ্ট্র পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান বেছে বেছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁসি দিয়েছিলেন। তাদের কোনো বিচার হয়নি। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লাশও পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়নি। জিয়া মন্ত্রী হিসেবে কাদের নিয়েছিলেন, তাও দেখার বিষয়।

সম্প্রতি বিএনপি নেতারা বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বীর মুক্তিযোদ্ধা বানানোর বিষয় সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা বলা হচ্ছে, তার ছেলে তারেক রহমানকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা বলা হচ্ছে। স্বেচ্ছায় পাক-হানাদারদের তত্ত্বাবধানে আরাম-আয়েশে থেকে কী বীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়? মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পাকিস্তানিরা যা বলে, খালেদা জিয়া এবং তার ছেলেও তাই বলে। তাই বুঝতে বাকি নেই, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন কী! মন্ত্রী বলেন, যেভাবে যুদ্ধাপরাধ, বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলাহত্যার বিচার হয়েছে, ঠিক তেমনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির মদদদাতাদেরও বিচার হবে। এটা শেখ হাসিনার পক্ষেই করা সম্ভব। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র পরিচালনা করলে দেশের অবস্থা কী হয়, তা আজ স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি।

অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন এই আয়োজনের প্রধান উপদেষ্টা ও মূল পরিকল্পনাকারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। প্রধান অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে কিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, আগামী ২৬ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিলের মধ্যে সব বীর মুক্তিযোদ্ধার হাতে ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও সনদ তুলে দেওয়া হবে। যে পরিচয়পত্রের বার- কোড রিড করলে দেশের গান ও যুদ্ধের চিত্র ভেসে উঠবে। অন্যদিকে সব মুক্তিযোদ্ধার কবর একই নকশায় করা হবে। ১০০ বছর পর দেখলেও যেন কেউ বলতে পারে, এটি মুক্তিযোদ্ধার কবর। এ সময় পুরো দেশের যুদ্ধস্থান, বধ্যভূমি ও যুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে পুরোদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধদের মিলনমেলা করারও ইঙ্গিত দেন তিনি। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন থানায় থানায় থেকে প্রস্তাব আসছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সব আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একটি ভাষণ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আর তা হলো, ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আর তোমাদের হাতে যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’।’

জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে মাত্র সাড়ে তিন বছরেই চেহারা বদলে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার পর দেশ উল্টোপথে যাত্রা শুরু করে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে কালিমা লেপন করা হয়। কখনো বলা হতো মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাংক লুট করছে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারত না। স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভুল ইতিহাস শিক্ষা দেওয়া হতো। এ সময় তিনি ঢাকা পশ্চিমাঞ্চলে যুদ্ধরত অবস্থার স্মৃতিচারণ করেন। সহযোদ্ধাদের কথা বলতে গিয়ে তৎকালীন গাজিপুর অঞ্চলে যুদ্ধরত বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ইউনিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা মোহা. নূর আলীসহ অনেকের নাম উচ্চারণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সে সময় কী দুর্বিষহ, অনিশ্চয়তায়ভরা মুহূর্ত আমাদের সামনে ছিল। দেশকে হানাদারমুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে জীবনবাজি রেখে মাইলের পর মাইল হেঁটে গেছি, যুদ্ধ করেছি। ষড়যন্ত্র ও শত্রুকে মোকাবিলা করেছি।

তিনি বলেন, ষড়যন্ত্র আজও চলছে। দেশ-বিদেশে বসে আমাদের বাংলাদেশকে অকার্যকর করার চেষ্টা চলছে। আমাদের প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ১৯ বার তার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনাকে হারাতে চাই না। তার নেতৃত্বে আমরা উন্নত বাংলাদেশ দেখতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, আজ আমি খুবই আনন্দিত দুটি কারণে। আপনাদের মাঝে আসতে পেরেছি এবং জয়বাংলা জাতীয় স্লোগান হয়েছে। ২০১৯ সালে ক্ষমতায় এসে আমি সংসদে জয়বাংলাকে জাতীয় স্লোগান করার দাবি জানিয়েছিলাম। কেন এই স্লোগানকে জাতীয় স্লোগান করা প্রয়োজন, তাও ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, আমরা রাজনীতি করি তাই জয় বাংলা বলি। কিন্তু যারা সরকারি কর্মকর্তা, তারা এটা বলে না। আমি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে, এটা কোনো দলীয় স্লোগান নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। যাই হোক পরে হলেও এটি আজ বাস্তবায়ন দেখতে পেলাম। এ জন্য আমি আনন্দিত। এ সময় তিনি অনুষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ইউনিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহা. নূর আলী সম্পাদিত এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত একটি স্মরণিকা উপস্থিত সবার মাঝে বিতরণ করা হয়। স্মরণিকায় পশ্চিম অঞ্চলের ২৭শ মুক্তিযোদ্ধার নাম ও ছবি যুক্ত করা আছে। মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ কাহিনী ও জাতির জনকের অবদানবিষয়ক কয়েকটি লেখা আছে এতে। স্মরণিকায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ঢাকা পশ্চিম অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনমেলা-২০২২-এর আহ্বায়ক ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বেনজীর আহমদের বাণী রয়েছে।

মিলনমেলায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জাল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম বলছেন খালেদা জিয়া নাকি মুক্তিযোদ্ধা। তিনি কোন জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন? কার সঙ্গে? কীভাবে? আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কাছে বলব, আপনি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ঘটনা যদি সত্য হয় তাহলে মেনে নেব। আর যদি মিথ্যা হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করার অপরাধে তার বিরুদ্ধে মামলা করুন। শুধু যুদ্ধাপরাধী নয়, ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। এক সময় শুধু মুক্তিযোদ্ধাই বলা হতো। কিন্তু বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সময় মুক্তিযোদ্ধা নামের আগে বীর শব্দটি যুক্ত হয়। আমাদের জন্ম সার্থক আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধা। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাদের দায় আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করার। সে কারণে বঙ্গবন্ধু কন্যার নির্দেশে সবসময় রাজনীতির মাঠে ছিলাম, থাকব। বিএনপি-জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ষড়যন্ত্র অতীতে যেভাবে প্রতিহত করেছি, ভবিষ্যতেও সেভাবেই করব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর বীরপ্রতীক বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়ক বা স্মৃতি স্মারক সে অর্থে হয়নি। জীবদ্দশায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের নামে সড়কের নাম দেখে যেতে পারলে শান্তি পেতেন। আমি আশা করব এ কাজটি দ্রুত হবে।

মিলনমেলায় ইউনিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহা. নূর আলী বলেন, আমি বক্তব্য দেওয়ার জন্য প্রস্তত ছিলাম না। যাই হোক, আমি তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। আমি নবাবগঞ্জের চুরাইন হাইস্কুল ছাত্রলীগের প্রথম কমিটির সভাপতি। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের দিন আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিলাম। আমাদের সুবেদ আলী টিপু ভাই, বাতেন মামাসহ অনেকেই ছিলেন। সেদিনই আমরা বুঝে ফেললাম যে, যুদ্ধই আমাদের একমাত্র অবলম্বন। আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিই। এরপর আমরা ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ শুরু করি। আমাদের সম্মুখযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে। আমি আজ সেই যুদ্ধের বিস্তারিত কিছু বলব না।

মোহা. নূর আলী আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ভাই এই মিলনমেলার জন্য আমাকে পশ্চিম অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটা অ্যালবাম তৈরির দায়িত্ব দেন। সেই অ্যালবাম এবং একটা তথ্যচিত্র করার দায়িত্ব আমি নিয়েছি। সময় খুব কম ছিল। অল্প সময়ে এই কাজটা সম্পাদন করেছি। এখানে যদি কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকে, আপনারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমরা যে অ্যালবাম করেছি, এই অ্যালবামের নাম কামাল ভাই দিয়েছেন জয়বাংলা। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন ও ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ৩টা স্লোগান ছিল- তোমার আমার ঠিকানা, পদ্ম-মেঘনা যমুনা; জয় বাংলা ও জয় বঙ্গবন্ধু। এই স্লোগানে আমরা এগিয়ে যাই।

তিনি বলেন, আমি যত দিন বেঁচে থাকব, বীর মুক্তিযোদ্ধারা যত দিন বেঁচে থাকবে, এই জয় বাংলা স্লোগান বুকে ধারণ করব। জয় বাংলার জন্য ভবিষ্যতে যা করা দরকার, তা-ই করব। আপনারা সবাই ভালো থাকুন। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময়ে কামাল ভাই (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) এই মিলনমেলা করে একটা উদাহরণ সৃষ্টি করলেন। আমি অন্তর থেকে তাকে সাধুবাদ জানাই। আমি মনে করি শুধু ২নং সেক্টরই নয়, অন্যান্য সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধারাও এই উদ্যোগকে অনুসরণ করতে পারেন।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘আপনারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বলেই আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। যুদ্ধ করেছেন বলেই দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। যুদ্ধের এই চেতনা ধরে রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতায় রাখতে হবে। তাই আসুন, সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে আগামী নির্বাচনে আবারও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনি।’

ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথার কথা তুলে ধরেন। পরে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য নিজের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার ঘোষণা দেন তিনি।

পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম বলেন, বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে আলো হাতে পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের যোগ্য সম্মান দিয়েছেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পরই বীর মুক্তিযোদ্ধারা মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার পান। আমাদের প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা যোগ্যতায়, জ্ঞানে, মেধা ও দক্ষতায় সেরা। সে কারণেই তিনি দেশ ও দেশের বাইরে এত জনপ্রিয়। সুতরাং যারা পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চায় তাদের বলি- শেখ হাসিনাকে হারানো যাবে না। নিজ গুণেই তিনি আগামীতেও প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসবেন।

স্বাগত বক্তব্যে মিলনমেলার আহ্বায়ক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বেনজীর আহমদ বলেন, ‘আমাদের সবাই চলে যাচ্ছে। তাই এই মিলনমেলার আয়োজন। আর কবে এমন মিলনমেলা হবে জানি না। তবে আমরা যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, শেখ হাসিনার পাশে ভ্যানগার্ড হিসেবে থাকব। তার জন্য দোয়া করব। কারণ তিনিই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মান দিয়েছেন।’

বিশেষ অতিথি হিসেবে অন্যদের মধ্যে শিল্প-প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য নাইমুর রহমান দুর্জয়, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম, ১৯৭১ সালে অস্থায়ী সরকারের গার্ড অব অনার প্রদানকারী মাহাবুব উদ্দীন আহমদ বীরবিক্রম, মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ লুৎফর রহমান, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান, ঢাকা পশ্চিমাঞ্চলীয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ, ঢাকা মহানগর কমান্ডার আনিসুজ্জামান আনিস প্রমুখ বক্তব্য দেন।

জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় মানিকগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠন সাংস্কৃতিক সংঘ জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। এ সময় মঞ্চে এলইডি স্ক্রিনে জাতীয় পতাকার ওয়েভ দেখানো হয়। অন্যদিকে অনুষ্ঠানে আগত অতিথি জাতীয় পতাকা ও ঢাকা পশ্চমাঞ্চলের ২১ থানার নির্বাচিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধাদের পতাকা উত্তোলন শেষে অনুষ্ঠান মঞ্চে আসেন। এ সময় শিল্পরথের শিল্পীরা গানের আবহে ফুল দিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেন। পরে শিল্পরথের শিল্পীরা লাল সবুজ পোশাক পরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবিসহ অনুষ্ঠানের আগত অতিথিদের ছবি হাতে নিয়ে ‘ও পৃথিবী এবার এসে বাংলাদেশ নাও চিনে’ শীর্ষক গানের সঙ্গে কোরিওগ্রাফিতে অংশগ্রহণ নেন। এরপর আসে ‘কালার অব হিম’ সংগঠন। তারা ‘নোঙর তোলো তোলো’ গানের আবহে নৃত্যে অংশ নেন।

খানিকটা বিরতি দিয়ে শুরু হয় পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে পাঠ। কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হেলাল উদ্দীন, গীতা থেকে পাঠ করেন লক্ষ্মী চ্যাটার্জী, ত্রিপিটক থেকে পাঠ করেন লামিনু মার্মা ও বাইবেল থেকে পাঠ করেন এডওয়ার্ড এস জামান।

এরপর অনুষ্ঠানে আসেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী এবং মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম। তিনি হাসান মতিউর রহমানের লেখা ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেতো বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ এবং ‘হায়রে বাঙালি তোরা বুঝবিরে সেদিন/শেখ হাসিনা তোদের মাঝে থাকবে না যেদিন’ গান দুটি পরিবেশনা করেন।

এরপর মুকুল নৃত্যকলা একাডেমি ৫২ থেকে ৭১ এবং ৭১ থেকে ৭৫ সালের ইতিহাসের আলোকে সমাবেত গীতিনাট্য পরিবেশন করে। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

পরে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী রফিকুল আলম, তিমির নন্দী, এম এ মান্নান, কাদেরী কিবরিয়া ও কালাম উদ্দীনসহ দেশের প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। একপর্যায়ে এলইডি স্ক্রিনে এই মিলনমেলা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য ও ছবিসহ একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এই তথ্যচিত্র সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন এই মিলনমেলার অন্যতম আয়োজক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহা. নূর আলী।

ঢাকা পশ্চিম অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনমেলায়-২০২২-এর মূল পরিকল্পনাকারী ও আহ্বায়ক কমিটির প্রধান উপদেষ্টা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। মিলনমেলার আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা বেনজীর আহমদ এমপি, প্রচার কমিটির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আজহার হোসেন, আপ্যায়ন কমিটি আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মহীউদ্দীন, অর্থ কমিটির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক চৌধুরী খসরুসহ অনেকে এই আয়োজনে যুক্ত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মহিউদ্দীন।

সূত্র : আমাদের সময়
এন এইচ, ০৬ মার্চ

Back to top button