জাতীয়

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক

অমরেশ রায় ও কামরুল হাসান

ঢাকা, ০৫ মার্চ – গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার দলীয় সংশ্নিষ্টতা আছে কি নেই, তা নিয়ে প্রধান দুই দলের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তাকে ‘বিএনপির উপদেষ্টা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিপরীতে বিএনপি বলছে, জাফরুল্লাহ চৌধুরী কখনও বিএনপির কোনো পদে ছিলেন না, এখনও নেই।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে মূলত নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে। বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো নতুন ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপে যোগ দেয়নি। সার্চ কমিটিতেও নাম জমা দেওয়া থেকে বিরত ছিল। কিন্তু সরকারের সমালোচনাকারী বলয়ের বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহ সার্চ কমিটিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আটজনের নাম জমা দেন। সেগুলো প্রকাশও করেন। নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগের পর দেখা যায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত কাজী হাবিবুল আউয়ালের নাম ডা. জাফরুল্লাহর তালিকায় ছিল।

নতুন ইসি গঠনের পর সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে এই নির্বাচন কমিশনকে মেনে নেওয়ার জন্য বিএনপিসহ সব দলের প্রতি আহ্বান জানান জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এতে জাফরুল্লাহর ওপর আরও বেশি ক্ষুব্ধ হন বিএনপির নেতারা।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ বলেন, ‘জাফরুল্লাহ চৌধুরী কার লোক? আমরা তো জানতাম তিনি খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা। গত ১০ বছর ধরেই তো তিনি খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতাদের নানা উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে আসছেন। এই অবস্থায় জাফরুল্লাহ যদি কোনো নাম দেন, সেই নামটা বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া হয় না? আসলে দলের উপদেষ্টা জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মাধ্যমে নাম প্রস্তাব বিএনপির এক ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি।’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন কমিশনে নাম প্রস্তাবসহ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্য বিএনপির নয়। তিনি বিএনপির কেউ নন। এটা তার নিজস্ব মন্তব্য। জাফরুল্লাহ সবার শ্রদ্ধার পাত্র ও জ্ঞানী মানুষ। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি বিএনপির পক্ষে কথা বলার কেউ নন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্বে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামসহ কয়েকটি দল নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির কেউ নন। দেশের একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে তিনি অনেক কিছুই বলতে পারেন। এটা সম্পূর্ণই জাফরুল্লাহর বিষয়। এখানে বিএনপির মাথ্যব্যথার কিছু নেই।

আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের বিষয়ে আমীর খসরু বলেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিভিন্ন সময় সরকারকে যেসব উপদেশ দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন তা কেন মানছে না আওয়ামী লীগ? আওয়ামী লীগ নেতারা ডা. জাফরুল্লাহকে বিএনপির উপদেষ্টা উল্লেখ করে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ।

তবে জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেই এক ব্যক্তিত্ব, তিনি ‘কারও লোক’ হোন বা না হোন, রাজনীতির মাঠে নতুন এই ইস্যুটি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকরা বলছেন, জাফরুল্লাহ কার লোক, সেটা বিএনপিই ঠিক করবে।

এই জোটের কোনো কোনো শরিক দল অবশ্য জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ইস্যুকে রাজনীতির মাঠে একেবারেই ‘অপ্রয়োজনীয় ইস্যু’ মনে করছে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের এ নিয়ে মন্তব্য করা কিংবা খোঁচাখুুঁচি করা নিছকই সময় নষ্টের শামিল।

১৪ দলের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির হোক অথবা না হোক, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে রাজনীতি করছেন। মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তান পন্থার লোকজনের সঙ্গেই ওঠাবসা করেন। সুতরাং জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আমি সেভাবেই মূল্যায়ন করব।’

অন্যদিকে বিএনপির জোটের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা দলগুলো মনে করছে, জাফরুল্লাহর সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে- এমনটা এখনও বলার সময় হয়নি। যেটুকু দৃশ্যমান দেখা যাচ্ছে, তা অচিরেই ঠিক হয়ে যাবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, লড়াই যখন শুরু করেছি, সেই লড়াইয়ের মাধ্যমে যাতে জনগণের অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, সেজন্য জাফরুল্লাহর পরামর্শ নিতে হবে। বিএনপিকে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে সেটা ধারণ করার ক্ষমতা রাখতে হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমি কখনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। কখনও কোনো পদেও ছিলাম না। আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলছেন তা না জেনেই বলছেন। এটা তাদের অপরাজনীতি।’

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির ‘বয়কট’ এবং তার সঙ্গে দলটির সম্পর্ক না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ‘আমি থাকলে বিএনপি নেতারা অনুষ্ঠানে আসবেন না বা আমাকে বর্জন করবেন, সেটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না। বিএনপি তাদের ভুল বুঝতে পারছে না। অনুধাবন করতে পারছে না, কে তাদের বন্ধু আর কে শত্রু।’

সূত্র : সমকাল
এন এইচ, ০৫ মার্চ

Back to top button