জাতীয়

এক বছরে ৮ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে ১২ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র

ঢাকা, ০৪ মার্চ – দেশের শীর্ষ ১২ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আট হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েছে। এটা ওই অর্থবছরের মোট ক্যাপাসিটি চার্জের ৬৬.৪ শতাংশ। তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ৬৫০০ মেগাওয়াট।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনাবিষয়ক কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সামিট, ইউনাইটেড গ্রুপ, বাংলা ট্র্যাক, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এপপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) এবং ওরিয়ন গ্রুপের। চুক্তি অনুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ না কিনলে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে যে অর্থ পরিশোধ করতে হয় তাই ক্যাপাসিটি চার্জ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করেছে। এটা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২১.২ শতাংশ বেশি। এর ফলে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে পিডিবির আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের চেয়ে ৫৪.৫ শতাংশ বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিদ্যুতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক। দেশের এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে এবং বসে বসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে টাকা আদায় করা এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অর্থনীতির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অলস রেখে সরকার কোম্পানিগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে আসছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে বিশাল ভর্তুকির বোঝা বহন করতে হচ্ছে।

বিডব্লিউজিডির রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কোটি কোটি টাকা খরচ করা অব্যাহত রাখলে এ খাতে ব্যয় বাড়তেই থাকবে এবং তা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে প্লান্ট লোড ফ্যাক্টর অন্তত ৭০ শতাংশ নিশ্চিত করার জন্য রিপোর্টে সুপারিশ করা হয়। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষরের সময় ৮০ শতাংশ লোড ফ্যাক্টর নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানের ৪১.৮৮ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে উৎপাদন ক্ষমতা অব্যবহূত পড়ে আছে। এটা ব্যয়ের বোঝা বাড়ানো ছাড়া ভোক্তাদের আর কোনো কাজে আসছে না বলে প্রতিবেদনে বলা হয় ৷

এতে আরও বলা হয়, গত বছর সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৩ হাজার ৭৯২ মেগাওয়াট, যা ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের চেয়ে ৮.৩ শতাংশ বেশি। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে উৎপাদন সক্ষমতা ২২ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছে গেছে, যা গত বছরের চেয়ে ৮.১ শতাংশ বেশি। এ বছর আট হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহূত অবস্থায় ছিল। অন্যদিকে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ৮০ হাজার ৪২২ মিলিয়ন ইউনিটে উন্নীত হয়েছে, যা ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের চেয়ে ১২.৬ শতাংশ বেশি। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মাত্র ১৫৩ দিন চলমান ছিল এবং ২১২ দিন অলস বসে ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এত বিশাল ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করার পরও সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৪৯ হাজার ৩৯২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরও ৪৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। এর অধিকাংশই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যদিও পেট্রোবাংলা বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ৫৫.৩ শতাংশ সরবরাহ করতে সক্ষম।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে ২০২৫-২০৩০ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকবে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পেছনের দিকে টানবে।

জানতে চাইলে কন্যজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে পছন্দের ব্যবসায়ীদের। চাহিদা না থাকায় উচ্চমূল্যের এসব কেন্দ্রের মালিককে বসিয়ে বসিয়ে টাকা দিচ্ছে সরকার। এসব প্রকল্প দেওয়া হয়েছে দরপত্র ছাড়া বিশেষ আইনে। পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই অনিয়ম হয়েছে, যার দায় গুনছেন গ্রাহকরা। প্রতিবেদনে অব্যবহূত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিয়ে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’ নীতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৪৩ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে বিডব্লিউজিইডি। এর কোনো সরকারি নিবন্ধন কিংবা নিজস্ব কার্যালয় নেই। তবে বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত বিষয়ে সরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে এ জোট।

সূত্র: সমকাল
এম ইউ/০৪ মার্চ ২০২২

Back to top button