ইউরোপ

ইউক্রেন যুদ্ধের খবর যেভাবে পাওয়া যাচ্ছে রাশিয়ার টেলিভিশনে

মস্কো, ০৩ মার্চ – গত বৃহস্পতিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সামরিক অভিযান ঘোষণার কয়েক মিনিট পরেই ইউক্রেনে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে রুশ সেনারা। এরপর থেকে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এদিকে যুদ্ধের অষ্টম দিনেও ইউক্রেনে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এদিন ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের তিন স্কুল ও এক উপাসনালয়ে হামলা চালায় রুশ সেনারা।

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের খবর সঠিকভাবে রাশিয়ার টেলিভিশনে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রাশিয়ার টেলিভিশন দর্শকরা এই যুদ্ধের হালচাল বুঝতে পারছেন না। রাশিয়ার প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ক্রেমলিন বা তাদের ঘনিষ্ঠ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব চ্যানেলে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ গত মঙ্গলবার (১ মার্চ) যুদ্ধের কী ধরনের খবরাখবর পেয়েছেন, তার একটি খণ্ডচিত্র প্রকাশ করা হল :

বিবিসি ওয়ার্ল্ড টেলিভিশনের বুলেটিন যখন শুরু হচ্ছে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের টিভি টাওয়ারে হামলার খবর দিয়ে, তখন রুশ টেলিভিশনের খবরে বলা হচ্ছিল যে নানা শহরে এসব হামলার জন্য ইউক্রেন নিজেই দায়ী।

রাশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি টেলিভিশন হচ্ছে সরকারি মালিকানাধীন ‘চ্যানেল ওয়ান।’ প্রতিদিন সকালে এই চ্যানেলে ‘গুড মর্নিং’ বলে যে অনুষ্ঠানটি হয়, সেটি অন্য যে কোন দেশের টেলিভিশনে সকালের অনুষ্ঠানের মতো বলেই মনে হবে – এটি সংবাদ, সংস্কৃতি এবং হালকা বিনোদনের মিশ্রণে তৈরি একটি অনুষ্ঠান।

তবে মঙ্গলবার এই অনুষ্ঠানে মস্কো সময় সকাল সাড়ে পাঁচটায় উপস্থাপক ঘোষণা দিলেন, তাদের অনুষ্ঠানসূচীতে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে কিছু ঘটনার জন্য, ফলে আরও বেশি করে খবর এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থাকবে অনুষ্ঠানে। যেসব খবরাখবর অনুষ্ঠানে প্রচার করা হলো, তাতে ধারণা দেয়া হলো যে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করেছে বলে যেকথা বলা হচ্ছে, তা মিথ্যে এবং তা ‘আনাড়ি দর্শকদের’ বিভ্রান্ত করার চেষ্টা।

“ইন্টারনেটে যেসব ফুটেজ ক্রমাগত ছড়ানো হচ্ছে সেগুলোকে ভুয়া ছাড়া আর কিছু বলে বর্ণনা করা যায় না,” বলছিলেন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। আর তখন দর্শকদের দেখানো হচ্ছিল এমন কিছু ছবি, যেগুলো নাকি ‘ ভার্চুয়াল জালিয়াতির’ মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।

আরও পরে মস্কো সময় সকাল আটটার দিকে আমরা আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি’র সকালের বুলেটিন শুনছিলাম। এটির মালিক ক্রেমলিনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিশাল কোম্পানি গ্যাজপ্রমের একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান। এটি কেবলমাত্র ডনবাস অঞ্চলের খবর দিচ্ছিল, যেটি ইউক্রেনের পূর্বদিকে। গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া যখন তাদের ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল, তখন সেটি কিন্তু এই অঞ্চলেই শুরু করার কথা বলা হয়েছিল। এই অভিযান শুরুর লক্ষ্য নাকি ছিল ‘ইউক্রেনের বেসামরিকীকরণ’ এবং ‘নাৎসিদের নির্মূল’ করা।

রোসিয়া ওয়ান এবং চ্যানেল ওয়ান রাশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি চ্যানেল – তবে দুটিই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। এই দুটি চ্যানেলের খবরে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ডনবাস অঞ্চলে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হচ্ছিল। রোসিয়া ওয়ানের একজন উপস্থাপক বলেন, “ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষের জন্য হুমকি আসছে ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদীদের দিক থেকে, রাশিয়ার বাহিনীর দিক থেকে নয়।”

“ওরা বেসামরিক মানুষকে মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে, তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের সামরিক অস্ত্রশস্ত্র আবাসিক এলাকায় মোতায়েন করছে এবং ডনবাস অঞ্চলের শহরগুলোতে গোলা দাগছে।”

চ্যানেল ওয়ানের উপস্থাপক ঘোষণা করলেন যে, ইউক্রেনের বাহিনী ‘আবাসিক ভবনে গোলা হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে’ এবং তারা গুদামঘরে অ্যামোনিয়া দিয়ে বোমা হামলা চালাতে চায় – এটি তারা করছে বেসামরিক লোকজন এবং রাশিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়ার উদ্দেশ্যে।

ইউক্রেনে যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো এখানে যুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে না। তার পরিবর্তে একে বর্ণনা করা হচ্ছে “অসামরিকীকরণের” একটি পদক্ষেপ হিসেবে, যার অংশ হিসেবে সামরিক স্থাপনা টার্গেট করা হচ্ছে।

এদিকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘রসকোমনাডযর’ এরই মধ্যে টিকটককে নির্দেশ দিয়েছে রাজনৈতিক বা সামরিক বিষয় সম্পর্কিত ভিডিও যেন অপ্রাপ্তপবয়স্কদের কাছ থেকে সরিয়ে রাখা হয়। এছাড়া তারা গুগলের কাছেও দাবি জানিয়েছে সেই সব কনটেন্ট সরিয়ে নিতে, যেখানে রুশ সেনাবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে মিথ্যে তথ্য আছে। তারা টুইটার এবং ফেসবুকের ওপরও নানা রকম বিধিনিষেধ জারির চেষ্টা করছে।

তারা রাশিয়ার গণমাধ্যমকে নির্দেশ দিয়েছে রুশ অভিযানের সংবাদ পরিবেশনের সময় যেন কেবলমাত্র রাশিয়ার সরকারি সূত্র থেকে পাওয়া খবর দেয়া হয়। একই সঙ্গে রাশিয়ার অভিযানকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ বা ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা না করার জন্যও বলা হয়েছে গণমাধ্যমকে। যারা এই নির্দেশ অমান্য করবে তাদেরকে জরিমানা করা বা নিষিদ্ধ করার হুমকি দেয়া হয়েছে।

সূত্র : আরটিভি
এম এস, ০৩ মার্চ

Back to top button