যেসব কারণে ইউক্রেনে সৈন্য পাঠাতে চান না মার্কিন প্রেসিডেন্ট

ওয়াশিংটন, ২৬ ফেব্রুয়ারি – রাশিয়া-ইউক্রেনের সংঘাতে মার্কিন সেনারা কখনোই জড়াবে না বলে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে আগ্রাসন ঠেকাতে বিপুল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।
হোয়াইট হাউস থেকে বাইডেন বলেন, আমাদের বাহিনী ইউক্রেনে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতে জড়িত নয় এবং ভবিষ্যতেও জড়িত থাকবে না। ইউক্রেনের হয়ে যুদ্ধ করতে আমাদের সেনারা ইউরোপ যাবে না।
রাশিয়ার আগ্রাসন যে আসন্ন, অবিরাম তার হুঁশিয়ারি প্রচার করে গেছে তার প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত তাদের হুঁশিয়ারি সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
কিন্তু বাইডেন কেন মার্কিন সেনাদের যুদ্ধ করতে পাঠাবেন না বলে একটা ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমারেখা টেনে দিচ্ছেন? যা উঠে এসেছে বিবিসির এক বিশ্লেষণে। তা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-
কোন জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ নেই
ইউক্রেন আমেরিকার ধারে-কাছের কোন দেশ নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী কোন দেশ নয়। আর ইউক্রেনে আমেরিকার কোন সামরিক ঘাঁটিও নেই। ইউক্রেনের এরকম বিশাল তেলের মওজুদ নেই, যেখানে তাদের কোন কৌশলগত স্বার্থ থাকতে পারে। আর ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সেরকম বড় কোন বাণিজ্যিক অংশীদারও নয়।
কিন্তু এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা এমন অনেক যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যেখানে তারা অন্যদেশের পক্ষে অনেক রক্ত এবং সম্পদ ক্ষয় করেছেন। ইয়োগোশ্লাভিয়া ভেঙ্গে যাওয়ার পর যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, ১৯৯৫ সালে সেই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন। ২০১১ সালে লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে একই কাজ করেছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, তবে এটি তিনি করেছিলেন মানবিক বিবেচনা এবং মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে।
১৯৯০ সালে ইরাক যখন কুয়েত দখল করে নিল, তখন সেখানে যুদ্ধে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ তখন ‘জঙ্গলের আইনের’ বিরুদ্ধে আইনের শাসনের কথা বলে এই যুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা যখন শান্তি এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার নীতিকে রাশিয়া কীভাবে হুমকিতে ফেলছে, সেকথা বলছিলেন, তখন প্রায় একই ধরণের ভাষা ব্যবহার করেছেন। তবে রাশিয়ার এই হুমকি মোকাবেলায় কোন সামরিক অভিযানের কথা তারা বলছেন না, পরিবর্তে তারা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাশিয়ার অর্থনীতি পঙ্গু করে দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
সামরিক হস্তক্ষেপের নীতিতে বিশ্বাসী নন বাইডেন
প্রেসিডেন্ট বাইডেন সামরিক হস্তক্ষেপের নীতিতে বিশ্বাসী নন। তবে বলতেই হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন এরকম একটা অবস্থানে উপনীত হয়েছেন অনেক পথ ঘুরে। ১৯৯০ এর দশকে বলকান অঞ্চলে যে জাতিগত যুদ্ধ চলছিল, তখন সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ তিনি সমর্থন করেছিলেন। আমেরিকার জন্য দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি নিয়ে এসেছিল ইরাকের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, ২০০৩ সালের সেই যুদ্ধেও তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর হতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে বেশ অনাগ্রহী হয়ে উঠেন।
প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন। আফগানিস্তানের যুদ্ধে জেতার জন্য সেখানে বিপুল সংখ্যায় মার্কিন সেনা পাঠানোর নীতির বিরুদ্ধেও তিনি অবস্থান নেন। গত বছর তিনি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা এবং মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়ার পরও তিনি শক্তভাবে নিজের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে গেছেন।
বাইডেন প্রশাসনের শীর্ষ কূটনীতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিনকেন গত বিশ বছর ধরে জো বাইডেনের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি প্রেসিডেন্টের খুবই ঘনিষ্ঠ এবং আস্থা-ভাজন, মনে করা হয় বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি তার হাতেই তৈরি। মিস্টার ব্লিনকেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বলতে এখন বেশি গুরুত্ব দেন জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলা, বিশ্বে রোগ-ব্যাধি-মহামারির সঙ্গে লড়াই করা এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে। সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে সেই তুলনায় অত গুরুত্ব পাচ্ছে না।
আমেরিকানরাও আর যুদ্ধে যেতে চাইছে না
সাম্প্রতিক এক জরিপে (এপি-এনওআরসি’র পরিচালিত) বলা হচ্ছে, ৭২ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের কোন ভূমিকাই নেয়া উচিৎ নয়, বা নিলেও সেটা হওয়া উচিৎ খুব গৌণ।
মার্কিন জনগণ এখন তাদের নিজেদের পকেটের অবস্থা নিয়েই বেশি চিন্তিত। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়েই তাদের উদ্বেগ বেশি। প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে এটাই বেশি মাথায় রাখতে হচ্ছে, কারণ সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তবে ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের দুই দিকের আইন-প্রণেতারাই এখন এই সংকট নিয়ে ব্যস্ত। তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু একেবারে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কট্টরপন্থী বলে যারা পরিচিত, যেমন রিপাবলিকান সেনেটর টেড ক্রুজ, তারাও চান না আমেরিকা যুদ্ধ করতে ইউক্রেনে সৈন্য পাঠাক বা ‘পুতিনের সঙ্গে গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ুক।’
আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী আরেকজন রিপাবলিকান সেনেটর মার্কো রুবিও একই অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বের দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ কারও জন্যই ভালো হবে না।
দুটি পরাশক্তির মধ্যে যুদ্ধের বিপদ
এই সংকটে এটাই আসলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ- প্রেসিডেন্ট পুতিনের পরমাণু অস্ত্রের মওজুদ।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন একথা এরই মধ্যে খোলাখুলি বলেছেন, ইউক্রেনে রুশ আর মার্কিন সেনারা পরস্পরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে একটি বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করুক, সেটা তিনি চান না।
“এখানে তো আমরা কোন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের মোকাবেলা করছি না”, এ মাসের শুরুতে এনবিসি টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন। “আমরা এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এক সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করছি। এটি খুবই কঠিন এক পরিস্থিতি, এবং পরিস্থিতি কিন্তু যে কোন সময় বিপদজনক মোড় নিতে পারে।”
কোন চুক্তির দায় নেই
আর ইউক্রেনের সঙ্গে আমেরিকার এমন কোন চুক্তিও নেই যে, তাদের এরকম একটা লড়াই শুরুর ঝুঁকি নিতে হবে। নেটো সামরিক চুক্তির আর্টিকেল পাঁচে বলা আছে, যে কোন সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ সব দেশের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করা হবে, এবং চুক্তি-বলে প্রত্যেক দেশ আক্রান্ত দেশকে রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু ইউক্রেন নেটোর সদস্য নয়। তাদের বেলায় সেরকম কোন দায় নেই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিনকেন একথা উল্লেখ করেই বলেছিলেন, কেন তারা যেসব নীতি এবং মূল্যবোধের কথা এত জোর গলায় বলেন, সেই মূল্যবোধ এবং নীতি রক্ষায় যুদ্ধ করতে চান না।
তবে এখানে একটা পরিহাস আছে- ইউক্রেনকে ঘিরে এই সংঘাতের মূলে রয়েছে প্রেসিডেন্ট পুতিনের একটা দাবি- ইউক্রেন যেন নেটো সামরিক জোটে যোগ দিতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা। অথচ নেটো আবার সেই নিশ্চয়তা দিতে চাইছে না।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রবক্তা স্টিফেন ওয়াল্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং নেটো যে এরকম নিশ্চয়তা দিতে চাইছে না, তার কোন মানে হয় না। কারণ তারা তো সামরিক শক্তি নিয়ে ইউক্রেনের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেও না।
সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল
এন এইচ, ২৬ ফেব্রুয়ারি









