চট্টগ্রাম

একবছরে রেজাউলের চমক শুধু আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

চট্টগ্রাম, ১৫ ফেব্রুয়ারি – মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক হেভিওয়েট নেতাকে পেছনে ফেলে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বাগিয়ে চমক দেখিয়েছিলেন রেজাউল করিম চৌধুরী। নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালনের একবছর ‘রুটিন ওয়ার্কে’র মধ্য দিয়ে পার করলেও আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এনে তাক লাগাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তবে বর্ধিত স্থাপনার জন্য বর্ধিত হারে গৃহকর আদায়ের সিদ্ধান্ত এবং উন্মুক্ত খাল-নালায় পড়ে মৃত্যু নিয়ে মানুষের মধ্যে অস্বস্তিও তৈরি করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রেজাউল করিম চৌধুরীর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের একবছর পূর্ণ হচ্ছে। নির্বাচনের আগে দেওয় রেজাউলের ৩৭ দফা প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতা নিয়ে এখন নগরবাসীর মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে প্রায় একবছর পিছিয়ে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়েছিল। ১১ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন তিনি। ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা রেজাউল এখন ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন।

গত ৪ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চট্টগ্রাম নগরীর সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নে আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়। প্রকল্পটির অধীনে চট্টগ্রাম নগরীর ৭৬৯ কিলোমিটার রাস্তা উন্নয়ন, বিমানবন্দর সড়কে ৬০০ মিটার ওভারপাস নির্মাণ, ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ, ১৪টি ব্রিজ, ২২টি কালভার্ট এবং ১০টি গোল চত্বর নির্মাণ করা হবে।

মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী একসঙ্গে আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দকে চসিকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হিসেবে উল্লেখ করে ‍কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর একটি সড়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে করার ঘোষণা দেন।

ওমরাহতে যাওয়ার আগে মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘অনুমোদিত আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নগরীর সড়কে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।’

তবে এর আগে চসিক নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছিলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে চসিকের সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পথ অনুসরণ করবেন তিনি। গৃহকর না বাড়িয়ে আয়বর্ধক প্রকল্প গ্রহণ করে নগরীর উন্নয়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি জটিলতা কাটিয়ে বর্ধিত হারে গৃহকর আদায়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে চসিক। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। তবে মেয়র বারবার বলছেন, কোনোভাবেই বিদ্যমান গৃহকর বাড়ানো হবে না, শুধুমাত্র করের আওতা বাড়ানো হবে।

নগরবাসী বলছেন, চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে— চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দু’টি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি। সমন্বয়ের ভিত্তিতে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা মেয়র দিলেও একবছরে তিনি সব সংস্থাকে ‘এক করতে’ পারেননি।

এ অবস্থায় গত বছরের ২৫ আগস্ট নগরের মুরাদপুরে জলাবদ্ধতায় সড়ক-খাল একাকার হয়ে গেলে তাতে পড়ে নিখোঁজ হন সবজি ব্যবসায়ী সালেহ আহমেদ। এখনো তার খোঁজ মেলেনি। সালেহ আহমেদসহ খাল-নালায় পড়ে গতবছর মারা গেছেন শিশুসহ পাঁচ জন। নগরবাসীর তীব্র ক্ষোভের মুখে মেয়র রেজাউল খাল-নালায় প্রতিবন্ধক না দিয়ে উন্নয়ন কাজ করায় সিডিএ’র কঠোর সমালোচনা করেন।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখছেন না চট্টগ্রাম নগরবাসী। বরং সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের চালু করা ‘ডোর টু ডোর’ কার্যক্রমে ভাটা পড়ার অভিযোগ আছে। দিনের বেলায় ময়লা অপসারণ কাজ নগরবাসীর ভোগান্তিও তৈরি করেছে। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর নালায় পড়ে প্রাণ হারান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী শেহেরীন মাহমুদ সাদিয়া। নালা থেকে একটন আবর্জনা সরিয়ে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ৭ ডিসেম্বর নালায় পড়ে প্রাণ হারানো শিশু কামাল উদ্দিনকে উদ্ধারে নেমে নালা থেকে প্রায় ৫০ টন আবর্জনা অপসারণ করতে হয়েছে।

তবে চট্টগ্রাম নগরীর কাঁচাবাজারগুলোকে পলিথিনমুক্ত করতে কোমর বেঁধে নেমেছেন মেয়র রেজাউল এবং চসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, যে উদ্যোগটি প্রশংসা পাচ্ছে সব মহলে।

আগের মেয়রের মেয়াদের অকার্যকর ওষুধ ছিটিয়ে মশা মারতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে মেয়র রেজাউলকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় সেই ওষুধ অকার্যকর প্রমাণ হয়েছে। নতুন ওষুধ কেনার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই মেয়রের বছর পার হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর এক হাজার ৪১০ কিলোমিটার পাকা সড়কের মধ্যে প্রধান সড়কগুলোর অবস্থা ভালো। তবে অলিগলিতে অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর বেহাল দশা। প্রধান কয়েকটি সড়কও ছোট-বড় গর্তে ভরা। শীত মৌসুম শেষ হতে চললেও সেগুলোর সংস্কার শেষ করতে পারেনি চসিক।

ফুটপাতে ২৫৮টি দোকান নির্মাণের অনুমতি দিয়ে সমালোচিত হয়েছেন চসিক মেয়র। সড়ক বাতি নিয়ে ক্ষোভ আছে খোদ কাউন্সিলরদের মধ্যে।

তবে সৌদি আরবে যাওয়ার আগে মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী একবছরে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে ৮০ ভাগ সফল দাবি করেছেন।

সূত্র : সারাবাংলা
এন এইচ, ১৫ ফেব্রুয়ারি

Back to top button