শিক্ষা

অনিয়মে ডুবতে বসেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর

আসিফ কাজল

ঢাকা, ১১ ফেব্রুয়ারি – টানা চার বছর ধরে নেই নতুন প্রকল্প। আগের প্রকল্পগুলোরও মেয়াদ বাড়িয়ে দফায় দফায় হচ্ছে দুর্নীতি। এই টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে কেন্দ্র থেকে মাঠ প্রশাসনে বাড়ছে টানাপোড়েন। নিয়ম লঙ্ঘন করে শীর্ষ কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন আছেন প্রধান কার্যালয়ের পদ আকড়ে। ফলে সময়মতো মিলছে না বদলী ও পদোন্নতি।

এমন বিশৃঙ্খলা চলছে সরকারের গুরত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি)। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রকল্পে অস্বচ্ছতা, গাফিলতি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা, জনবল ঘাটতি, দুর্নীতিসহ নানা কারণে ইইডিতে অস্থিরতা নেমে এসেছে।

দেশের সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মসূচি বাস্তবায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষাখাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা-ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)। প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি, দরপত্র আহ্বানও করে থাকে সরকারি এ দপ্তর। এসব কাজে ইইডির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ বহু পুরনো।

ইইডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে ছোট-বড় ৬০-৬৫টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। যার বেশিরভাগেরই মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া বড় একটি প্রকল্প ৩২৯ উপজেলায় কারিগরি স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন। যার বরাদ্দ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে। প্রথম ধাপে ১০০টি উপজেলায় ১০০টি টিএসসি নির্মাণ কাজ শুরু হয় ওই বছরেই। শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০২১ সালের জুনে।

ইইডি বলছে, নির্ধারিত সময়ে মাত্র ৩৬টি টিএসসির কাজ শেষ হয়েছে। অন্যগুলোর কাজ এখনো ৩০-৪৫ শতাংশ বাকি রয়েছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

ইইডির অধীনে আরেকটি বড় প্রকল্প হলো, সারাদেশে ১ হাজার ৮০০ মাদ্রাসা উন্নয়ন। যার বরাদ্দ ৬ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিলো গত বছর।

কিন্তু ইইডি বলছে, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৫০ শতাংশ। অর্থ ছাড় করা হয়েছে, মাত্র ৩০ শতাংশ। সময় মতো টাকা না পাওয়ায় ঠিকাদারদের সঙ্গে ইইডির মাঠ কর্মকর্তাদের টানাপোড়েন চলছে।

ইইডি জানিয়েছে, প্রকল্পটির মেয়ার ২ বছর বাড়ানোর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।

ইইডির প্রধান কার্যালয়ের একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েক দফায় ডিজাইন পরিবর্তনের কারণে ইইডির প্রকল্পে অচলাবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকল্প নেয়ার আগে ইইডি সম্ভব্যতা যাচাই করতে না পারায় এই সঙ্কট বেড়েছে। একইসঙ্গে ডিজাইন ও ড্রয়িং বিভাগে জনবল ঘাটতির কারণে ভোগান্তি হচ্ছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী আরিফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শিক্ষা সচিবের দোহায় দিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

অপারগতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, শিক্ষা সচিবের অনুমতি ছাড়া আমি কোনো কথা বলতে পারবো না।

নিখুঁত দুর্নীতির উৎস ডিজাইন

সম্প্রতি গাজীপুরের একজন ঠিকাদার ইইডিতে এসেছিলেন প্রকল্পের ডিজাইন পরিবর্তনের অভিযোগ নিয়ে। ওই ঠিকাদার বলেন, ইইডির মাঠ প্রশাসন ইচ্ছেমাফিক চলে। ঠিকাদারদের সঙ্গে সমন্বয় না করেই বার বার অবকাঠামোর স্ট্রাকচার পরিবর্তন করে। ডিজাইন পেতে হয়রানি করা হয়। এ নিয়ে ঠিকাদার-প্রকৌশলী দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে বলেন জানান তিনি।

প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প নেয়ার আগে ইইডি সম্ভব্যতা যাচাই করতে পারে না। পরিকল্পনা কমিশনও এ ব্যাপারে ইইডিকে সহযোগীতা করে না। ফলে একটি ডিজাইন ধরে প্রকল্প নেয় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্ত মাঠ পর্যায়ে ওই ডিজাইন অনেক সময় কাজে আসে না। বেশির ভাগ জায়গায় ঠিক থাকে না। এ থেকে শুরু হয় দুর্নীতি ও ভোগান্তি।

এ বিষয়ে এক প্রকৌশলী বলেন, ১৮০০ মাদ্রাসা প্রকল্পে দেখা গেছে ডিজাইন অনুযায়ী বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে জায়গা নেই। নিয়ম অনুযায়ী এটি সংশোধন করে মন্ত্রণালয়ে দেয়ার কথা থাকলেও সেটি হয় খুবই সামান্য। কাটছাঁট করে ভবন নির্মাণ করা হয়। এই টাকা স্ব স্ব জেলার প্রকৌশলীদের পকেটে যায় বলেও জানান তিনি।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রকল্প নেয়ার সময় ইইডি অতিরিক্ত হিসেব দেখায়। যে টাকা বরাদ্দ আসে তার বড় অংশ দুর্নীতি হয় কিন্তু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। কারণ ইইডি প্রস্তাবিত প্রকল্পে উল্লেখ থাকে সম্ভব্যতা যাচাই করে যেন এটি পাস করা হয়। যেহেতু পরিকল্পনা কমিশন এটি করতে পারে না ফলে পুরো ব্যাপারটিই অন্ধকারে থেকে যায়।

এ বিষয়ে ইইডির পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) রাহেদ হোসেন বলেন, অবকাঠামোর উপরের অংশ ঠিক থাকে তবে মাটির নিচে অনেক পরিবর্তন আসে একথা সঠিক। এটা মাটির অবস্থার কারণে হয়। এক্ষেত্রে দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করেননি তিনি।

প্রধান কার্যালয়ে শেকড় গেড়েছেন কর্মকর্তারা

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কর্মকর্তাদের তিন বছরের বেশি একই স্থানে থাকার সুযোগ নেই। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি সুযোগ রয়েছে। তবে ইইডিতে এই বিশেষ পরিস্থিতি না থাকা সত্বেও শীর্ষসারির কর্মকর্তারা বছরের পর বছর একইপদে বসে আছেন। ফলে বেড়েছে দুর্নীতি। নিজেদের বদলী ঠেকাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও তববীর বাণিজ্যে লিপ্ত এসব কর্মকর্তারা। কারণ দীর্ঘদিন একইপদে থাকায় তারা দুর্নীতির শেকড় গেড়েছেন বলে খোদ কর্মকর্তারাই অভিযোগ করছেন।

প্রতিবেদকের হাতে ইইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি তালিকা রয়েছে। ঢাকার শিক্ষা ভবনে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে প্রকৌশলীসহ প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। দেখা যায়, উপ-পরিচালক (প্রশাসন) আসাদুজ্জামান ছয় বছর ধরে প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। একই সঙ্গে তিনি অর্থ প্রশাসনেরও অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল হাসেম সরদার ও জয়নাল আবেদীন আট বছর, সহকারী প্রকৌশলী সুমী দেবী সাড়ে সাত বছর, জাফর আলী সিকদার ১১ বছর ধরে প্রধান কার্যালয়ে রয়েছেন। জাফর আলী সিকদার ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।

ঢাকা জোনে সহকারী প্রকৌশলী মনিরা বেগম ১৩ বছর। উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক সাড়ে পাঁচ বছর। ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সভাপতি সহকারী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম সাত বছরের বেশি প্রধান কার্যালয়ে রয়েছেন।

এছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম, সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা দেওয়ান মো. লোকমান হোসেনসহ অনেক কর্মকর্তা এক যুগের বেশি প্রধান কার্যালয় ও ঢাকা অঞ্চলে পদ আকড়ে আছেন। এই কর্মকর্তারা, ঘুষ, তদবীর ও কমিশন বাণিজ্যেও জড়িয়ে পড়েছেন বলে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছুঁড়ছেন।

এ বিষয়ে পরিচালক ( উপ-সচিব) রাহেদ হোসেন বলেন, ইইডির মোট পদ ৩ হাজার ১৭৪টি। বিপরীতে কর্মরত মাত্র সাড়ে আটশো জন। এতো কম জনবল নিয়ে কাজ করা কঠিন। তবে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় বদলী হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

আবুল হাসেম একাই ২৫ প্রকল্পের পরিচালক

বিধি অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মকর্তা একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হতে পারেন না। এমনকি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে। অথচ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী একাই ২৫টি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন যার নাম মো. আবুল হাসেম সরদার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন ব্যক্তি যদি ২৫ প্রকল্পের পরিচালক হন, তখন প্রকল্পগুলো কাজের গতি হারায়। বেড়ে যায় দুর্নীতি। তবে একজন ব্যক্তির ২৫ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন।

মাঠ প্রশাসনে দুর্নীতির অভিযোগ

সম্প্রতি গাজীপুর জেলা ও ঢাকা মেট্রো এলাকার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) অনুপ রায়ের বিরুদ্ধে কার্তিক চন্দ্র রায় নামে একজন ঠিকাদার ইইডিতে অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগে তিনি বলেছেন, অনুপ চন্দ্র রায় ব্যক্তিগত লোক দিয়ে ঠিকাদারদের থেকে চাঁদা তোলেন। চাঁদা না পেলে লোক পাঠিয়ে খারাপ ব্যবহার করেন।

ইইডির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, অনুপ রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণিত তথ্য থাকা সত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। কারণ তার বাবা আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতার ঘনিষ্ঠ।

এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিলো। তখন উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও তার বস্তবায়ন হয়নি।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) বেলায়েত হোসেন বলেন, এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে কথা বলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সচিব। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী, শিক্ষা সচিব আবু বকর ছিদ্দীকের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিক কল ও এসএমএস পাঠিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি।

সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল
এন এইচ, ১১ ফেব্রুয়ারি

Back to top button